নারীর মাতৃত্ব ও কর্মজীবন

বিশ্বায়নের এই যুগে ছোট্ট শিশুদের প্রাথমিক স্কুল থেকে শুরু করে এভারেস্টের চূড়া, প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে নারীদের সরব উপস্থিতি। ঈর্ষণীয় হারে বাড়ছে নারী শিক্ষার হার, বেড়েছে নারী ক্ষমতায়ন। সমাজে আশানুরূপভাবে কমে এসেছে নারী সহিংসতার হার। যে সমাজ একদিন নারীদের কোণঠাসা করে রাখত, সেই সমাজব্যবস্থা পরিবর্তনে আজ নারীরাই রেখে চলেছে অনস্বীকার্য ভূমিকা। ঘর আর বাহির, দুটোকে সমান প্রাধান্য দিয়ে এগিয়ে চলা এসব নারী প্রত্যেকেই ‘অদ্বিতীয়া’। তবে এখনো অনেক সম্ভাবনাময়ী নারীদের শিক্ষাজীবনের ইতি ঘটছে শুধু সামাজিক দায়বধ্যতার খাতিরে। আবার উচ্চশিক্ষিত এমন অনেক নারী আছেন যারা কর্মজীবনে প্রবেশ করেও শুধু সংসার, সন্তান কিংবা পারিবারিক দায়িত্বের কথা চিন্তা করে অচিরেই ইতি টানছেন কর্মব্যস্ত জীবনের। তবে দিনশেষে যে পরিবার, সমাজ, সংসার কিংবা প্রিয় সন্তানের জন্য নারীদের এই আত্মত্যাগ, অবেলায় শিক্ষাজীবন কিংবা কর্মজীবনের ইতি টানা এসব নারী সমাজ-সংসারের আধারেই রয়ে যান আজন্ম। জীবন সায়াহ্নে এসে এসব আত্মত্যাগী নারীদের স্মৃতির ঝুলিতে যুক্ত হয় ফেলে আসা শত অপারগতা আর অব্যক্ত কিছু হাহাকার।

বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এখনো এ দেশের অনেক মেয়েদের শিক্ষাজীবনের ইতি ঘটার আগেই বসতে হয় বিয়ের পিঁড়িতে। পরবর্তীকালে পারিবারিক উত্সাহের অভাব কিংবা মাতৃত্বজনিত কারণে অসমাপ্ত রয়ে যায় হাজারো নারীর শিক্ষাজীবন। কৈশোরের সেই দুরন্ত তরুণীর গণ্ডিটা আর চার দেওয়াল অতিক্রম করে প্রবেশ করে না প্রিয় শিক্ষাঙ্গনে। ভেতরের যে শিখাটা শিক্ষার আলোয় প্রজ্বলিত হওয়ার কথা ছিল, অচিরেই সেই শিখার দ্বীপ নিভে যেতে থাকে জীবনে নতুন অতিথির আগমনে। নিজের শিক্ষাজীবন অসমাপ্ত রেখেই শুরু করেন প্রিয় সন্তানের ভবিষ্যত্ নির্মাণের কাজ। যেন জীবনের প্রয়োজনে নিত্য ছুটে চলা। বিনিময়ে শুধু সন্তানের কৃতিত্বেই নিজের ফেলে আসা অসম্পূর্ণ শিক্ষাজীবনের আক্ষেপ ঘোচানোর নিরন্তর প্রচেষ্টা।

হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় উঠে এসেছে, উচ্চশিক্ষিত নারীর প্রতি দশ জনে চার জন কোনো নির্দিষ্ট কারণে চাকরি ছেড়ে দেন। এই ‘নির্দিষ্ট’ কারণের মধ্যে রয়েছে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, সন্তান লালনপালন কিংবা কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতার অভাব। আবার চাকরি ত্যাগের ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষিত নারীরাই রয়েছেন শীর্ষস্থানে। একটি মূল কারণ হলো, পারিবারিক সচ্ছলতা থাকায় অনেক উচ্চশিক্ষিত নারী অনায়াসে চাকরি ছেড়ে দেন। এক্ষেত্রে তাদের প্রধান প্রাধান্য থাকে সন্তান লালনপালন। সন্তান জন্মদানের জন্য বরাদ্দকৃত ছয় মাসের ছুটি কাটিয়ে কর্মক্ষেত্রে যোগ দেওয়া অনেক নারীই এসময় সন্তানের সঠিক পরিচর্যা নিতে না পারায় এক ধরনের হীনম্মন্যতায় ভোগেন। ফলাফল, যে সন্তান তাকে মাতৃত্বের স্বাদ আস্বাদনের সুযোগ করে দিয়েছে, শুধু তার জন্য ইতি টানেন কর্মজীবনের। সংসার আর সন্তানে সদা ব্যস্ত সেই নারী ক্রমেই নিজেকে গুটিয়ে নেয় বাইরের সেই সুন্দর জগত্ থেকে। বিনিময়ে হয়তো নিশ্চিত হয় সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যত্। তবে সন্তানের বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে কমতে থাকে ব্যস্ততা। একসময় জীবনের কোনো এক গোধূলি লগ্নে তারা স্মরণ করেন তাদের সেই মাঝপথে ছেড়ে আসা কর্মজীবন আর সেই এক টুকরো জগতের অখণ্ড স্মৃতিচারণে কেটে যায় তাদের হাজারো অলস দুপুর। দীর্ঘ শিক্ষাজীবনের ইতি ঘটিয়ে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের মধ্য দিয়ে অর্জিত সেই পরিচয়, সেই স্তনির্ভরতার বিসর্জন দেওয়া নারীরাই তাই সমাজ-সংসারের সব কৃতিত্বের সমান ভাগীদার। কেননা তাদের ত্যাগেই বিনির্মাণ হচ্ছে সমাজের প্রতিটি স্তম্ভ।

তবে শত বাধা পেরিয়েও দুর্নিবার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের নারীরা। পুরুষের পাশাপাশি পরিবারের দায়িত্ব নেওয়া থেকে শুরু করে, সন্তান লালন পালন, সঙ্গে করপোরেট জীবনের ব্যস্ততা-সব সামলে আজকের নারী হয়ে উঠছেন অনন্য, অণুকরণীয়। শিক্ষাজীবন কিংবা কর্মজীবনের মাঝপথে হঠাত্ আসা মাতৃত্বকে চলার পথের অন্তরায় নয়, বরং ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন অনেকে। কেননা প্রতিটি নারীর জীবনে আকাঙ্ক্ষিত এই মাতৃত্ব শিক্ষাজীবনে ভালো ফলের সাফল্য কিংবা কর্মক্ষেত্রে পাওয়া কোনো পদোন্নতির থেকে কোনো অংশেই কম নই। তাই মাতৃত্বেই থাকুক নারী জাগরণের শক্তি। মাতৃত্ব কর্ম ব্যস্তজীবনের সমাপ্তি নয়, হোক জীবনের নতুন পথের দিশারি। যাকে কেন্দ্র করে প্রতিটি নারীর ব্যক্তিজীবন এবং কর্মজীবনে আসুক সাফল্য। মাতৃত্বের মতো বিশাল অর্জন নারীর চলার পথে প্রতিবন্ধকতা নয়, হোক এগিয়ে চলার মূলমন্ত্র। নারীর মাতৃত্বে শুদ্ধ হোক ধরণী।

n লেখক :শিক্ষার্থী, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা