দুর্ভোগ সয়ে কাজে শ্রমিকরা

বৈশ্বিক মহামারি রোধে চলমান কঠোর বিধি-নিষেধের মধ্যেই নানা শঙ্কা মাথায় নিয়ে গতকাল রবিবার খুলেছে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারাখানা। চরম দুর্ভোগ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত কাজে যোগ দিয়েছেন শ্রমিকরা। বাড়তি ভাড়া, পথে পথে দুর্ভোগ আর ভোগান্তি পেরিয়ে শিল্পকারখানায় উপস্থিত হয়েছেন শ্রমিকরা। আবার অনেকেই কর্মস্থলে ফিরতে ঢাকার বাইরে থেকে গতকালও এসেছেন। টানা ১২ দিন বন্ধ থাকার পর রাজধানীর কারখানাগুলো চালু হয়েছে। একই দিনে রাজধানীর আশপাশে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ ও আশুলিয়াসহ শিল্প এলাকার রপ্তানিমুখী কারখানাগুলো চালু হয়েছে। যাত্রীদের দুর্ভোগ বিবেচনায় গতকাল দুপুর ১২টা পর্যন্ত গণপরিবহন চলাচলের অনুমতি দেয় সরকার; কিন্তু এরপরও সকাল থেকে রাজধানীর প্রধান প্রধান সড়কে দেখা যায় গণপরিবহন অনেকটাই কম। যাত্রীর তুলনায় নেই কাঙ্ক্ষিত গণপরিবহন। ভোর থেকেই ঢাকায় প্রবেশ করতে শুরু করে যাত্রী ভর্তি বাস, ট্রাক ও প্রাইভেটকার। আর সকাল সাড়ে ৭টার পর থেকে দলে দলে শ্রমিকরা কারখানায় যেতে শুরু করেন। রাজধানীর তেজগাঁয়ের কারখানাগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, শ্রমিকরা কারখানায় প্রবেশের আগেই পানি ও সাবান জাতীয় পাউডার দিয়ে পরিষ্কার হয়ে কারখানায় ঢুকছেন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে মাস্ক পরে তারা প্রবেশ করছেন।

পথে পথে ভোগান্তি

সদরঘাটে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে লঞ্চে আসছেন হাজার হাজার মানুষ। কিন্তু সদরঘাট বাস টার্মিনাল তথা নিম্ন আদালতের সামনে দেখা গেল অসংখ্য যাত্রীর ভিড়। জানতে চাইলে আলামিন নামে একজন যাত্রাপথে দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘বরিশাল থেকে আসছি। লঞ্চে পা রাখার জায়গা ছিল না। এখন আবার বাসও পাচ্ছি না।’ গুলিস্তান গোলাপশাহ মাজারের সামনে দাঁড়িয়ে অসংখ্য যাত্রী। প্রশ্ন করতেই রেগে গিয়ে একজন জানালেন, এই শিথিলের মানে কী? আমরা কি মানুষ না। মাওয়া ঘাট দিয়ে আসছি। গুলিস্তানে গাড়ি থেকে নেমে দেখি কোনো বাস নাই। আমার বাসা গাজীপুর, সেখানে যাব কীভাবে? বিকালের মধ্যেই অফিসে গিয়ে হাজিরা দিতে হবে।

পল্টন মোড়েও গ্রাম থেকে আসা মানুষের জটলা দেখা গেল। একটি বাস এলেই সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন। যাত্রীবাহী এসব বাসের বেশির ভাগই পল্টন মোড়ে দাঁড়াচ্ছে না। এতে যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ছেই। একজন জানান, তিনি দুই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করছেন কিন্তু কোনো বাস পাননি। থাকেন টঙ্গীতে। আসছেন খুলনা থেকে।

এর আগে শনিবার সন্ধ্যায় সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয় পোশাকশ্রমিকদের সুবিধার্থে গতকাল দুপুর ১২টা পর্যন্ত বাস চলাচল করবে; কিন্তু দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে যারা ঢাকায় আসছেন তারা ঢাকায় প্রবেশ করেই পড়ছেন বিপাকে। কারণ পর্যাপ্ত পরিমাণে গণপরিবহন না থাকায় ঢাকায় আসা মানুষের ভোগান্তির যেন অন্ত নাই।

নেত্রকোনা থেকে ভোর রাতে এসে ঢাকায় পৌঁছান দুই বোন—রেহানা ও খাদিজা। একজন বলেন, ‘হেঁটে, রিকশা, অটোরিকশা, ট্রাকে আর বাসে ভাইঙ্গা ভাইঙ্গা ঢাকায় ফিরছি। কারখানা থেকে ফোন দিছে আজকে খোলা। অফিসে আসতে হবেই। নইলে চাকরি থাকবে না। তাই ১ হাজার টেকার ভাড়া ৩ হাজার টেকা দিয়া আইছি। কষ্ট হইছে, টেকাও বেশি গেছে।’ যশোর থেকে আসা তেজগাঁওয়ের নাসা গামেন্টেকর্মী বিপ্লব বড়ুয়া বলেন, ‘ট্রাক, প্রাইভেটকার  ও বাসে মিলে আজ (গতকাল) ভোর ৬টায় ঢাকায় নামছি। খাওয়া-দাওয়া-ঘুম—কিছুই নেই। টাকাও গেছে ডাবল। এই কষ্টের কথা কাকে বলব।’

রাজধানীর গাবতলী, যাত্রাবাড়ী, আবদুল্লাপুর ও মহাখালীতে সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, দূরপাল্লার বাসগুলো ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলা থেকে যাত্রী নিয়ে এসে বাসস্ট্যান্ডে নামিয়ে দিচ্ছে। যাত্রীরা নির্দিষ্ট গন্তব্যস্থলে পৌঁছানোর জন্য সিএনজি, রিকশা ও ভ্যানগাড়ি ভাড়া করছেন। অনেক যাত্রী আবার কাঁধে ও হাতে ব্যাগ নিয়ে হেঁটেই গন্তব্যস্থলে যাচ্ছেন। তবে রাজধানীতে বলাকাসহ কিছু সিটিং সার্ভিস বাস চলাচল করলেও গেটলক করে চলছে।

এদিকে গতকালও ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কে ছিল ঢাকামুখী মানুষের চাপ। একমুখী গাড়ির চাপে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল মহাসড়ক। অপরদিকে ৯ দিন বন্ধ থাকার পর দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথে গণপরিবহন ও লঞ্চ চলাচলের অনুমতি দেওয়ার পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়।

কাজে যোগ দিয়েছেন প্রায়

৯০ শতাংশ শ্রমিক

টানা ১২ দিন ছুটির পর গতকাল কারখানাগুলোতে ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ শ্রমিক উপস্থিত হয়েছেন বলে মনে করছে তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও নিটওয়্যার মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ। এ ব্যাপারে বিজিএমইএর পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল গণমাধ্যমকে বলেন, প্রতিটি কারখানায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে শ্রমিকদের কাজ করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিজিএমইএর পক্ষ থেকে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছি, তদারকি করছি কারখানাগুলোতে যাতে কোনোভাবেই কেউ করোনায় আক্রান্ত না হয়।

লঞ্চ চলাচলের সময় বাড়ল

কলকারখানা খোলার ফলে ঢাকামুখী যাত্রীর চাপ থাকায় ১২ ঘণ্টা সময় বাড়িয়ে আজ সোমবার সকাল ৬টা পর্যন্ত লঞ্চ চলাচল অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। গতকাল রবিবার দুপুরে এ তথ্য নিশ্চিত করেন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) কর্মকর্তা মোবারক হোসেন মজুমদার।

এদিকে লঞ্চ চলাচলের সময় বৃদ্ধির খবরে বরিশাল নদী বন্দরে যাত্রীদের ভিড় বেড়েছে। তিনটি লঞ্চ শনিবার রাত ৮টার পর ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। সরকারের পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী গতকাল রবিবার বেলা ১২টা পর্যন্ত লঞ্চ চলাচলের অনুমতি ছিল। কিন্তু সময় এবং যাত্রী স্বল্পতার কারণে লঞ্চমালিকরা লঞ্চ ছাড়তে রাজি হননি। বেশির ভাগ যাত্রী অবস্থান নিয়েছেন লঞ্চের ডেকে। তাদের অনেকের মুখে নেই মাস্ক। মানা হয়নি শারীরিক দূরত্বও। লঞ্চে জীবাণুনাশকও স্প্রে করা হয়নি। তার পরও লঞ্চে ঢাকা যাওয়ার সুযোগ পেয়ে খুশি যাত্রীরা।

প্রসঙ্গত, ঈদ ও করোনা ভাইরাসের প্রকোপ রোধে সরকারঘোষিত কঠোর বিধিনিষেধে গত ১৯ জুলাই থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত টানা ১২ দিন কারখানা বন্ধ ছিল। সরকারের সিদ্ধান্ত ছিল ৫ আগস্ট পর্যন্ত কারখানা বন্ধ থাকবে। কিন্তু পোশাক মালিকদের চাপে সরকার ১ আগস্ট থেকে কারখানা চালুর সিদ্ধান্ত নেয়।

[প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছে বরিশাল অফিস, ভোলা (দক্ষিণ) প্রতিনিধি, কালিহাতী (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা, গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) সংবাদদাতা ও সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি]