সমকালীন : এক মানবিক পৃথিবীর সন্ধানে

 

বিখ্যাত ইংরেজি ঔপন্যাসিক সল বিলো তাঁর ‘সিজ দ্যা ডে’ উপন্যাসে প্রধান চরিত্র টমি উইলহেমের জীবন ও জীবিকার সন্ধানে ছুটে চলা এক সংগ্রামী জীবনের বর্ণনা তুলে ধরেছেন; ঠিক যেন সেই টমি উইলহেমের মতোই আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায়, সমগ্র পৃথিবীর মানুষ যখন ছুটছিল তাদের টিকে থাকার এক কৃত্রিম স্বপ্নের পিছে, তখন আকস্মিকভাবে এক অদৃশ্য শত্রু কোভিড-১৯ আক্রমণ করে তাদের জীবনব্যবস্থায়। অনেকটা অসহায় আত্মসমর্পণের মতো ভেঙে পড়তে থাকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্যখাতের পাশাপাশি শিক্ষা, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক ও সেবামূলক খাতসমূহ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের দর্শনমতে, একটি দেশের অনাকাঙ্ক্ষিত সংকট নিরসনে ঐ দেশের জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সমাজের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা, সব রাজনৈতিক দল এবং সামাজিক শক্তির প্রতিনিধিদের সম্মিলিত মানবিক সাহায্য অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা শুরু থেকেই বলে আসছিল, করোনা এক জাতীয় ও বৈশ্বিক দুর্যোগ যা কেবল স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের নিরবিচ্ছিন্ন সেবার মাধ্যমে মোকাবিলা করা অনেক দরিদ্র রাষ্ট্রের দ্বারাই কঠিন হয়ে পড়বে। সময়ের পরিক্রমায় করোনা রোগীর পরীক্ষা, চিকিত্সা, পরিবহন, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও খাবারের ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও সমাজের সর্বস্তরের তরুণদের স্থানীয় সরকারের পাশে এগিয়ে আসার চিত্র সমগ্র বিশ্বজুড়ে নেহায়েত কম নয়, যা ইতিমধ্যে প্রমাণ করেছে যে, আসছে আগামীর দিনটা আমাদের জন্য হতে যাচ্ছে এক অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনাবিল আখড়া। বাঙালি জাতির এই ক্লান্তিলগ্নে, বীর সন্তানেরা যেভাবে অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে যাচ্ছে, এটা মনে করিয়ে দেয়—এদের পূর্বসূরিরা ছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ী বীর। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য এমনি এক বাংলাদেশের কথা বলেছিলেন:

‘সাবাস বাংলাদেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়:

জলে পুড়ে-মরে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়’

পৃথিবী একদিন তার নিজস্বরূপে ফিরবে, করোনা পরবর্তী পৃথিবী হোক প্রতিটি মানুষের ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য আর সম্প্রীতির এক উর্বর ভূমি। সমস্ত ক্ষয়ক্ষতি আর ধ্বংসস্তূপ মাড়িয়ে পৃথিবী গর্জে উঠুক নব উদ্যমে শান্তি আর মানবিক মর্যাদার মশাল জ্বালিয়ে, যার আলোয় আবারো জনাকীর্ণ হোক নিউইয়র্ক, সাংহাই, টোকিও, মেলবোর্ন, কলকাতা ও ঢাকার মতো বিখ্যাত শহরগুলো। হাজারো নান্দনিক প্রাণের নিস্তব্ধ বিদায় লগ্নে আজ আমরা স্যামুয়েল বেকেটের সময়োপযোগী নাটক ‘ওয়েটিং ফর গডো’-র মতো অপেক্ষায় থাকতে চাই, নিশ্চয় আমরা সবাই করোনা মহামারি জয় করে মানবিক পৃথিবীর প্রাণবন্ত এক নতুন সূর্যের দেখা পাব।

রাজীব হোসেন