নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ জরুরি

বেঁচে থাকার জন্য নিরাপদ খাদ্য অপরিহার্য। নিয়মিত নিরাপদ খাদ্য গ্রহণে রোগমুক্ত সুস্থ শরীর গড়ে ওঠে। এতে করে জীবন হয় স্বাচ্ছন্দ্যময়। কিন্তু অধিক মুনাফালাভ, অজ্ঞতা, উদাসীনতা, অসচেতনতা, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতার অভাবসহ নানা কারণে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে খাদ্য প্রতিনিয়ত দূষিত হচ্ছে, যার ফলে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ আজও সম্ভব হয়নি। এসব খাদ্য গ্রহণে বাড়ছে জটিল রোগে আক্রান্তের হার ও মৃত্যুঝুঁকি। সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরিপমতে, ‘বিশ্ব জুড়ে খাদ্যজনিত রোগে বছরে প্রায় ২০ লাখ মানুষ মারা যায় এবং বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে ১৫ লাখেরও অধিক ব্যক্তি খাদ্যদূষণজনিত রোগে আক্রান্ত হয় এবং ১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।’ তাই বর্তমান পৃথিবীতে অন্য সব সমস্যার পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ গুরুত্বপূর্ণ এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অন্য অনেক দেশের পাশাপাশি বাংলাদেশেও কীটনাশকের ব্যবহার, ফরমালিন-ইথিন ও ক্যালসিয়াম কার্বনেট প্রয়োগ, কাপড়ের রং, ধূলিকণা ও প্রিজারভেটিভসের জন্য ব্যবহূত ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্যের কারণে খাদ্যদূষণ ঘটছে প্রতিনিয়ত। জাতীয় জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান খাদ্য নমুনা পরীক্ষা-২০২০-এ দেখিয়েছে, ৫০ শতাংশ খাদ্যে ভেজাল মিশ্রিত। খাদ্যদ্রব্য তাজা রাখতে ব্যবহূত হচ্ছে ফরমালিন। মূলত কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ ও মর্গে লাশ সতেজ রাখতে ফরমালিনের ব্যবহার শুরু হলেও এখন খাদ্যের পচন রোধে মাছ-মাংস, ফলমূলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যে তা ব্যবহূত হচ্ছে। ফলমূলে দ্রুত পরিপক্বতা আনতে ব্যবহূত হচ্ছে ক্যালসিয়াম কার্বনেট এবং  আকর্ষণীয় রং আনতে ব্যবহূত হচ্ছে ইথিন। এছাড়া নকল দুধ, নকল ওষুধের মতো দ্রব্যও ছড়িয়ে পড়েছে বাজারে। এমনকি সাধারণ পানি কিনেও ভোক্তারা ভেজালের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। বিএসটিআইয়ের তথ্যমতে, বাজারে ১৯টি কোম্পানিকে পানি সরবরাহের অনুমোদন দেওয়া হলেও তিন শতাধিক প্রতিষ্ঠান পানি বোতলজাত করে বাজারে সরবরাহ করছে। পাশাপাশি মেয়াদোত্তীর্ণ দ্রব্যও বাজারে বিক্রি হচ্ছে, যা আইনত নিষিদ্ধ।

এসব খাদ্য গ্রহণে ক্ষতিকর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। ফরমালিনে থাকা ফরমালডিহাইড চোখের রেটিনাকে আক্রান্ত করে ধ্বংস করে রেটিনা কোষ। ফলে অন্ধত্বের হাত থেকে রেহাই পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ গ্রহণে পাকস্থলী, শ্বাসনালি, ফুসফুস, কিডনি, লিভার, হার্ট ও ব্রেন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিষেজ্ঞরা বলছেন, ‘গত দুই দশকে হূদেরাগীর সংখ্যা বেড়েছে ২০ গুণ, যার অন্যতম কারণ নিরাপদ খাদ্যের অভাব।’ এছাড়া, পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের মতে, ‘ভেজাল খাদ্য গ্রহণের কারণে দেশে প্রতি বছর প্রায় ৩ লাখ মানুষ মরণব্যাধি ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে।’ জরিপসমূহ আরো বলছে, ভেজাল খাদ্যের প্রভাবে ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, পেটের পীড়া, রক্তশূন্যতা, শ্বাসকষ্ট ও চর্মরোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে আর একটু একটু করে জনসমাজ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব অনেক মারাত্মক। কম দামি চকলেট ও মুখরোচক খাবারগুলো শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। অতিরিক্ত রাসায়নিক দ্রব্যের প্রভাবে শিশুদের তত্ক্ষণাত্ মৃত্যুও ঘটে।

দেশবাসীকে এই ভয়াবহ অভিশাপ থেকে মুক্তি দিতে বাংলাদেশ সরকার ‘নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩’ প্রণয়ন করেছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। তবে এসব উদ্যোগ তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত ছড়াতে হবে এবং আইনের সঠিক বাস্তবায়ন ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। বাজার মনিটরিংয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের নজরদারিও বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি দেশে পর্যাপ্ত খাদ্য পরীক্ষাগারও স্থাপন করতে হবে। সেই সঙ্গে এনজিও এবং সরকারের যৌথ প্রচেষ্টায় সাধারণ মানুষকে নিরাপদ খাদ্য গ্রহণে সচেতন করে তুলতে হবে এবং এর ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে সামক্য ধারণাও পিছিয়ে পড়া জনসমাজে ছড়িয়ে দিতে হবে। প্রয়োজনে খাদ্য সংরক্ষণে সূর্যের তাপের ব্যবহার ও তেল-চিনি বা লবণ প্রয়োগের মতো প্রাকৃতিক উপায়গুলোর বিস্তারও ব্যবসায়ী সমাজে নিশ্চত করতে হবে এবং ভোক্তা সমাজেরও দ্রব্য কেনার সময় দ্রব্যের গুণমান ও মেয়াদ দেখে নেওয়া উচিত। তবেই সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ বাস্তবায়িত হবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়