বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের (শেবাচিম) করোনা ওয়ার্ডে মৃত্যু বাড়ছেই। এখানে রোগী মৃত্যুর বড় কারণ আইসিইউ সংকট ও সেন্ট্রাল অক্সিজেন সেবার অপর্যাপ্ততা। এমনিতেই এই হাসপাতালে অবকাঠামোগত নানান সংকট রয়েছে। এক হাজার শয্যার এই হাসপাতালে বর্তমানে ৩০০ শয্যার করোনা ইউনিট চালু আছে। যেখানে সেন্ট্রাল অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা আছে মাত্র ১৫৭ শয্যায়। আর মাত্র ৫০ শয্যায় এই সেবা সম্প্রসারণ করা যাবে বলে গণপূর্ত বিভাগ জানালেও সেটি এখনো করে দেওয়া হচ্ছে না। এছাড়া করোনা ওয়ার্ডের সামনে ইউনিসেফের সহায়তায় নবনির্মিত ১০ হাজার লিটারের অক্সিজেন ট্যাংক কয়েক মাসেও চালু করা সম্ভব হয়নি।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, ঐ ট্যাংকে অক্সিজেন সরবরাহের জন্য দুটি প্রতিষ্ঠানই উচ্চ দর হাঁকছে। তাই ঐ ট্যাংকে অক্সিজেন সরবরাহ নিয়ে চলছে দরকষাকষি। ফলে প্রতিদিন করোনায় আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে এ ওয়ার্ডে ভর্তিকৃত রোগীদের মধ্যে কাগজে-কলমে গড়ে ২০ জন মারা যাচ্ছেন। একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের ভাষ্যমতে, এই হিসাবের বাইরেও অনেক রোগীর মৃত্যু হচ্ছে।
শেবাচিম হাসপাতাল সূত্র জানায়, বিভিন্নভাবে রাজনৈতিক, প্রশাসনিকসহ বিশেষ ব্যক্তিরা ও তাদের আত্মীয়স্বজন আক্রান্ত হলে সেন্ট্রাল অক্সিজেন সেবা বা আইসিইউর জন্য তদ্বির করে থাকেন। কিন্তু আইসিইউর চেয়ে মুমূর্ষু রোগী কয়েক গুণ বেশি হওয়ায় এ হাসপাতালে মৃত্যুর মিছিল দিন দিন দীর্ঘ হচ্ছে।
হাসপাতালের পরিচালক সাইফুল ইসলাম জানান, এক হাজার শয্যার হাসপাতালে আড়াইশ শয্যার হাসপাতালের জনবলও নেই। এ জনবল দিয়েই করোনা ওয়ার্ডের জন্য ২২টি আইসিইউসহ ৩০০ শয্যা প্রস্তুত করে চিকিত্সা দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে করোনা ইউনিটে শয্যার চেয়ে বেশি রোগী ভর্তি থাকলেও একজন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক ও ৩৯ জন মেডিক্যাল অফিসারসহ ১৫০ জন নার্স দায়িত্ব পালন করছেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় কেবল করোনা ওয়ার্ডের জন্য ৫০ জন চিকিত্সক এবং ১০০ নার্স চেয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
পরিচালক জানান, আগের জনবল দিয়ে মূল হাসপাতাল চালাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে, এর ওপর করোনা ইউনিটে রোগীর সংখ্যা বাড়ছেই। সেক্ষেত্রে অতিরিক্ত জনবল ছাড়া এই ইউনিট চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি আরও জানান, অ্যানেসথেসিয়া বিভাগের মাত্র একজন চিকিত্সক এবং ৪০ নার্সকে প্রশিক্ষণ দিয়ে করোনা ওয়ার্ডের ২২টি আইসিইউ সেবা চালু রাখা হয়েছে।
গণপূর্ত বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী ফিরোজ আলম জানান, আরো ৫০ শয্যায় সেন্ট্রাল অক্সিজেন দেওয়ার জন্য প্রাক্কলন করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলে কার্যক্রম শুরু করা হবে।
অপর দিকে বরিশাল সদর (জেনারেল) হাসপাতালের করোনা ইউনিটের ৩৮ শয্যায় গতকাল সোমবার চিকিত্সাধীন ছিল ৩২ জন। এখানে করোনা ওয়ার্ডে চিকিত্সা দেওয়ার উপযোগী চিকিত্সক রয়েছেন মাত্র ৯ জন। সেখানে চিকিত্সাধীন রোগীর স্বজনরা জানান, সেন্ট্রাল অক্সিজেন সেবা থাকলেও রোগীর কাছে কাউকেই পাওয়া যাচ্ছে না।
বরিশাল বিভাগে করোনায় আক্রান্ত হয়ে ও উপসর্গে গতকাল দুপুর ২টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শেবাচিমের করোনা ওয়ার্ডে করোনা আক্রান্ত হয়ে পাঁচ জন, করোনা উপসর্গ নিয়ে ১৮ জন মারা গেছে।
বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. বাসুদেব কুমার দাস জানান, বিভাগে করোনায় আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত মোট ৪৮৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। শেবাচিমের করোনা ওয়ার্ডে এ পর্যন্ত মারা গেছে মোট ১ হাজার ১১৭ জন। এদের মধ্যে ৭৯৪ জন উপসর্গ নিয়ে ও ৩২৩ জন করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যায়।
সচেতন নাগরিক আন্দোলনের সভাপতি কাজী আবুল কালাম আজাদ জানান, ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী বরিশাল বিভাগের লোকসংখ্যা ছিল ৫৩ লাখ ২৫ হাজার ৬৬৬ জন। দীর্ঘ ১০ বছরে তা বেড়ে বর্তমানে ১ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। অথচ বরিশাল বিভাগের ছয় জেলাসহ পার্শ্ববর্তী কয়েকটি উপজেলার একমাত্র ভরসাস্থল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। তিনি বলেন, জনবল সংকটে রোগীরা এ হাসপাতালে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছে না। বর্তমানে যে পরিস্থিতি হয়েছে তাতে এখানে মানবিক বিপর্যয় ঘটছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এখানে প্রয়োজনীয় জনবল ও আধুনিক চিকিত্সা ব্যবস্থা দেওয়ার দাবি জানান তিনি।