সত্যেন বসু

মাধব রায়, কথাসাহিত্যিক, সহকারী অধ্যাপক (পদার্থবিজ্ঞান)

ব্লু বার্ড হাইস্কুল এন্ড কলেজ, সিলেট

বিদেশ গেলেন কখন? বলল অণু?

নিবন্ধ প্রকাশিত হবার পর পৃথিবীতে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে। তখন তিনি ইউরোপে গবেষণা করার সুযোগ লাভ করেন। দুই বছর তিনি লুই ডি ব্রগলি, মেরি কুরি এবং আইনস্টাইনের সাথে কাজ করেন। ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন এবং অধ্যাপক পদে উন্নীত হন।

রেখা বলল-তিনি কি শুধু বিজ্ঞান নিয়েই গবেষণা করতেন, অন্য কিছু করতেন না? শিল্প সাহিত্য?

করতেন, বললেন নীলকান্তবাবু। তিনি এস্রাজ বাজাতেন খুব ভালো। কবি বিষ্ণু দে, চিত্রশিল্পী যামিনী রায়, সঙ্গীতজ্ঞ অমিয়নাথ স্যানাল-এরকম মানুষদের সাথে তাঁর বন্ধুত্ব ছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তাঁকে অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখতেন।

রবীন্দ্রনাথ তো বিজ্ঞানের বই ‘বিশ্বপরিচয়’ সত্যেন্দ্রনাথ বসুকেই উত্সর্গ করেছিলেন। উত্সর্গপত্রে কিছু মজার কথা লিখেছিলেন, রবিঠাকুর। ‘শ্রীযুক্ত সত্যেন্দ্রনাথ বসু প্রীতিভাজনেষু, এই বইখানি তোমার নামের সঙ্গে যুক্ত করছি। বলা বাহুল্য এর মধ্যে এমন কোনও বিজ্ঞান সম্পদ নেই যা বিনা সংকোচে তোমার হাতে দেবার যোগ্য। তাছাড়া, অনধিকার প্রবেশে ভুলের আশঙ্কা করে লজ্জা বোধ করছি, হয়তো তোমার সম্মান রক্ষা করাই হল না।

......শিক্ষা যারা আরম্ভ করেছে গোড়া থেকেই বিজ্ঞানের ভাণ্ডারে না হোক বিজ্ঞানের আঙিনায় তাদের প্রবেশ করা অত্যাবশ্যক। এই জায়গায় বিজ্ঞানের সেই প্রথম পরিচয় ঘটিয়ে দেবার কাজে সাহিত্যের সহায়তা স্বীকার করলে তাতে অগৌরব নেই।’

সুন্দর সুন্দর কথা লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ। বলল রেখা।

নীলকান্তবাবু বললেন, রবীন্দ্রনাথ ছাড়াও অন্নদাশঙ্কর রায় ‘জাপানে ভ্রমণ রচনা’ এবং সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ‘অর্কেস্ট্রা’ কাব্যগ্রন্থ, কাজী মোতাহার হোসেন ‘তথ্যগণিত’ বইটি তাঁকে উত্সর্গ করেন।

কিন্তু বোসকে নোবেল পুরস্কার তো দেয়া হয়নি। চন্দ্রার আক্ষেপ।

ঠিকই বলেছিস, বললেন নীলকান্তবাবু। বোস আইনস্টাইন পরিসংখ্যান, বোস-আইনস্টাইন ঘনীভবন, বোসন এর ওপর গবেষণা করে ১৯৮৪ সালে নোবেল পুরস্কার পান কার্লো রুবিয়া এবং সাইমনভান ডেয়ারমির, ১৯৯৬ সালে ডেভিড এম লি, ডগলাস ডি ওশেরফ এবং রবার্ট সি রিচার্ডসন, ১৯৯৯ সালে মার্টিনাজ জে জি ভেল্টমান ও গেরারডুস টি হুফট, ২০০১ সালে এরিক আলিন কর্নেল, কার্ল এডুইন ভাইমান এবং উলফগ্যাং কেটেরলে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, সত্যেন বসুকেই এই পুরস্কারটা দেয়া হয়নি।

তাঁকে অন্যভাবে সম্মান জানানো হয়নি? সীমা বলল।

অন্যভাবে অবশ্য সম্মান জানানো হয়েছে? ১৯২৯ সালে তাঁকে ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেস এর সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটি তাঁকে ফেলোশিপ প্রদান করে। ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিকেল ইন্সটিটিউট, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে। ১৯৫৯ সালে ভারত সরকার তাঁকে জাতীয় অধ্যাপক পদে মনোনয়ন দেয়। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাকে দেশিকোত্তম উপাধি এবং ভারত সরকার তােঁক পদ্মভূষণ উপাধি দেয়। কলকাতায় তাঁর নামে সত্যেন্দ্রনাথ বসু জাতীয় মৌলিক বিজ্ঞান কেন্দ্র নামে গবেষণাগার স্থাপিত হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিছু করেনি? কমলা বললেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর নামে একটি চেয়ার রয়েছে। এর নাম Bose Professor। রবীন্দ্রনাথের উত্সর্গীকৃত বই সত্যেন্দ্রনাথকে খুব সম্মানিত করেছিল। উত্সর্গের পর বসু নিজেই বলেছিলেন ‘নোবেল পুরস্কার লাভ করলেও আমি এতটা কৃতার্থবোধ করতাম না।’