প্রবীণদের উন্নয়নে এক আলোকবর্তিকা

বার্ধক্য বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত একদল শিক্ষার্থী ২০১৩ সালে প্রবীণদের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ‘এজিং সাপোর্ট ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন তৈরি করে। এজিং সাপোর্ট ফোরাম প্রবীণদের জন্য কাজ করা সংগঠনগুলোর সঙ্গে গবেষণা, প্রকাশনা, মানববন্ধন, সেমিনার, সভা-সমাবেশ, শোভাযাত্রা, নাটক, চিত্রাঙ্কনসহ বিভিন্ন কাজে অংশগ্রহণ করে।

২০১৫ সালে এজিং সাপোর্ট ফোরাম বার্ধক্যবিষয়ক যুব সম্মেলনের (youth summit on agieng) আয়োজন করে। সমাজসেবা অধিদপ্তর মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে অতিথি হিসেবে যোগ দেন সরকারের উপদেষ্টা, মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান, পিকেএসএফের চেয়ারম্যান, সরকারের সচিব, বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ারম্যান, বিভিন্ন এনজিওর প্রধানসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।

সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পিকেএসএফের চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ। চার শতাধিক তরুণ-তরুণীর সামনে একটি দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেছেন, আগামী দিনগুলোতে বার্ধক্য আমাদের সামনে বড় ধরনের একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়াবে। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য তোমাদের উদ্যোগ কার্যক্রম আমাদের আশান্বিত করে। আমরা সবাইকে সঙ্গে নিয়ে একটি মানবিক সমাজ গঠনে ভূমিকা পালন করতে পারব।

২০১৮ সালে তৃতীয় সম্মেলনে তিনি প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে। বিপুলসংখ্যক প্রবীণ জনগোষ্ঠীর কথা আমাদের ভাবতে হবে। কারণ মানুষ বৃদ্ধ হয়ে গেলে অসহায় হয়ে পড়ে। এ সময় তাদের পাশে দাঁড়ানো তরুণদের দায়িত্ব। উন্নত দেশগুলোতে সামাজিক সুরক্ষার বিষয়টি যেভাবে কার্যকর, আমাদের দেশে তা নেই। তাই সর্বস্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে সামাজিক সুরক্ষা তৈরির জন্য। তোমাদের হাতে এমন একটা সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে, যেখানে প্রত্যেক সন্তান তার পরিবারের প্রবীণ ব্যক্তির দায়িত্ব নেবে।

আমরা এজিং সাপোর্ট ফোরামের পক্ষ থেকে যখনই স্যারের পরামর্শ, সমর্থন, সহযোগিতা চেয়েছি, তখনই তিনি হাসিমুখে আনন্দচিত্তে দিয়েছেন। স্যারের দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল।

২০১৮ সালে টোয়েন্টি ফোর টেলিভিশন ‘দাদা-নাতির আলাপন’ নামে একটি ধারাবাহিক অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্যার আমাদের আন্তঃপ্রজন্ম সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত সে বিষয়ে ধারণা দিয়েছেন। শিশু-কিশোরদের কেমন করে জাতীয় সংগ্রাম, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, জীবনবোধ সম্পর্কে ধারণা দিতে হয় তা হাতে কলমে করে দেখান।

 পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) ২০১৬ সাল থেকে ১০৬টি সহযোগী সংস্থার মাধ্যমে ২১৮টি ইউনিয়নে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। ২১৮টি ইউনিয়নের ৪ লাখের অধিক প্রবীণকে সংগঠিত করে তাদের বিভিন্ন সুবিধা ও সেবা প্রদানের মাধ্যমে সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা, বিশেষ ঋণ, আয় বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণসহ সাতটি বিশেষ কার্যক্রমের মাধ্যমে তাদের জীবনমান আরো সহজ ও নিরাপদ করার লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করছে।

প্রবীণদের বিনোদনের জন্য প্রতিটি ইউনিয়নে প্রবীণ সামাজিক কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা, বয়স্ক ভাতা, জীবনসহায়ক সামগ্রী প্রদান, বয়োজ্যেষ্ঠ প্রবীণ ও ম্রেষ্ঠ সন্তান সম্মাননা প্রদান এবং নিঃস্ব প্রবীণদের নিজ এলাকায় থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা, সক্ষম প্রবীণদের আয় বৃদ্ধিমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে।

স্যার এই বিপুল কর্মযজ্ঞে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

কমিউনিটিতে সংগঠিত প্রবীণ, প্রবীণ কার্যক্রমে যুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তি বা সংগঠন এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ সব পক্ষের স্বপ্ন পূরণে জাতীয় পর্যায়ে ১৪ মে ২০১৮ প্রবীণ অধিকার মঞ্চ গঠিত হয়।

স্যারের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় স্মৃতি ক্ষয়জনিত রোগ ডিমেনশিয়া সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি, আক্রান্ত ব্যক্তি ও পরিবারকে সহায়তা করতে গঠিত হয়েছে ‘বাংলাদেশ ডিমেনশিয়া ফ্রেন্ডস্ কমিটি’।

প্রবীণ বিষয়ে আমি দুই শতাধিক প্রবন্ধ লিখেছিলাম। সেই প্রবন্ধগুলো থেকে বাছাই করা প্রবন্ধ নিয়ে ৩৫০ পৃষ্ঠার ‘প্রবীণ কথা’ বইটি প্রকাশ করে স্যার উইলিয়াম বেভারিজ ফাউন্ডেশন। বইটির মুখ বন্ধ লিখে দিলেন স্যার এবং মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে তিনি প্রধান অতিথি ছিলেন।

স্যারের সঙ্গে প্রবীণ সামাজিক কেন্দ্র পরিদর্শনে পিরোজপুর জেলায় যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল আমার। স্যার তিনটি প্রবীণ সামাজিক কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। সেখানে তিনি প্রবীণদের সঙ্গে আন্তরিকভাবে কথা বলেছেন,গান-গল্প শুনেছেন, ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানলেন। গ্রামের প্রবীণ মানুষের মধ্যে তিনি এতটা মিশে যেতেন যে তাকে বাইরের কোনো লোক মনে হতো না।

অনন্যা সম্পাদক তাসমিমা হোসেনের আর্থিক সহায়তায় এবং রিকের মাধ্যমে পিরোজপুর শহরে প্রবীণদের জন্য ‘প্রবীণ সামাজিক কেন্দ্র’ স্যার উদ্বোধন করেন। তিন শতাধিক প্রবীণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। সেদিন প্রবীণেরা তাদের সুখ-দুঃখ সবার সামনে তুলে ধরেছেন।

সর্বশেষ গত ডিসেম্বর মাসে নেক্সাস টেলিভিশনে আমার উপস্থাপনায় প্রবীণদের জন্য বিশেষ ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘রাঙিয়ে দিয়ে যাও’ একটি পর্বে তিনি আমার অনুরোধে বাসায় শুটিং করতে অনুমতি দিয়েছেন।

আমার সৌভাগ্য যে, স্যারের প্রবীণবিষয়ক সব কাজ আমি খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম।

একজন নির্লোভ, নিরহংকারী, সমাজবিজ্ঞানী, হাসিমুখের দরদি মানুষের সান্নিধ্য পেয়ে আমি ধন্য।

স্যারের সঙ্গে প্রবীণবিষয়ক কাজের স্মৃতি আমাকে আনন্দিত ও সাহসী করে তোলে।

n লেখক :সভাপতি, এজিং সাপোর্ট ফোরাম