মইনুল হাসান
আনারসের পাতা থেকে চামড়ার চমত্কার বিকল্প উদ্ভাবন, চামড়াশিল্পে এক যুগান্তকর বিপ্লবের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। আনারসের লম্বা পাতায় আছে তাপ এবং আর্দ্রতা প্রতিরোধী খুব মিহি টেকসই আঁশ। এই আঁশ দিয়ে তৈরি উদ্ভিজ্জ চামড়ার গুণগত মান আসল চামড়া থেকে কোনো অংশে কম নয়। উদ্ভিজ্জ এ চামড়ার নাম দেওয়া হয়েছে ‘পিনিয়াটেক্স’। এর উদ্ভাবনকারী হচ্ছেন স্পেনের নারী নাগরিক ৬৯ বছর বয়স্ক গবেষক, ডিজাইনার ও উদ্যোক্তা ড. কারমেন হিখোসা। তিনি আয়ারল্যান্ডের টেক্সটাইল ন্যাশনাল কলেজ অফ আর্ট অ্যান্ড ডিজাইন থেকে ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর পেশাগত কাজে চামড়াশিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। নব্বইয়ের দশকে ফিলিপাইনে অবস্থানকালীন তিনি চামড়ার বিকল্পের কথা ভাবতে শুরু করেন। কারণ চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণে বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার যেমন পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর, তেমনি শ্রমিকদের স্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক। এছাড়াও আনারস পাতার মিহি এবং টেকসই আঁশে তৈরি স্থানীয়দের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ‘তাগালগবারং’ দেখেও তিনি উদ্ভিজ্জ চামড়া উদ্ভাবনে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত হন। নিজেকে শাণিত করার জন্য ৬০ বছর বয়সের পরে টেক্সটাইলে পিএইচডি করেন। এক যুগের বেশি একাগ্র সাধনার ফল, উদ্ভিজ্জ চামড়া ‘পিনিয়াটেক্স’-এর কৃতি স্বত্বলাভ করেন ২০১১-তে এবং ২০১৬ থেকে পিনিয়াটেক্সের বাণিজ্যিক উত্পাদন শুরু করেন। বর্তমানে শ্যানেল, হুগোবস, এইচঅ্যান্ডএম, পলস্মিথসহ পৃথিবীব্যাপী ৮০টি দেশের প্রায় ৩০০০ ব্র্যান্ড
এই উদ্ভিজ্জ চামড়া পিনিয়াটেক্স ব্যবহার শুরু করেছে। তাই বলা চলে অচিরেই প্রাণীর চামড়া ব্যবহার অত্যন্ত সীমিত হবে। প্রধান কারণ হচ্ছে, পিনিয়াটেক্স টেকসই, পরিবেশবান্ধব এবং সস্তা। ড. হিখোসার চমত্কার উদ্ভাবনের জন্য তিনি ইউরোপিয়ান ইনভেন্টর অ্যাওয়ার্ড ২০২১-এর চূড়ান্ত প্রতিযোগীদের একজন হিসাবে মনোনীত হয়েছেন।
সুস্বাদু এবং পুষ্টিকর ফল আনারসের সঙ্গে প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় তিন কোটি টন আনারসের পাতা উত্পন্ন হয়। কৃষকেরা এই বিপুল কৃষিবর্জ্য প্রায়সময় খেতেই পুড়িয়ে ফেলেন। ফলে প্রচুর পরিমাণে কার্বন ডাই অক্সাইডের নিঃসরণ ঘটে। ড. হিখোসা জানিয়েছেন, এক বর্গমিটার উদ্ভিজ্জ চামড়া অর্থাত্ পিনাটেক্স তৈরির জন্য ৪৮০টি আনারসের পাতার প্রয়োজন হয়। ২০২০ সালে তিনি পিনাটেক্স উত্পাদনে ব্যবহার করেছেন ৮২৫ টন পাতা, ফলে ২৬৪ টন কার্বন ডাই অক্সাইড কম উত্পন্ন হয়েছে। পিনাটেক্স উত্পাদনে আনারসের পাতা ব্যবহার পরিবেশের জন্য ইতিবাচক, তেমনি কৃষকদের জন্য বাড়তি আয়ের উত্স।
অন্যদিকে প্রাণীর চামড়া প্রক্রিয়াজাত একটি শ্রমসাধ্য, জটিল, দীর্ঘ এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর প্রক্রিয়া। সরাসরি অ্যালার্জি এবং ক্যান্সারের কারণ বিভিন্ন বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। উপরন্তু চামড়া প্রক্রিয়াজাত করতে প্রচুর পানির প্রয়োজন পড়ে। এক কিলো চামড়া ট্যান করতে ৩৫ লিটার পানির প্রয়োজন হয়। বিশ্ববাজারে প্রায় ৮০ শতাংশ চামড়ার সরবরাহ আসে উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে। এসব দেশে প্রায়ই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বাড়তি খরচ এড়াতে ক্ষতিকর এবং বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্য সরাসরি নদী-নালাতে ফেলে দেওয়া হয়। যা পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। এছাড়া প্রাণীর চামড়া সংগ্রহ একটি নিষ্ঠুর প্রক্রিয়া। প্রতিবছর এজন্য প্রয়োজন হয় ১৪০ কোটি পশুর প্রাণ। পশুর প্রতি সহানুভূতি বাড়ছে বলেই পরিবেশবাদীদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে আরো অনেকেই পশুজাত চামড়া পরিহার করে উদ্ভিজ্জ চামড়ার প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। আর তাই উদ্ভিজ্জ চামড়ার জনপ্রিয়তা ও চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।