কবর নিকেতনের জিন্দেগি

মৃত্যু আমাদের ধাওয়া করে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা ঘোষণা করেন যে, বলুন তোমরা যে মৃত্যু থেকে পলায়ন করতে চাইছ, সেই মৃত্যু অবশ্যই তোমাদের সঙ্গে মোলাকাত করবে, অতঃপর তোমরা অদৃশ্য এবং দৃশ্যর মহাজ্ঞানী আলেমুল গাইব মহান আল্লাহর নিকট হাজির হবে। তিনি তোমাদের জানিয়ে দেবেন সেসব কাজকর্ম যা তোমরা করতে। (সুরায়ে জুমুআহ ৯) আল্লাহ পাক আরো এরশাদ করেন যে, আপনার পূর্বেও কোনো মানুষকে অমরত্ব দান করিনি। সুতরাং আপনার মৃত্যু হলে তারা কি চিরঞ্জীব হবে? প্রত্যেক নফছ প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতেই হবে। আমি তোমাদের মন্দ এবং ভালো দ্বারা ইমতেহান/পরীক্ষা করে থাকি এবং আমারই কাছে তোমাদের ফিরে আসতে হবে (সুরায়ে আম্বিয়া ৩৫)।

মহান রাব্বুল আলামিন এরশাদ করেন, আমি জীবন দান করি, মৃত্যুও ঘটাই এবং আমার দিকে সবারই প্রত্যাবর্তন (সুরায়ে ক্বাফ ৪৪)। দুনিয়ার দৈনন্দিন জীবনে, যেমন—অফিস, আদালতের নেজাম ঠিক রাখার জন্য আগে-পিছে হয়ে লাইনে দাঁড়াতে হয়, ঠিক তদ্রূপ আমরা মানবজাতি জীবিত অবস্থায় এ নশ্বর পৃথিবীতে মৃত্যুর সিরিয়ালের লাইনে দণ্ডায়মান আছি। মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে, আল্লাহর সামনে হাজিরা দেওয়ার জন্য কার সিরিয়ালের ডাক কখন পড়বে, সেটা কিন্তু আমরা জানি না। মহান রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনুল করিমে ঘোষণা করেন যে, ওয়া লাকাদ খালাকনাল ইনছানা ওয়া নায়লামু মা তুওয়াছ ওয়িছু বিহি নাফছুহু। ওয়া নাহনু আকরাবু ইলাইহি মিন হাবলিল ওয়ারিদ। অর্থাত্, আমি মানুষ সৃষ্টি করেছি এবং তার মন নিভৃতে যে চিন্তা করে সে সম্পর্কেও আমি অবগত আছি। আমি তার গর্দানের ঘাড়ের রগের চেয়েও আরো নিকটতম। (সুরায়ে ক্বাফ ১৬)। আল্লাহ পাক আরো ঘোষণা করেন যে, ওয়া যায়াত ছাকরাতুল মাওতি বিল হাক্ব। যালিকা মা কুনতা মিনহু তাহিদ। অর্থাত্ মৃত্যুযন্ত্রণা সত্যাসত্য অবধারিত, নিশ্চিত আসবেই। এ থেকে কোনোভাবেই তুমি টালবাহানা করতে পারবে না। (সুরায়ে ক্বাফ)। মৃত্যু এমন এক কঠিনতম বাস্তবতা যার থেকে ফেরেশতা জিবরাইল (আ), মিকাঈল (আ), ইসরাফিল (আ) এবং মালাকুল মাওত আজরাঈল (আ)কেও তার স্বাদ আস্বাদন করতে হবে। মালাকুল মাওত ফেরেশতা হজরত আজরাঈল (আ)ও মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাবেন না। অতঃপর মহান আল্লাহ পাক অহংকার করে বলবেন, আনাল মালিক, আমিই প্রভু। আনাল মুতাকাব্বির। এমনকি মহান রাব্বুল আলামিনের হুকুমে আরশ বহনকারী সব ফেরেশতাদেরও তাত্ক্ষণিকভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হবে। আর মানবজাতির মৃত্যুর পর কবর নিকেতনের জিন্দেগি হলো আলমে বারজাখি জীবন। অর্থাত্, কিয়ামত তথা পরকালের বিচার দিবসের মাঝামাঝি অপেক্ষমাণ কেন্দ্রকে (waiting center) কবর বা আলমে বারজাখি জীবন বলা হয়। মৃত্যুর পর কবরে লাশ দাফনের সঙ্গে সঙ্গেই মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ছওয়াল এবং জবাব শুরু হয়ে যায়। হজরত খাদিজাতুল কোবরা (রা) কবরের চিন্তা, কবরের ছওয়াল-জবাব এবং অন্ধকার কবরের ভয়ে সব সময় চিন্তিত থাকতেন। হজরত খাদিজাতুল কোবরা (রা) এক দিন আল্লাহর রসুল হজরত মুহম্মদ (স)-কে বললেন, হে আল্লাহর রসুল (স), আমি যদি আপনার আগে ইন্তেকাল করি, তাহলে আপনার কাছে আমার কয়েকটি ওছিয়ত থাকবে। আল্লাহর রসুল (স) বললেন, হে খাদিজা (রা) বলো, আমি তোমার ওছিয়ত পূরণে সচেষ্ট থাকব ইনশাআল্লাহ। হজরত খাদিজা (রা) আল্লাহর রসুল (স)-কে ওছিয়ত করেন যে, হে আল্লাহর রসুল (স), আমি যদি আপনার আগে ইন্তেকাল করি, তাহলে আমার প্রথম ওছিয়ত হলো আপনি আমার জানাজার নামাজ পড়াবেন। রসুল (স) বললেন, অবশ্যই, নায়াম। পরের ওছিয়ত হলো আমার লাশ কবরে দাফনের পর আপনি আমার কবর পাশে অবস্থান করবেন। রসুল (স) হজরত খাদিজাকে বললেন যে, কেন? তদুত্তরে হজরত খাদিজা (রা) আল্লাহর রসুল (স)-কে বলেন যে, হে আল্লাহর রসুল (স), কবর তো খুব ভয়ানক স্থান। আমার লাশ দাফনের পর আল্লাহর পক্ষ থেকে ছওয়াল এবং জবাবের সময় যদি মহান আল্লাহর ভয়ে প্রশ্ন এবং উত্তর দিতে কোনো ভুল করে ফেলি। কেননা তখন আমার শরীর থরথর করে কাঁপবে, আমি তো অচেনা কবরগৃহে পেরেশানিতে থাকব। (চলবে)

lলেখক :অতিথি অনুবাদক, মক্কা আল মুকাররামাহ ও সাবেক খতিব, জাতীয় সংসদ জামে মসজিদ