মুহাররমের গুরুত্ব ও আমল

ইসলামি বর্ষপঞ্জি বা হিজরি বর্ষের প্রথম মাস মুহাররম একটি বরকতময় ও ফজিলতপূর্ণ মাস। ‘মুহাররম’ আরবি শব্দ যার অর্থ পবিত্র, সম্মানিত ইত্যাদি। প্রাচীনকাল থেকেই মুহাররম মাসটি পবিত্র মাস হিসেবে গণ্য। কোরআনে পাকে এ মাসকে ‘শাহরুল হারাম’ (সম্মানিত মাস) এবং ‘আরবাআতুন হুরুম’ অর্থাত্ চার সম্মানিত মাসের অন্যতম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আর হাদিসে পাকে ‘শাহরুল্লাহ বা আল্লাহর মাস হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এ পবিত্রতম মাসে ইবাদত-বন্দেগি, তাওবা-ইস্তিগফার, নফল রোজা পালনে বিশেষ ফজিলত রয়েছে।

ইসলামি ভাষ্যমতে, রমজান মাসের রোজা ফরজ হওয়ার আগে এ মাসের ১০ তারিখে তথা পবিত্র আশুরার দিনে রোজা ফরজ ছিল। পরে তা রহিত করে মাহে রমজানের রোজা ফরজ করা হয়। ইমাম আবু জাফর তাবারি (রহ) বলেন, ‘ইসলাম আগমনের আগে ও জাহিলি যুগে এ চারটি মাসকে (জিলকদ, জিলহজ, মুহাররম ও রজব)কে আরবের লোকেরা পবিত্র মনে করে সম্মান করতেন, যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং ঝগড়া-ফ্যাসাদ থেকে নিজেদের বিরত রাখতেন।’ নবি করিম (স) মুহাররম মাসব্যাপী নফল ইবাদত, রোজা ও তাওবা-ইস্তিগফার করার প্রতি বিশেষ তাগিদ প্রদান করেছেন।

হজরত আবু বাকরাহ (রা) নবি করিম (স) থেকে বর্ণনা করেন, নবি করিম (স) বলেছেন, ‘বছর হলো ১২টি মাসের সমষ্টি, তার মধ্যে চারটি অতি সম্মানিত। তিনটি পরপর লাগোয়া জিলকদ, জিলহজ ও মুহাররম আর (চতুর্থটি হলো) জমাদিউস সানি ও শাবানের মধ্যবর্তী রজব।’ (বুখারি : ২৯৫৮)

হজরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (স) ইরশাদ করেন, ‘রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হচ্ছে আল্লাহর মাস মুহাররম (মাসের রোজা)। (সহিহ বুখারি :১৯৮২, তিরমিজি : ৭৩৮) হজরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে আরো বর্ণিত আছে, নবি (স) ইরশাদ করেন, ‘আমি যদি আগামী বছর বেঁচে থাকি তাহলে মুহাররমের ৯ ও ১০ তারিখে অবশ্যই রোজা রাখব।’ (সহিহ মুসলিম ১/৩৫৯)

মুহাররম মাসের সম্মানের ব্যাপারে প্রিয় নবি (স) বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর মাস মুহাররমের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে। কেননা, যে ব্যক্তি মুহাররমের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে, তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও জান্নাত দান করে সম্মানিত করবেন আল্লাহ তাআলা নিজে। (সহিহ মুসলিম, ইবনে মাজাহ)

হজরত আবু হুরায়রা (রা) আরো বর্ণনা করেছেন যে, একজন সাহাবি রসুলুল্লাহ (স)-কে জিজ্ঞাসা করলেন যে রমজানের পরে সর্বোত্তম রোজা কোনটি? তিনি বললেন, আল্লাহর মাসের রোজা। যে মাসকে তোমরা মুহাররম মাস নামে জানো। এতে এমন একটি দিন আছে, যে দিন আল্লাহ তাআলা এক সম্প্রদায়ের তওবা কবুল করেছিলেন এবং আগামী দিনেও তিনি আরেক সম্প্রদায়ের তওবা এ দিনে কবুল করবেন। (তিরমিজি :৭৩৯)

 এ প্রসঙ্গে হজরত হাফসা (রা) বলেন, রসুলুল্লাহ (স) বলেন, আমি আল্লাহর কাছে আশা করি যে আশুরার রোজা দ্বারা তিনি পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবেন। (তিরমিজি) এ পবিত্র মাসে গুনাহের কাজ থেকে বিরত থেকে বেশি বেশি নেক আমল করা প্রত্যেকটি মুমিন মুসলমানের দায়িত্ব ও কর্তব্য। যেমন আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনুল কারিমের সুরা তাওবার ৩৬ নম্বর আয়াতে ইরশাদ করেন, ‘পবিত্র মাসগুলোতে নিজের ওপর জুলুম, অন্যায় করো না।’

হজরত হাফসা (রা) আরেকটি সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রসুল (স) চারটি কাজ কখনো ছেড়ে দিতেন না। তার মধ্যে একটি আশুরার রোজা। (নাসায়ি শরিফ)

পরিশেষে বলা যায়, মুহাররমের তাত্পর্য ও গুরুত্বকে উজ্জীবিত রাখতে এ মাসের প্রতিটি দিন ও রাতকে ইবাদত-বন্দেগি, নফল নামাজ, রোজা পালন ও সত্কর্ম করার মাধ্যমে অতিবাহিত করা প্রত্যেক মুমিন-মুসলমান নর-নারীর উচিত। 

lলেখক :সহকারী অধ্যাপক, শেরপুর সরকারি মহিলা কলেজ, শেরপুর