মাদক কারবারিদের দমন করিতেই হইবে

মাদক ব্যবসায় এত্তো এত্তো লাভ যে, যাহারা ইহার কারবারি তাহারা কোনো প্রকার ন্যায়নীতির ধার ধারেন না। ইহাই সমগ্র বিশ্বের বাস্তবতা। মাদকের কাঁচা টাকায় আঙুল ফুলিয়া অনেকেই রাতারাতি কলাগাছ হইয়া যান। ইহার ভাগ চলিয়া যায় অসংখ্য স্তরে। এমনকি মাদকের ভূত তাড়াইবার সরিষার মধ্যেও ভূত বসিয়া থাকে বলিয়া পৃথিবীর কোনো দেশই মাদকের বিষবায়ু হইতে মুক্ত নহে। বিশ্বের অনেক সচেতন দেশ তাহার তরুণ জনগোষ্ঠীকে মাদকের মাদকতা হইতে রক্ষা করিতে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ করিয়া থাকেন; কিন্তু তাহার পরও মাদক অন্তঃসলিলা ফল্গুধারার মতো নেশাখোরদের জগতে চোরাস্রোত হইয়া বহিয়া যাইতে থাকে। দুঃখের ব্যাপার হইল, মাদকের এই ভয়াল বিস্তৃতিতে আমাদের তারুণ্য, মেধা, বিবেক, লেখাপড়া, মনুষ্যত্ব—সকল কিছু ধ্বংস হইতেছে। পত্রিকান্তরে আমরা প্রায়শই দেখিতে পাই, মাদকাসক্ত সন্তানের হাতে বাবা-মা, ঘনিষ্ঠ স্বজন নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হইয়াছেন, নেশাখোর পিতা মাদক সংগ্রহে ব্যর্থ হওয়ার ক্রোধে নিজ সন্তানকে খুন করিয়াছেন অবলীলায়। নেশার টাকা না পাইয়া স্ত্রীকে আগুনে পুড়াইয়া মারা, মাকে জবাই করা, আদরের সন্তানকে বিক্রি করিয়া দেওয়ার মতো মর্মস্পর্শী ঘটনাও ঘটিতেছে আকছার। স্পষ্ট করিয়া বলিলে মাদকের ‘মূল্য’ শুধু তাহা ক্রয় করিবার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নহে, উহার মূল্য আরো অধিক। মাদক বিনষ্ট করিয়া দিতেছে পরিবারের স্নেহ-মায়া, ভালোবাসার বন্ধন।

পরিতাপের বিষয় হইল, এই সকল অপরাধের মূল সূত্র চিহ্নিত হওয়া সত্ত্বেও মাদক নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের উদ্যোগ লইয়া কিছু প্রশ্ন থাকিয়া যায় সকল সময়। বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া আমরা দেখিয়া আসিতেছি পুলিশ, র্যাব, ডিবি, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর মাঝেমধ্যে অভিযান চালাইয়াছে; কিন্তু তাহার অন্তরালে সকল সময় কি মাদকদ্রব্য ও ব্যবসায়ী ধরিবার সদিচ্ছা থাকে? এমনও দেখা গিয়াছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের মাধ্যমে আটককৃত মাদক অনেক সময় তাহাদের হাত ঘুরিয়াই মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে চলিয়া যায়। এইভাবে একাধারে অভিযানও যেমন চলে তেমনি মাদকের কেনাবেচাও চলে পাল্লা দিয়া, অভিযান অধিক হইলে নানা হাত বদল হইয়া বাড়িয়া যায় মাদকের দাম শুধু। অর্থাত্ মাদক কখনই দুষ্প্রাপ্য হয় না। আমরা দেখিতে পাই মাদকের রুইকাতলারা সকল সময়েই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নাম ভাঙাইয়া কারবার চালাইয়া যান। তাহারা স্তরে স্তরে ভাগবাঁটোয়ারা করিয়া নিরাপদে, নিশ্চিন্তে দিনের পর দিন মাদকের সাম্রাজ্য গড়িয়া তোলেন। খোঁজ লইলে দেখা যাইবে, বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় এই সকল মাদক কারবারির নামে হয়তো থানায় সাত-আটটি মামলা রহিয়াছে, অথচ মাদক কারবারির সহিত জড়িত থাকিয়াও তাহারা বুক ফুলাইয়া এলাকায় নানাবিধ তথাকথিত ‘জনহিতকর’ কাজ করিয়া নিজেদের ‘ভালো মানুষ’ হিসাবে জাহির করিয়া বেড়াইতেছেন। ইহারা এতটাই বিপজ্জনক যে, অর্থের জোরে ইহারা রাজনীতিবিদ, প্রশাসন এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পর্যন্ত নিজেদের অনুকূলে লইয়া আসে। এইভাবে দেখা যাইবে, রাষ্ট্র ও সামাজের প্রতিটি স্তরেই মাদকের অর্থ ছড়াইয়া পড়িতেছে।

আমরা মনে করি, যেই পর্যন্ত এই বড় বড় মাদক কারবারিকে ধরা না যাইবে, মাদককে সমাজ হইতে নির্মূল করিবার চিন্তা বাতুলতা মাত্র। এই বাস্তবতা সমগ্র পৃথিবীরই। যদিও প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা বলিয়াছেন। তদানুযায়ী বিভিন্ন সময় অভিযানও পরিচালিত হইয়াছে; কিন্তু তাহা মাদকের ভয়াল সাগরে কতখানি ঢেউ তুলিয়াছে—উহা এক বড় প্রশ্ন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তরফ হইতে অবশ্য বলা হইতেছে, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকিবে। দুই-একটি জেলা-উপজেলায় এই সকল কারবারির কিছুটা টনকও নড়িয়াছে বটে; কিন্তু মনে রাখিতে হইবে মাদকের ব্যবসায়ে জড়িতরা যতই আইনের ফাঁকফোকর দিয়া বাহির হইয়া যাউক না কেন—তাহার পরও তাহাদের আইনের আওতায় আনিতেই হইবে। ইহার দ্বারাই তাহাদের দমন করা সম্ভব হইবে। যে কোনো মূল্যে হউক—তাহাদের দমন করিতেই হইবে।