নরসিংদীতে প্রতিদিনই বাড়ছে করোনা শনাক্ত রোগী ও মৃতের সংখ্যা। রোগী বাড়ায় হাসপাতালগুলোতে শয্যাসংকট দেখা দিয়েছে। হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনের তুলনায় ডাক্তারসহ অন্য স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যাও যথেষ্ট কম। জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে চিকিত্সক ও নার্স-সংকট তীব্র আকার ধারণ করছে। সেই সঙ্গে আইসিইউ, অক্সিজেন এবং ওষুধ সংকটও প্রকট। ফলে যথাযথ চিকিত্সাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন অনেকেই।
নরসিংদী জেলা হাসপাতাল
২০০২ সালে শহরের বাসাইলে প্রতিষ্ঠিত ১০০ শয্যাবিশিষ্ট নরসিংদী জেলা হাসপাতালটি বর্তমানে ২৫০ শয্যায় উন্নীতকরণের কাজ চলছে। এ হাসপাতালে ডাক্তার রয়েছেন ৩৪ জন, নার্স ৮০ জন। সরকারিভাবে ১১ হাজার কেএল ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন লিকুইড অক্সিজেন প্ল্যান্ট নরসিংদী জেলা হাসপাতালে স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু এই অক্সিজেন প্ল্যান্ট চালু করতে আরো দুই সপ্তাহ সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার এ এন এম ডা. মো. মিজানুর রহমান। জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. শীতল চৌধুরী বলেন, প্রতিদিন যে হারে করোনা রোগীর সংখ্যা বাড়ছে এতে করে আমরা পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছি। জেলা হাসপাতালে কমপক্ষে আরো আট জন ডাক্তার এবং ১৫ জন নার্স এবং চার জন প্যাথলজি টেকনিশিয়ান দরকার বলে জানান তিনি। ইতিপূর্বে বজলুর রহমান ও শাহানারা বেগম ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ১০০টি অক্সিজেন সিলিন্ডার জেলা হাসপাতালে প্রদান করা হয়েছে।
জেলায় বর্তমানে কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে ২০৪টি, উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র ১৬টি, ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত উপজেলা হাসপাতাল পাঁচটি। বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে হাসপাতাল ৬৭টি, চক্ষু হাসপাতাল ছয়টি, ডায়াবেটিক হাসপাতাল একটি, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ৪৫টি। জেলায় মোট জনসংখ্যা ২৫ লাখ ৪ হাজার ৫৬৯ জন। নরসিংদী সদর হাসপাতাল
১০০ শয্যাবিশিষ্ট নরসিংদী সদর হাসপাতালে বর্তমানে ২৬ জন ডাক্তার এবং ৮৯ জন নার্স রয়েছেন। হাসপাতালের এক্সরে বিভাগের এসিটি বর্তমানে অচল। হাসপাতালে রেডিওলজিস্ট, চক্ষু ডাক্তার, অর্থোপেডিক, চর্ম ও ডেন্টাল সার্জন নেই।
হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ৪৭৬ থেকে ৫০০ জন রোগী আসেন। জরুরি বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ জন রোগী ভর্তি হন।
সদর হাসপাতালের মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (রেডিওগ্রাফার) মিজানুর রহমান জানান, সপ্তাহে দুই দিন (শনি ও বুধবার) জেলা হাসপাতালে এবং বাকি দিনগুলোতে সদর হাসপাতালে কাজ করেন তিনি। ফলে তাকে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়। এদিকে হাসপাতালে মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট না থাকায় ডিজিটাল এক্সরে মেশিনটি অচল অবস্থায় পড়ে আছে। এক জন মাত্র টেকনিশিয়ান থাকায় রোগীরা সেবা নিতে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। দীর্ঘদিন যাবত্ রেডিওলজিস্ট ও কনসালট্যান্ট না থাকার কারণে আলট্রাসনোগ্রাম রিপোর্ট নিয়মিতভাবে প্রদান করা যাচ্ছে না।
নরসিংদীর সিভিল সার্জন ডা. মো. নুরুল ইসলাম বলেন, ডাক্তার, নার্সসহ স্বাস্থ্য বিভাগের লোকজন করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করে যাচ্ছেন।
রায়পুরা (নরসিংদী) সংবাদদাতা জানান, ২৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত বৃহত্ উপজেলা রায়পুরায় সাত লক্ষাধিক লোকের চিকিত্সাসেবার জন্য রয়েছে একটি মাত্র উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। এখানে প্রয়োজনের তুলনায় জনবল অপ্রতুল হওয়ায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে চিকিত্সাসেবা কার্যক্রম।
জানা যায়, ২০১২ সালের ডিসেম্বরে ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত হাসপাতালের নতুন ভবন উদ্বোধন করেন সাবেক মন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু এমপি। উদ্বোধনের পর থেকে আজ পর্যন্ত নতুন ভবনের কিছু আসবাবপত্র ছাড়া ডাক্তারসহ প্রয়োজনীয় সংখ্যক জনবল, চিকিত্সা উপকরণ পৌঁছেনি এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। ফলে শয্যা বাড়লেও চিকিত্সা সেবায় উন্নতি ঘটেনি, বেড়েছে সাধারণ রোগীদের ভোগান্তি।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সূত্রে জানা যায়, শুধু ৩১ শয্যা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই ৩৫ জন ডাক্তারের মঞ্জুরিকৃত পদ রয়েছে। এর মধ্যে ১৭টি পদই শূন্য। অন্যত্র সংযুক্তি দেওয়া হয়েছে আরো ১০ জন ডাক্তারকে। অনুপস্থিত আছেন এক জন। হাসপাতালে এক জন কনসালট্যান্ট থাকলেও সপ্তাহের অধিকাংশ দিনই নরসিংদী সদর হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করে থাকেন তিনি। তাই কর্মক্ষেত্রে চিকিত্সাসেবা দেওয়ার জন্য ডাক্তার আছেন মাত্র ছয় জন।
করোনা মহামারি পরিস্থিতিতে এখানে রয়েছে পাঁচ বেডের একটি আইসোলেশন ওয়ার্ড। এখানে ২০টি অক্সিজেন সিলিন্ডার ও চারটি অক্সিজেন কনসেট্রেটর থাকলেও নেই সেন্ট্রাল অক্সিজেন ব্যবস্থা। নেই আইসিও, নেই হাইফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা। এখান থেকে পিসিআরএল টেস্ট স্যাম্পল সংগ্রহ করে ঢাকা আইপিএইচ-এ পাঠানো হয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আজগর হোসেন জানান, ডাক্তার সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি। তাছাড়া সেন্ট্রাল অক্সিজেনের কাজ চলছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পঃ পঃ কর্মকর্তা ডা. আবু সাঈদ মোহাম্মদ ফারুক বলেন, ডাক্তারসহ প্রয়োজনীয় জনবল পেলে এ উপজেলায় শতভাগ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হতো।