বিদায়ী ২০২০-২০২১ অর্থবছরে দেশজ উত্পাদনে (জিডিপি) মোট প্রবৃদ্ধি হবে ৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) গতকাল প্রবৃদ্ধির এই সাময়িক হিসাব প্রকাশ করেছে। বাজেটের প্রাক্কালে এ তথ্য প্রকাশ করার কথা থাকলেও দুই মাস পর এই হিসাব প্রকাশ করল বিবিএস। করোনা পরিস্থিতি শুরুর বছরে, অর্থাত্ ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাবও প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৩ দশমিক ৫১ শতাংশ। অবশ্য সাময়িক হিসাবে বলা হয়েছিল, ঐ বছর ৫ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে। কিন্তু চূড়ান্ত হিসাবে সেটি কমে এলো। এই হিসাবও এক বছর পর প্রকাশ করল সংস্থাটি।
সাধারণত কোনো অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবের সময় আগের অর্থবছরের সাময়িক হিসাব এবং তার আগের অর্থবছরের চূড়ান্ত জিডিপির হিসাব প্রকাশ করে বিবিএস। অর্থবছরের তিন প্রান্তিকের তথ্য-উপাত্ত ধরে পুরো অর্থবছরের সাময়িক হিসাব প্রাক্কলন করে বিবিএস।
গত জুনে ২০২১-২০২২ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবের আগে ২০২০-২০২১ অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধির তথ্য প্রকাশ না করে মাথাপিছু জিডিপির হিসাব দেওয়া হয়েছিল। মোট জিডিপির আকারও মন্ত্রিসভার বৈঠকে জানানো হয়েছিল, কিন্তু প্রবৃদ্ধির এই হিসাব প্রকাশ করা হয়নি। অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায়ও প্রবৃদ্ধির পূর্ণাঙ্গ তথ্য উঠে আসেনি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রাক্কলন ছিল গত অর্থবছরে ৬ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)সহ বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান পুরোনো তথ্য ব্যবহার করে দেশের অর্থনীতি বিশ্লেষণ করেছে। অবশ্য করোনার আগে দেশে ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে রেকর্ড ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল। এর পরের বছরগুলোতে করোনা থাকা সত্ত্বেও ৮ শতাংশের ওপরে প্রবৃদ্ধি থাকবে বলেও অর্থমন্ত্রী বাজেটে প্রত্যাশা করেছেন। তবে চলতি অর্থবছর (২০২১-২০২২) এই প্রত্যাশা কমিয়ে ৭ দশমিক ২ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে।
উল্লেখ্য, প্রতি অর্থবছর সাময়িক যে হিসাব দেওয়া হয়, চূড়ান্ত হিসাবে তার থেকে কিছুটা বেশি প্রবৃদ্ধি লক্ষ করা যায়। কিন্তু এবার কমে গেছে। প্রবৃদ্ধির হিসাব বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ন্যাশনাল একাউন্টিং উইংয়ের পরিচালক (জিডিপি ও বৈদেশিক বাণিজ্য) জিয়াউদ্দীন আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির সাময়িক হিসাব করা হয়েছিল ছয় থেকে আট মাসের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে, তখনো করোনার প্রভাব দেশে শুরু হয়নি। ২০২০ সালের মার্চে করোনার সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর এপ্রিল থেকে দেশের অর্থনীতিতে স্থবিরতা নেমে আসে। কিন্তু সেগুলো হিসাবে আসেনি। চূড়ান্ত হিসাবে সেগুলো উঠে এসেছে, এজন্য প্রবৃদ্ধির হারও কমে এসেছে।
উল্লেখ্য, বিবিএসের হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে দেশে মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২২৭ মার্কিন ডলার। দেশীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ ১ লাখ ৮৮ হাজার ৮৭৩ টাকা। মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) আকার দাঁড়িয়েছে ৩০ লাখ ৮৭ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, প্রবৃদ্ধির সংখ্যা যাই হোক না কেন, এতে বোঝা যাচ্ছে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পথে রয়েছে। সরকারিভাবে প্রবৃদ্ধির যে হিসাব দেওয়া হয়, সেটি নিয়ে বিতর্ক ছিল। তবে সারা বিশ্বে যখন ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তখন ৩ দশমিক ৫১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখাটাও বড় অর্জন। বিদায়ি ২০২০-২০২১ অর্থবছরে ৫ দশমিক ৪৭ শতাংশের সাময়িক হিসাব দেওয়া হলেও চূড়ান্ত হিসাবে এটি আরো কমে আসতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। কারণ, এই হিসাবও ৮ থেকে ৯ মাসের তথ্যের ভিত্তিতে করা হয়েছে। অর্থবছরের শেষ দিকে মার্চ-এপ্রিলে দেশে করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা শুরু হয়েছে। শুরুর দিকে রপ্তানি, উত্পাদন, রাজস্ব আদায় বাড়লেও শেষ দিকে কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তার পরেও অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
কোন খাতে কত প্রবৃদ্ধি :পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রবৃদ্ধির হিসাবে ভিত্তি বছর ধরা হয়েছে ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরকে। কৃষি, শিল্প ও সেবা—এই তিন খাত নিয়ে জিডিপি গণনা করা হয়। স্থিরমূল্যে ২০২০-২০২১ অর্থবছরের সাময়িক হিসাবে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ, শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ১২ শতাংশ এবং সেবা খাতে প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৫ দশমিক ৬১ শতাংশ। অন্যদিকে স্থিরমূল্যে ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাবে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ, শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং সেবা খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ১৬ শতাংশ।