বেসরকারি স্কুল ও কলেজে শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে ভোগান্তি কাটেনি প্রার্থীদের। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) অধীনস্থ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগের জন্য বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) আয়োজিত পরীক্ষায় অংশ নিতে হয় প্রার্থীকে। কিন্তু এ দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি থাকায় দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তির শিকার হয়ে আসছেন প্রার্থীরা।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ৮৯ লাখ আবেদন জমা পড়লেও ১৫ জুলাই ৫১ হাজার ৭৬১ পদে নিয়োগের সুপারিশের জন্য তৃতীয় নিয়োগ চক্রের ফল প্রকাশ করে এনটিআরসিএ। কিন্তু নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে ৩৮ হাজার ২৮৬ জনকে। ১৫ হাজার ৩২৫ জনকে সুপারিশ করতে পারেনি নিয়োগের জন্য সুপারিশের দায়িত্বে থাকা এই প্রতিষ্ঠান। কারণ হিসেবে এনটিআরসিএ জানায়, নারী কোটায় প্রার্থী না পাওয়ায় ৬ হাজার ৭৭৭ জন এবং আবেদন না পাওয়ায় ৮ হাজার ৪৪৮ জনকে সুপারিশ করা হয়নি।
প্রার্থীদের অভিযোগ, সুপারিশকৃত ৩৮ হাজার পদের অর্ধেক পদ ‘ইনডেক্সধারীদের’ দখলে চলে গেছে। অর্থাত্, তারা আগে থেকেই বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। এমপিওভুক্ত হয়েছেন। বেতন-ভাতাও পাচ্ছেন। কিন্তু পছন্দের চাকরি না হওয়ায় নতুন করে আবেদন করেছেন তারা। নম্বর বেশি থাকায় চাকরিরত এসব শিক্ষক নিয়োগ পাচ্ছেন। এতে দুটি সমস্যা হচ্ছে। প্রথমত, বেকার প্রার্থীরা চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন; দ্বিতীয়ত, মোট শূন্য পদের সংখ্যাও খুব একটা কমছে না। যে শিক্ষক নতুন করে অন্য প্রতিষ্ঠানে শূন্য পদে নিয়োগের জন্য আবেদন করবেন, তার আগের পদটি তো শূন্য হয়নি। তিনি অন্য শূন্য পদে নিয়োগ পেলে আগের পূরণকৃত পদটি শূন্য হচ্ছে। ফলে শিক্ষকের সংকট থেকেই যাচ্ছে।
নিয়োগবঞ্চিতরা বলছেন, গণবিজ্ঞপ্তির উদ্দেশ্য এন্ট্রি লেভেল বা প্রবেশনারি পর্যায়ের শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া। কিন্তু এবারের ফলাফলে মনে হচ্ছে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি নয়, বদলি বিজ্ঞপ্তি হয়েছে। প্রার্থীরা বলেন, বদলির প্রত্যাশা করছেন এমন ইনডেক্সধারী এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বিশেষ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আগে বদলির সুযোগ দিতে এবং গণবিজ্ঞপ্তিতে বিভাগীয় প্রার্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের সুযোগের দাবি ছিল প্রার্থীদের। তখন যে পদগুলো শূন্য হবে, সেগুলো এবং নিয়মিত শূন্য পদ সমন্বয় করে পূর্ণাঙ্গ গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হলে নিবন্ধনধারীরা সব শূন্য পদেই নিয়োগের সুযোগ পেতেন। কিন্তু এনটিআরসিএ সেটা করেনি। ফলে কর্মরত শিক্ষকদের সঙ্গে বেকার নিবন্ধনধারীদের প্রতিযোগিতা হলো। সে ক্ষেত্রে বেশি নম্বরধারী কর্মরত শিক্ষকেরাই তুলনামূলক বেশি সুযোগ পেলেন। কম নম্বরপ্রাপ্তরা বেকারই থেকে গেলেন। অথচ এই নিয়োগে প্রার্থীদের ১৫ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হয়েছে, যে টাকা কেউ টিউশনি করে, কেউ জমি চাষ করে, সবজি বিক্রি করে জমিয়েছেন।
প্রার্থীরা বলছেন, মনিরুল নামে এক প্রার্থী ধান বিক্রি করেই ১৯৮টি আবেদন করেন আর প্রতিবার আবেদনে খরচ প্রায় ১১০ টাকা। আয় নেই, তাই বিক্রি শুরু করেন ধান। কিন্তু বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) তৃতীয় নিয়োগ চক্রে সুপারিশ মেলেনি তার।
একজন শিক্ষক অভিযোগ করেন, তিনি ৪০০ আবেদন করে একটি মাদ্রাসায় প্রভাষক পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। আরেক জন ৫০০ আবেদন করেও কোথাও সুযোগ পাননি।
এ বিষয়ে এনটিআরসিএর চেয়ারম্যান এনামুল কাদের খান গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, আগের নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকেরা, অর্থাত্ ইনডেক্সধারীরা নিয়োগ পাচ্ছেন এটা ঠিক। আবেদনেই এই সুযোগ আছে। এসব শিক্ষকের তো বদলির ব্যবস্থা নেই। কত ইনডেক্সধারী নিয়োগ পেয়েছেন, সেই হিসাব করা হয়নি। তিনি বলেন, এক ক্যাডার থেকে অন্য ক্যাডারে যেতে হলে নিয়োগ নিয়েই যেতে হয়। এ ক্ষেত্রে এমনটিই হয়েছে।
তৃতীয় গণবিজ্ঞপ্তিতে উত্তীর্ণ হওয়া প্রার্থী শান্ত বলছেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনটিআরসিএকে উক্ত বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে নতুন করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। ইনডেক্সধারীদের আগে আবেদন সম্পন্ন করে তারপর নতুন প্রার্থীদের আবেদন নেওয়া উচিত। তাহলে ইনডেক্সধারী ও নতুন প্রার্থীরা যেমন সমানভাবে উপকৃত হবে তেমনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক শূন্য থাকবে না।
আরিফুল ইসলাম নামে এক প্রার্থী বলেন, সাধারণত বাংলাদেশের সকল পেশার পরীক্ষায় ভাইভায় উত্তীর্ণ হলেই নিয়োগের সুপারিশপ্রাপ্ত হন কিন্তু একমাত্র এনটিআরসিএর ক্ষেত্রেই ভাইভায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও আবার হাজার হাজার টাকা খরচ করে শিক্ষক হওয়ার জন্য আবেদন করতে হয়, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও বেদনাদায়ক।
সূত্র জানিয়েছে, দেশে বেসরকারি স্কুল কলেজে ৮০ হাজারের মতো পদ শূন্য রয়েছে। এই নিয়োগের পরও অন্তত ৫০ হাজারের বেশি পদ শূন্য থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এনটিআরসিএ ও মাউশির সমন্বয়হীনতায় দীর্ঘদিন ধরেই ভুগছেন লক্ষাধিক প্রার্থী। শূন্যপদ নিয়ে অসত্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য এনটিআরসিএতে আসে আবার কোনো ভুল প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হচ্ছে প্রার্থীদের। এতে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন প্রার্থীরা।
যদিও ভুল তথ্য পাঠানোর জন্য দায়ী করা হয় প্রতিষ্ঠান-প্রধানদের। ইতিমধ্যে ভুল তথ্য পাঠানোর জন্য বেশ কয়েক জন প্রতিষ্ঠান-প্রধানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। এ ভুল বেশি হয়েছে দ্বিতীয় গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিয়োগের ক্ষেত্রে। এর আগে দ্বিতীয় গণবিজ্ঞপ্তিতে ৩৯ হাজার ৩৩৭ জন প্রার্থী সুপারিশ করে এনটিআরসিএ। কিন্তু সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও বিপাকে পড়েন অনেক প্রার্থী। কেননা এনটিআরসিএ সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই না করেই, চাহিদাকৃত প্রতিষ্ঠানে প্রার্থী সুপারিশ করেছে। আর সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থী নানাবিধ সমস্যার কারণে যোগদান করতে পারেনি। দেখা যায়, শিক্ষকের পদ শূন্য নয়, তবুও পদ শূন্য দেখানো হয়েছে। ফলে প্রার্থী যোগদান করতে পারেননি। অথবা যোগদান করলেও এমপিওভুক্ত হতে পারেননি। প্রতিষ্ঠান-প্রধানের ভুলের কারণে যেসব প্রার্থী এসব ভুল পদে যোগদান করেছেন তারা এমপিওভুক্ত হতে না পেরে বিনা বেতনে চাকরি করে আসছেন। যদিও ১ হাজার ২০০ নতুন সুপারিশ করেছিল এনটিআরসিএ।
শারীরিক শিক্ষার পরিবর্তে ভৌতবিজ্ঞান বিষয়ে চাহিদা পাঠানো হয়েছিল। অনেক প্রতিষ্ঠান ফিজিক্যাল এক্সারসাইজ (শরীরচর্চা) এর পরিবর্তে ফিজিক্যাল সাইন্স (ভৌতবিজ্ঞান) এর চাহিদা পাঠিয়েছিল। কম্পিউটার সাইন্সের পরিবর্তে কম্পিউটার অপারেশন বিষয়ে চাহিদা দেওয়া হয়। কম্পিটার সাইন্স বা আইসিটি হলো সাধারণ কলেজে আবশ্যিক বিষয় আর কম্পিউটার অপারেশন বিএম কলেজে পড়ানো হয়। মহিলা কোটায় পুরুষ প্রার্থীকে সুপারিশ করা হয়। এতেও যথেষ্ট ভোগান্তিতে পড়তে হয় প্রার্থীদের।