মেলবন্ধন, সহযোগিতা, ভালোবাসা ও সুখ-দুঃখের সারথি হয়ে মানবজাতি সমাজবদ্ধভাবে বসবাসের মাঝেই যেন সামাজিক জীবের স্বরূপ এবং স্বকীয়তা তালাশের পরিপূর্ণতা খুঁজে বেড়ায়। শিশু জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি সামাজিক পরিমণ্ডলে নিজেকে বিকশিত, প্রকাশিত ও প্রসারিত করার অবারিত মওকার সন্ধান পায়। এ ক্ষেত্রে বংশগতি এবং পরিবেশের ভূমিকা দৃশ্যমান।
মানুষ যেহেতু সমাজে একা চলতে পারে না বা পারা সম্ভবও নয়, সে ক্ষেত্রে বিদ্যমান সামাজিকীকরণের উপাদানের সিঁড়ি বেয়েই মনজিলে মকসুদে আরোহণের রসদ পায়। এ যেন অবারিত ক্ষেত্র যেখানটায় পবিত্র বিচরণের প্রভাবে আলোকিত এবং মানবিক গুণাবলির কৌশল রপ্ত করা যায় এবং প্রকারান্তরে নানাবিধ নেতিবাচক গুণাবলি দ্বারা ব্যক্তি ও সামাজিক জীবন ধূসর ও কালিমাযুক্ত হয়।
যা কারোই কাম্য নয়। এসব উপাদানের সাম্প্রতিক হালচাল অনুরণনে আমাদের দিব্যলোকে কি দেখতে পাই? কোথায় যেন শূন্যতা? সামাজিকীকরণের উপাদানগুলো কি কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারছে? ব্যর্থতার কারণ কিই বা কি হতে পারে?খতিয়ে দেখার যেন ফুসরত নেই। এভাবে কি চলতে থাকবে? তাহলে গন্তব্য কোথায়?
সামাজিকীকরণের প্রপঞ্চকে যদি বিশ্লেষণ করি তাহলে সহজেই অনুমেয় হয়, যে প্রণালী নিয়ম-নীতি দ্বারা মানব শিশু পূর্ণাঙ্গ সামাজিক মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে তার শিক্ষা পাওয়া যায়।
যেখানটায় সমাজবিজ্ঞানী অগবার্ন বলেছেন, ‘সামাজিকীকরণ হল এমন এক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে ব্যক্তি, গোষ্ঠীর নিয়ম মেনে চলতে শেখে।’ প্রত্যেকটা মানুষেরই দুটো পরিচয় থাকে যা ব্যক্তিগত এবং সামাজিক প্রকরণে সীমাবদ্ধ। ব্যক্তিগত বিষয় দ্বারা অনেক সময় সমাজ প্রভাবিত হয় না, কিন্তু সামাজিক জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ এবং সিদ্ধান্ত সমাজ বাস্তবতার মানদণ্ডে বেশ প্রভাবশালী এবং প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।
এ্যারিস্টটল পলিটিক্স-এ তাই বলেছেন মানুষ স্বভাবত ই সামাজিক ও রাজনৈতিক জীব। সে সমাজে জন্মগ্রহণ করে এবং লালিত-পালিত হয়। যে লোক সমাজের সভ্য নয় সে হয় দেবতা না হয় পশু।
সামাজিকীকরণের যৌক্তিক কার্যকর এবং মৌলিক সবকটা শুরু হয় মূলত পারিবারিক পরিমণ্ডলে। যেখানটায় সে ধীরে ধীরে বিকশিত হয়। সময়ের পরিক্রমায় আমাদের পারিবারিক অনুশাসন গতিপ্রকৃতি পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া ব্যক্তিস্বার্থের আস্ফালন এসব প্রপঞ্চের মাত্রাতিরিক্ত পরিবর্তনে পারিবারিক আবহে বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে কোথায় যেন চিড় ধরেছে।
যেখানটায় মায়া-মমতা আন্তরিকতা শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসায় পরিবর্তনের হাওয়া দৃশ্যমান। পরিবারের শিক্ষিত কর্তা ব্যক্তি যদি দুর্নীতি ও অনিয়মে নিমজ্জিত থাকে নানা অসঙ্গতি যদি অবলীলায় হজম করে আর যাই হোক সেই পরিবেশে মানবিক সামাজিক শিশুর বিকাশ প্রায় অসম্ভব।
সামাজিকীকরণের সর্বাধিক জরুরি এবং কার্যকরী অনুষঙ্গ হল শিক্ষাঙ্গন। নানা বর্ণের জাতের ধর্মের সংস্কৃতির মেলবন্ধন বন্ধনে পরিপূর্ণ বিকাশের সহায়ক সঞ্জীবনী হিসেবে এ উপাদানের যথেষ্ট গুরুত্ব ও কদর রয়েছে। একজন শিশু বিদ্যালয়ের পরিবেশে শৃঙ্খলা দায়িত্ববোধ দেশপ্রেম দায়বদ্ধতা সহনশীলতা পরোপকারী মনোভাবসহ নানাবিধ গুণাবলির চর্চা এবং লালনের সুযোগ পায়। বিদ্যানিকেতনগুলো কি সঠিকভাবে তার ভূমিকা পালন করতে পারছে?
শিক্ষক সমাজ এ ক্ষেত্রে কতটুকু কার্যকর এবং অনুসরণীয় ভূমিকা রাখতে পারছে? আজ কেন শুনতে হয় শিক্ষকের কাছে ছাত্রীর ইজ্জত-আব্রু অনিরাপদ? আমরা এ কোন সমাজে বসবাস করছি? যেখানে সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় কোমলমতি শিক্ষার্থীরা তার গুরু কর্তৃক মূল্যায়িত হয়। সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত পরিবারের সন্তানের প্রতি আলগা নজরের হেতু কি? এ বৈষম্য অস্থিরতা কি সামাজিকীকরণের বৈকল্যতাকেই ইঙ্গিত করে না? বিদ্যালয় নীতি নৈতিকতার চর্চার সূতিকাগার। সেই জায়গাটায় কী না আজ লিঙ্গবৈষম্য কোচিং-বাণিজ্য প্রশ্নপত্র ফাঁস দালালি এবং চাটুকারিতায় পরিপূর্ণ। তাহলে আমরা যাব কোথায়? সৌন্দর্য এবং বংশ পরিচয় দিয়ে কোমলমতির মূল্যায়ন হওয়ার কথা নয়। কারণ এ দুটোর ক্ষেত্রে কারোই হাত থাকে না।
যদি এক্ষেত্রে কিছু করার থাকতো তাহলে সবাই ভালো বংশ এবং সৌন্দর্য নিয়ে পৃথিবীতে আসতো। অথচ আমরা একি দেখছি? সামান্য শারীরিক সৌন্দর্যকে পুঁজি করে বেহায়াপনা এবং অশ্লীলতার চর্চার লাগামহীন বাসনার ফলে অনেকেই রাতারাতি গাড়ি-বাড়ির মালিক বনে যাচ্ছে। এসব কিসের আলামত? অথচ মানুষের মর্যাদা নির্ণীত হওয়ার কথা ছিল তার কর্মের দ্যুতিতে। যেখানটায় আজ বেশ ফারাক।
প্রতিবেশী এবং খেলার সাথীরা ও কিন্তু সামাজিকীকরণের বাহন হিসেবে ভূমিকা রেখে আসছে। আজ যেন এসব অতীত। আজকের শিশুরা কি প্রাণখুলে সুযোগ পাচ্ছে প্রতিবেশী এবং খেলার সাথীর সাথে মিশে অনাবিল আনন্দ সুখ অনুভব করতে? এ শতাব্দীতে আমাদের বাহ্যিক উন্নয়নের অসামান্য গতি হলে ও মনোসামাজিক বিকাশ যেন কোথায় থমকে গেছে।
প্রতিবেশীর কাজকামে যেমন আমাদের হাসায় বা কাঁদায় না তেমনি আমরা ও তাদের সুখ-দুঃখে তেমন অংশ নেই না। আগামী প্রজন্ম কি শিখছে? যার কারণে লোকালয়ে নির্বিঘ্নে শাহেদ সাবরিনা হেলেনা দর্জি মনির পরিমণিরা দিব্যি ঘুরে বেড়ায়। এসব অসুস্থ এবং অকার্যকর সামাজিকীকরণের কিঞ্চিৎ নমুনা মাত্র। রীতিনীতি আদব-কায়দা অলিখিত নিয়ম কানুন প্রথা দ্বারা সমাজ পরিচালিত হয়ে আসছে। এ সময়ে এসে কি দেখছি? শ্রদ্ধা ও স্নেহে বৈষম্য, প্রীতি ও আবেগে অনিয়ম। যা কী না সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে বিপত্তি তৈরি করছে।
মানব হিসেবে সামাজিকতা মানবিকতার তকমাকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। এ সমাজে সব কিছুর উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও একা বসবাস করা সম্ভব নয়। সময় এসেছে এসবে মনোযোগী হওয়ার। শৈশবে ঘুড়ি ওড়ানোর ঘটনা যদি বিশ্লেষণ করি তাহলে কী দেখতে পাই? নাটাই এবং ঘুড়ি এ দুয়ের মাঝে বিশাল যোগসূত্র রয়েছে। ঘুড়ি আকাশে উড়ে এবং নাটাই ধরে রাখতে হয়। এক্ষেত্রে নাটাই ছেড়ে দিলে ঘুড়ি আকাশে অনেক ওপরে উঠে যায় এবং একসময় তা অদৃশ্য হয়ে যায়। ঠিক তেমনি জীবন চলার ক্ষেত্রে যদি নাটাই হিসেবে সামাজিকীকরণের উপাদানের সাথে সম্পর্ক না রাখি তাহলে হয়তো উন্নয়ন এবং সাময়িক অগ্রগতি হবে।
কিন্তু নাটাইবিহীন ঘুড়ি যেভাবে অদৃশ্য হয়ে হারিয়ে যায়, তেমনি আমরাও এসবের বিচ্ছিন্নতার ফলে হারিয়ে যেতে বাধ্য হবো। মানবজাতির জন্য যা অশনি সংকেত। সামাজিকীকরণের মাঝেই মানবের পরিপূর্ণতা। অতএব এ থেকে পালানোর এবং অবহেলার সুযোগ নেই। দুধ থেকে যেমন মাখন, ঘি, দই ও পনির মিষ্টিসহ নানা পদের দ্রব্যাদির জন্মায়, তেমনি শিশুকে যদি যথার্থ সামাজিকীকরণের মাঝে পরিচর্যা করা যায় তাহলে শিশুরা ও সোনালী এবং কাঙ্ক্ষিত আগামীর কাণ্ডারি হতে পারে। সময় এসেছে এসব ভেবে দেখার। আশা এবং বিশ্বাসে এ যাত্রায় আমাদের ঘুম ভাঙবেই।
লেখক: শিক্ষক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
ইত্তেফাক/এএএম