পুলিশের মধ্যস্থতায় মিশরীয় তরুণী ফিরে পেল তার ভালোবাসার সংসার

বিশেষ প্রতিনিধি

বাংলাদেশ পুলিশের একটি বৃহত্তম ইউনিট হলো ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। অপরাধ দমন, আইনশৃঙ্খলার উন্নয়নসহ প্রায় ২ কোটি জনগণের এ মহানগরীর নিরাপত্তায় সদা তত্পর ডিএমপির প্রায় ৩৩ হাজার পুলিশ সদস্য। বিভিন্ন ধরনের অপরাধ দমনের পাশাপাশি নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা রুখতে এবং তাদের দ্রুত সহায়তা দিতে কাজ করছে ডিএমপির উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন। এই ডিভিশনের মধ্যস্থতায় মিশরীয় তরুণী ইমাম হোসেন ফিরে পেলেন তার ভালোবাসার সংসার। মিশরীয় অল্পবয়সি তরুণী ইমাম ভালোবেসে বিয়ে করে চাঁদপুরের ৩০ বছর বয়সি নূর সুজনকে। বাংলাদেশি তরুণ সুজনকে বিয়ের পর এই তরুণী অনেক স্বপ্ন নিয়ে সুদূর মিশর থেকে বাংলাদেশে চলে এসেছিলেন ২০২০ সালের অক্টোবরে।

নূর সুজন ২০০৮ সালে সৌদি আরবে গিয়ে সেখানে ভালো কিছু করতে না পেরে ভিজিট ভিসায় ইন্ডিয়া, নেপাল, মালয়েশিয়া, চীন ঘুরে ২০১৯ সালে তার মামার সহযোগিতায় ট্যুরিস্ট ভিসায় মিশরে গমন করেন। সেখানে ব্যবসা করে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সংগ্রামে নামেন সুজন। মিশরে বসবাসরত মামার পরামর্শে তরুণী ইমাম হোসেনের সঙ্গে ২০১৯ সালের ৫ মে মিশরীয় আইন অনুযায়ী বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন সুজন। বৈশ্বিক মহামারি করোনার নেতিবাচক প্রভাবে ব্যবসার ক্ষতি হওয়ায় আর্থিক সংকটে পড়েন সুজন। ইমামের পরিবার থেকেও কোনো সহায়তা না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা মিশরীয় বধূকে নিয়ে সুজন ২০২০ সালের ৬ অক্টোবর বাংলাদেশে চলে আসেন। বাংলাদেশেই জন্ম নেয় সুজন-ইমামের পুত্র মালেক। প্রথম দিকে সব কিছুই ঠিকঠাক চলছিল কিন্তু পরে শুরু হয় দুই দেশের সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব। নূর সুজনের উপার্জন না থাকায় তার পরিবারের অন্য সদস্যরা মিশরীয় বধূকে আর সহ্য করতে পারছিলেন না। শুরু হয় সংঘাত। ইমামকে পড়তে হয় কঠিন পরীক্ষায়। দিনদিন বৈরী আবহাওয়া, ভাষা ও সংস্কৃতিগত পার্থক্যে ইমামের স্বপ্ন ভেঙে যেতে থাকে। দিনদিন সুজন ও ইমামের মধ্যে তিক্ততা বেড়েই চলে এবং এক পর্যায়ে শারীরিক নির্যাতনও শুরু হয় ইমামের ওপর। ইমাম তার কষ্টের কথা মাকে জানালে ঘটনার নাটকীয় মোড় নেয়।

ইমামকে নির্যাতনের বিষয়টি তার মা বাংলাদেশস্থ মিশরীয় দূতাবাসকে জানান। ভিকটিমের মায়ের এ অভিযোগ মিশরীয় দূতাবাস ডিএমপির ডিপ্লোমেটিক ডিভিশনকে অবহিত করে মেয়েটিকে দ্রুত উদ্ধার করার অনুরোধ করে। ডিএমপির ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশে ওয়ারী বিভাগ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে মিশরীয় নাগরিক ইমামকে তার স্বামী নূর সুজনের হেফাজত থেকে ২৬ জুলাই উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে।

থানাপুলিশ ভিকটিম ইমাম ও তার আট মাসের পুত্র মালেককে ২৬ জুলাই নিরাপদ হেফাজতসহ পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনে প্রেরণ করে। এ ডিভিশন ইমাম ও তার সন্তানের রুচি অনুসারে খাবার, পোশাক ও অন্যান্য সব প্রয়োজনীয় জিনিসের ব্যবস্থা করে। ভিকটিম ইমামের মানসিক বিপর্যয়কে কাটিয়ে তুলতে নানা প্রচেষ্টা চালান তারা। ইমামকে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় নিয়ে গুগল ট্রান্সলেটরের মাধ্যমে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে ইমামের স্বামী সুজনের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বলার ব্যবস্থা করেন তারা। তাদের হারানো ভালোবাসা পুনরুদ্ধারে এবং সেই সঙ্গে সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য স্বামী সুজনকে আর একবার সুযোগ দিতে ইমামকে অনুরোধ করে ডিএমপি। ইমাম কিছুটা বাংলা বোঝায় প্রতিদিন উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন টিম ইমামের সঙ্গে বারবার কথা বলতে থাকে। অবশেষে ইমাম এই ডিভিশনের নারী পুলিশের কাছে তার মনের সব কষ্ট শেয়ার করে। ডিভিশনের কর্মকর্তারা জানতে পারেন যে, মিশরীয় ভিকটিম ইমাম আবারও মা হতে যাচ্ছেন।

সুজন-ইমামের সংসার টিকিয়ে রাখতে এবার বদ্ধপরিকর হন উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনের কর্মকর্তা উপ-পুলিশ কমিশনার হামিদা পারভীন। মায়ের মমতা দিয়ে তিনি ইমামকে বোঝাতে থাকেন। তার নিরলস প্রচেষ্টা অবশেষে আলোর মুখ দেখে। পরবর্তী সময়ে মিশর দূতাবাস প্রতিনিধির উপস্থিতিতে ইমাম আবার তার সংসারে ফিরে যাবার এবং স্বামীর সঙ্গে বাংলাদেশে থাকতে চাওয়ার কথা জানান। মামলা করার প্রক্রিয়া থেকে সরে আসে ইমাম। কিছু শর্তসাপেক্ষে আর একবার সুযোগ দিতে চায় বাংলাদেশি স্বামী সুজনকে। মিশরীয় তরুণী তার ভালোবাসার সংসার ফিরে পাবে, সব সমস্যার সমাধান হবে—এটা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন টিম উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনের কর্মকর্তারা।