নারায়ণগঞ্জ কোভিড হাসপাতাল
হাবিবুর রহমান বাদল, নারায়ণগঞ্জ
নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা হাসপাতালে ৩৫০-এরও বেশি সিলিন্ডার আর সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্ল্যান্ট থাকলেও করোনা রোগীরা বাইরে থেকে মোটা অঙ্কের টাকায় অক্সিজেন সিলিন্ডার ভাড়া আনছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। শুধু সিলিন্ডারই নয়, অক্সিজেন সিলিন্ডারের মিটারটি পর্যন্ত কিনতে হচ্ছে কোনো কোনো রোগীকে। সময়মতো ডাক্তার থাকে না ওয়ার্ডে। নার্স-ওয়ার্ডবয়দের ডেকেও পাওয়া যায় না। এরই মধ্যে করোনার টিকা নিতে আসা সুস্থ মানুষের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। প্রতিদিন টিকা নিতে আসা কয়েক হাজার মানুষের মধ্যে অনেকেই দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন করোনা পরীক্ষার লাইনে আর করোনা পরীক্ষা করাতে আসা লোকেরা দাঁড়াচ্ছেন টিকার লাইনে। এভাবেই চলছে এ হাসপাতালের কার্যক্রম। চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের অর্ধেকই চলে গেছেন অবসরে, আর যারা আছেন তারা পঞ্চাশোর্ধ। আউট সোর্সিংয়ে নিয়োগ পাওয়া ৪০ জন কর্মচারী বেতন পাচ্ছেন না দুই মাস ধরে—এমন অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। দুপুরে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা.আবুল বাশার হাসপাতাল ত্যাগের পর বেশির ভাগ চিকিত্সকই ডিউটি রোস্টারে উপস্থিত থাকলেও বাস্তবে দেখা মিলে না করোনা ওয়ার্ডে।
রোগীর স্বজনরা অভিযোগ করে বলছেন, হাসপাতালের কোনো চিকিত্সক পিপিই পরিহিত অবস্থায় ওয়ার্ডে আসেন না। বিশেষ করে রাতের বেলায় হাসপাতালটিতে ডাক্তার পাওয়া যেন ‘সৌভাগ্য’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে দিনের বেলায় সুপারের রুমে জরুরি মিটিংয়ের নামে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেখা মিলে তাদের। এমন চরম অব্যবস্থাপনা, উদাসীনতা, সমন্বয়হীনতার, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, চরম অনিরাপত্তার মধ্য দিয়ে চলছে নারায়ণগঞ্জের একমাত্র কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল। নারায়ণগঞ্জ ক্লাবসহ একাধিক সংস্থা হাসপাতালে অক্সিজেন সিলিন্ডার সরবরাহ করে। গত মাস থেকে সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্ল্যান্ট চালুর পরও রোগীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছে না। কোভিড হাসপাতালে ৩৭০টি অক্সিজেন সিলিন্ডার ও সেন্ট্রাল অক্সিজেন সুবিধা থাকার পরও অক্সিজেনের হাহাকার চলছে হাসপাতালটিতে। চারটি করোনা ওয়ার্ড সরেজমিনে ঘুরে কমপক্ষে ২০ জন রোগী পাওয়া গেছে, যারা বাইরে থেকে মোটা অঙ্কের টাকায় অক্সিজেন সিলিন্ডার ভাড়া করে আনতে বাধ্য হয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রোগীর স্বজনরা অভিযোগ করেন, একবার অক্সিজেন সিলিন্ডার দেওয়ার পর কখনো ৬ ঘণ্টা কখনো এক দিন পেরিয়ে যায় অক্সিজেনের দেখা মিলে না। কখনো সিলিন্ডার মিললেও মিটার দেওয়া হয় না। ফলে সিলিন্ডারের মিটারটি পর্যন্ত বাইরে থেকে কিনছেন তারা। কয়েকজন সংকটাপন্ন রোগীর স্বজনরা জানান, ‘চিকিত্সাসেবা যা পাচ্ছি তা নার্সরাই করছেন। ডাক্তারদের দেখা পাওয়া এখানে কষ্টকর।’ তারা বলেন,‘ অক্সিজেন সিলিন্ডার সাজিয়ে রাখা হয়েছে অথচ রোগীদের তা দেওয়া হচ্ছে না। বাইরে থেকে একটি সিলিন্ডার আনতে কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা জমা রাখতে হচ্ছে। প্রতিবার তা বলে আনা এবং সিলিন্ডার ভাড়া লাগছে দুই থেকে আড়াইহাজার টাকা। অথচ শুনেছি দোতলায় ২৫টি বেডে সেন্ট্রাল অক্সিজেন দেওয়া আছে।’
এদিকে হাসপাতালে কোনো অক্সিজেন সংকট নেই বলে দাবি করেছেন তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবুল বাশার। তিনি জানান, রোগীর তুলনায় অক্সিজেন সিলিন্ডার পর্যাপ্ত থাকার পাশাপাশি সেন্ট্রাল অক্সিজেনে ১০টি আইসিইউ বেডের পাশাপাশি ২৫টি আইসোলেশন বেডে অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে। বাইরে থেকে অক্সিজেন কিনে আনার বিষয়টি জানেন না বলে দাবি করে তিনি বলেন, তার অনুমতি ছাড়া বাইরে থেকে কেউ অক্সিজেন আনলে তা হাসপাতালের আইন পরিপন্থি। তবে স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘন হচ্ছে বলে স্বীকার করে ডা.আবুল বাশার বলেন, হাসপাতালের লোকবলের অভাবে সেটি করা সম্ভব হচ্ছে না। চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর মধ্যে অর্ধেকই অবসরে এবং বাকিদের বেশির ভাগই পঞ্চাশোর্ধ। সরকারি নিয়মানুযায়ী এই বয়সের কর্মচারীদের করোনা রোগীদের সেবায় নিয়োজিত করা যাচ্ছে না। আউট সোর্সিংয়ে নিয়োগ পাওয়া ৪০ জন কর্মচারী বেতন পাচ্ছেন না দুই মাস ধরে। বারবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বলেও লোকবল বাড়ানো যাচ্ছে না। তাই পরিচ্ছন্নতা বা ব্যবস্থাপনায় বেগ পেতে হচ্ছে। তবে চিকিত্সকরা নিয়মমতো ডিউটি করছেন বলে দাবি করেন তিনি।