করোনা মহামারির লাগাম টানা সম্ভব হচ্ছে না। মহামারির একের পর এক ঢেউয়ে দেশে দেশে চিকিত্সাব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। তাকে সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। পৃথিবীতে যুগে যুগে অসংখ্য মহামারির ঘটনা ঘটেছে এবং এসব মহামারিতে মৃত্যু হয়েছে কোটি কোটি মানুষের। চিকিত্সাবিজ্ঞানের অগ্রগতির এই সময়েও করোনা ভাইরাস মহামারি যেভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে বিশ্বকে, এর চেয়েও ভয়াবহ মহামারির অভিঘাত সয়ে এসেছে মানুষ। কোনো কোনো মহামারির প্রভাব এতটা তীব্র হয়েছে যে, তাতে বদলে গেছে সভ্যতার গতিপথ। এসব মহামারির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে—প্লেগ, ফ্লু, কলেরা, যক্ষ্মা, কুষ্ঠ, ইনফ্লুয়েঞ্জা, গুটিবসন্ত বিভিন্ন রোগ নানা সময়ে মহামারির আকার নিয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে অর্ধশতাধিক মহামারির তথ্য পাওয়া যায়। সেসব মহামারির তাণ্ডবে মানবজাতিকে বড় পরীক্ষা দিতে হয়েছে। সর্বশেষ কোভিড-১৯ মহামারি মানবজাতির কঠিন পরীক্ষা নিচ্ছে।
প্লেগ :প্লেগের আভিধানিক অর্থ মহামারি। সবচেয়ে পুরোনো মহামারি ধরা হয় একেই। চিকিত্সাবিজ্ঞানীদের মতে, প্রায় ৩০ হাজার বছর আগেও পৃথিবীতে প্লেগ রোগের উপস্থিতি ছিল। কোন কোন গবেষকের মতে, ২ হাজার বছর আগে চীনে প্লেগের জন্ম। অন্যদের ভাষ্য, মহামারি প্লেগের জন্ম এশিয়ার মধ্যাঞ্চলে। ‘ব্ল্যাক ডিজিজ’ বা ‘কালো রোগ’ অথবা ‘বুবোনিক প্লেগ’ নামে পরিচিতি রয়েছে এর। ৫৪১ সালে রোগটি মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে। শুরুটা হয়েছিল মিশর থেকে। এরপর বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য এবং সেখান থেকে পুরো ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এই প্লেগ। কনস্টানটিনোপল থেকে এই রোগ ইউরোপ, এশিয়া, উত্তর আমেরিকা ও আরব অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল।
১৩ শতকের শুরুতে প্লেগ এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে ছড়াতে থাকে রোগীর মাধ্যমে। আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, প্লেগের মূল বাহক ছিল ইঁদুর। বলা হয়ে থাকে, ভয়ংকর এই মহামারিতে প্রায় ৫ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।
গুটিবসন্ত :ভয়ানক গুটিবসন্ত রোগে গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে গিয়েছে। আমাদের দেশে এটি ওলাওঠা, ওলাবিবি ও বসন্তবিবি নামে বেশি পরিচিত। এই রোগে মানুষের মুখমণ্ডলসহ সারা শরীরে দাগ পড়ে যায়। আক্রান্তদের অনেকে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলত। ‘ভ্যারিওলা’ নামক ভাইরাস থেকে জন্ম নেওয়া এই মহামারিতে বিশ্বের অসংখ্য মানুষ মারা যায়। রোগের প্রথম প্রমাণ মেলে খ্রিষ্টপূর্ব তিন শতকের মিশরের মমিগুলোয়। ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে আর্চবিশপ মেরিয়াস সংক্রামক ভাইরাসটির নামে রোগটির নাম রাখলেন ‘ভ্যারিওলা’। ৯০০ খ্রিষ্টাব্দে পারস্য চিকিত্সাবিজ্ঞানী আল-রাজি এর উপসর্গের বিবরণ দেন। ১৭৬৭ সালে উইলিয়াম হেবারডেন গুটি ও জলবসন্তের পার্থক্য করলেন। এই রোগের প্রাদুর্ভাবে ১৮ শতকে ইউরোপে প্রতি বছর গড়ে ৪ লাখ লোক মারা যেত। যাদের তিন ভাগের এক ভাগ অন্ধ হয়ে যায়। ১৭৯৬ সালে ইংরেজ চিকিত্সক এডওয়ার্ড জেনার রোগটির টিকা আবিষ্কার করেন। ডা. জেনারের টিকার মাধ্যমে মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়ংকর এই মহামারিটিকে নির্মূল করা শুরু হয়। ডা. জেনারের টিকার উন্নয়ন ও প্রয়োগেই ১৯৭৭ সালে বিশ্ব থেকে গুটিবসন্ত ও জলবসন্ত রোগ নির্মূলের ঘোষণা আসে।
কলেরা :কলেরার উত্পত্তি ‘ভিব্রিও কলেরা’ নামক একটি বিশেষ জীবাণু থেকে। এটি প্রধানত পেটের রোগ। দূষিত পানি ও অনিরাপদ খাবার থেকে ছড়ায়। এ রোগের কারণে বারবার পাতলা পায়খানা হতে থাকে। রোগী পানিশূন্য হয়েই মৃত্যুবরণ করেন। রোগীর শরীর থেকে প্রচুর পানি ও লবণ বেরিয়ে যায়। শরীরের তরল পদার্থ কমে গিয়ে শারীরিক ভারসাম্যহীনতা তৈরি করে। কলেরা মহামারি আকার ধারণ করলে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে বিশ্ব জুড়ে হাজার হাজার মানুষ মারা যায়। ১৮৮৩ সালে জার্মান বিজ্ঞানী রবার্ট কখ প্রথম কলেরার জীবাণু চিহ্নিত করেন। এক বছর পর স্প্যানিশ চিকিত্সক হেইমে ফেররান রোগীদের জন্য মার্সিলিনের টিকা তৈরি করেন। ওয়ালডেমার হাফকিনকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে এমন একটি কলেরা রোগের টিকা তৈরি করেন। ১৯০২ সালে উইলহেলম কোল নামের আরেক বিজ্ঞানী কলেরার টিকা আবিষ্কার করেন। পরবর্তীকালে কলেরার টিকা চিকিত্সাবিজ্ঞানে অভাবনীয় সাফল্য এনে দেয়। ১৯৯০ সাল থেকে বিশ্ব জুড়ে এই রোগের টিকা ব্যবহূত হয়ে আসছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, উন্নত দেশগুলোতে কলেরার প্রকোপ অনেকটাই দূর হয়েছে। তবে আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে এখনো কলেরা রোগে অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে।
পোলিও :এটি মারাত্মক সংক্রামক রোগ। পোলিওমায়েলাইটিস এক প্রাণঘাতী প্যারালাইটিক রোগ, যা রোগীর পেশিতে সারা জীবনের স্থায়ী দুর্বলতার জন্ম হয়, যা শিশুদের ক্ষতিগ্রস্ত করে। রোগটি একসময় মহামারি আকার ধারণ করেছিল। অস্ট্রিয়ার জীববিজ্ঞানী কার্ল ল্যান্ডস্টেইনার ও আরউইন পপার ১৯০৯ সালে পোলিওর ভাইরাস চিহ্নিত করেন। ১৯৫০ সালে মার্কিন গবেষক জোনাস সল্ক প্রথম পোলিওর টিকা আবিষ্কার করেন।
যক্ষ্মা :১৮ ও ১৯ শতকে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় যক্ষ্মা মহামারি আকার ধারণ করেছিল। ১৮৮২ সালে জার্মান বিজ্ঞানী রবার্ট কখ রোগটি চিহ্নিত করেন। ১৯২১ সালে প্যারিস পাস্তুর ইনস্টিটিউটে প্রতিষ্ঠানটির রোগপ্রতিরোধ বিজ্ঞানী ক্যামি গিরহা যক্ষ্মার টিকা আবিষ্কার করেন। এর পর থেকে বিশ্ব জুড়ে বাসিলুস-কলেমেথ-গিরহা (বিসিজি) নামের টিকাটি শিশুদের যক্ষ্মা প্রতিরোধে দেওয়া হচ্ছে। যক্ষ্মার আরো নানা ওষুধ আবিষ্কার ও ব্যবহারে বিশ্ব জুড়ে মহামারি রোগটির প্রকোপ কমে আসে।
ইয়েলো ফিভার :ইয়েলো ফিভার (পীতজ্বর) ভাইরাসঘটিত রোগ। ইয়েলো ফিভার নামক ভাইরাস থেকে রোগটি ছড়ায়। এটি মশাবাহিত রোগ। ১৬৪৭ ও ১৬৪৮ সালে বার্বাডোস দ্বীপে ও গুয়েদালুপ দ্বীপে ইয়েলো ফিভার মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে। ইয়েলো ফিভার উত্তর আমেরিকায় যায় ১৬৬৮ সালে। বোস্টনে মহামারি ছড়িয়ে পড়ে ১৬৯১ সালে। এর কয়েক বছর পরই ছড়িয়ে পড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ায়। মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশ মারা যায়। আমেরিকা থেকে ছড়ায় ২৭টি দেশে।
এইডস :হিউম্যান ইমিউনোডিফিসিয়েন্সি ভাইরাস-এইচআইভি প্রথম শনাক্ত হয় ১৯৮০-এর দশকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, বর্তমানে আনুমানিক ৩ কোটি ৬৯ লাখ মানুষের দেহে এই ভাইরাস রয়েছে। বিশ্ব জুড়ে এইডসে প্রাণ হারিয়েছেন ৩ কোটি ৪০ লাখের বেশি মানুষ। এখনো চিকিত্সা আবিষ্কার না হওয়া এই রোগ ইতিহাসের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক মহামারির একটিতে পরিণত হয়েছে। লাইভসায়েন্স ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, ১৯২০-এর দশকে পশ্চিম আফ্রিকায় শিম্পাঞ্জি থেকে এইচআইভি ভাইরাস মানুষের দেহে যায়। এরপর ভাইরাসটি বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে উনিশ শতকের শেষ দিকে বৈশ্বিক মহামারিতে রূপ নেয়। বর্তমানে ৩ কোটি ৬৯ লাখ মানুষের দেহে এই ভাইরাস রয়েছে। তাদের প্রায় ৬৪ শতাংশই সাব-সাহারা আফ্রিকার। চার দশকেও এই রোগের প্রতিকার আবিষ্কৃত হয়নি। তবে নব্বইয়ের দশকে কিছু ওষুধ বেরিয়েছে, যাতে সেগুলো নিয়ে আক্রান্তরা স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে। ২০২০ সালের প্রথম দিকে দুই ব্যক্তি এইচআইভি থেকে সেরে উঠেছেন বলে জানিয়ে লাইভসায়েন্স।
ইনফ্লুয়েঞ্জা :এখন ইনফ্লুয়েঞ্জাকে খুব সাধারণ জ্বর মনে করা হলেও ভাইরাসজনিত রোগটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯১৮ সালে মহামারি আকার ধারণ করে। এতে আক্রান্ত হয়ে প্রায় ৫ কোটি মানুষ মারা যায়। ইতিহাসে এটি স্প্যানিশ ফ্লু নামে পরিচিত। ১৯৫৭-১৯৫৮ সালে এশিয়ায় ইনফ্লুয়েঞ্জার সংক্রমণ ঘটলে প্রায় ১০ থেকে ১৫ লাখ মানুষ মারা যায়। এশিয়ান ফ্লু নামে এই মহামারি চিহ্নিত হয়ে আছে।