বহুল আলোচিত সমালোচিত গ্রেফতারকৃত চিত্রনায়িকা পরীমনির রিমান্ডে দেওয়া তথ্যের সূত্র ধরে নাট্য নির্মাতা চয়নিকা চৌধুরীকে আটক করেছে পুলিশ। শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানীর পান্থপথে পানি ভবনের সামনে চয়নিকা চৌধুরীর গাড়ি থেকে পুলিশ তাকে আটক করে। তবে তাকে আটক করে কোথায় নেওয়া হয়েছে-এ ব্যাপারে পুলিশের কোন শীর্ষ কর্মকর্তাই মুখ খোলেননি। এ ব্যাপারে চয়নিকা চৌধুরীর স্বামী অরুণ চৌধুরী গতকাল সন্ধ্যায় বলেন, আমরা সাংবাদিকদের মাধ্যমে জানতে পেরেছি যে পান্থপথ এলাকায় পুলিশ চয়নিকার গাড়িতে উঠে পড়ে। পরে তার গাড়িটি মতিঝিল এলাকায় যাওয়ার পর আর কেউ খুঁজে পায়নি। তবে আমি ডিবিতে খোঁজ নিয়ে জেনেছি যে তাকে ডিবিতে নেওয়া হয়নি। কোথায় আছে তা আমরা জানি না।
এদিকে মডেল পিয়াসা, মৌ, পিয়াসার সহযোগী জিসান-মিশু ও আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক উপ-কমিটির পদ হারানো হেলেনা জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে দায়ের করা পৃথক ৫ টি মামলার তদন্তভার সিআইডিতে স্থানান্তর করা হয়েছে। এর মধ্যে হেলেনা জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে গুলশান ও পল্লবী থানায় দুইটি মামলা, মোহাম্মদপুরে মরিয়ম আক্তার মৌ’র বিরুদ্ধে ১ টি মামলা, গুলশান থানায় পিয়াসার বিরুদ্ধে মামলা ও ভাটারা থানায় জিসান-মিশুর বিরুদ্ধে ১ টি মামলা। মামলার তদন্তভার স্থানান্তরের সূত্র ধরে শুক্রবার সন্ধ্যায় পিয়াসা, হেলেনা জাহাঙ্গীর ও মৌ’সহ ৫ জনকে সিআইডিতে হস্তান্তর করা হয়েছে।
অপরদিকে, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) চিত্রনায়িকা পরীমনিকে ৪ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। গতকাল জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের সূত্র ধরে ডিবির যুগ্ম কমিশনার (উত্তর) হারুন অর রশিদ বলেন, প্রাথমিকভাবে আমরা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। তার বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া মাদক বিষয়ে আমরা কথা বলেছি। সে (পরীমনি) যে বিপথে এসেছে, অন্ধকার পথে পা বাড়িয়েছে, এটার পিছনে কারা কারা তাকে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। সে নামগুলো বলেছে।’এছাড়া একজন নারীর নামও বলেছে।’ সেই নারী কে- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ওই নারীর নাম আমরা এখনই বলছি না। তাকে নজরদারিতে রাখছি। শিগগিরই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করব।’
গত জুনে পরীমনি বিরুলিয়া এলাকায় ঢাকা বোট ক্লাবে তাকে ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ এনে তুমুল আলোচনায় আসেন। পরীমনির অভিযোগটি সামনে আসার পর গণমাধ্যন কর্মীরা যখন তার বাসায় যান, তখন সেখানে ছিলেন চলচ্চিত্র পরিচালক চয়নিকা চৌধুরী। পরী তাকে ‘মম মম’ বলছিলেন।
পিয়াসা ও মৌ রিমান্ডে : জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মডেল ফারিয়া মাহবুব পিয়াসাকে আট দিন ও মরিয়ম আক্তার মৌকে চার দিনের রিমান্ডে পেয়েছে সিআইডি পুলিশ। এদের মধ্যে পিয়াসাকে রাজধানীর তিন থানার পৃথক তিনটি মাদক মামলায় আট দিনের রিমান্ডে দিয়েছে আদালত। আর মৌকে একটি মামলায় চার দিনের রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি পেয়েছে সিআইডি। গতকাল শুক্রবার ঢাকা মহানগর হাকিম রাজেশ চৌধুরীর আদালতে পিয়াসার এবং সত্যব্রত শিকদারের আদালতে মৌ’র রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়।
২ আগস্ট গুলশান থানার মাদক মামলায় পিয়াসাকে তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। ওই রিমান্ড শেষে শুক্রবার তাকে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করা হয়। এরপর গুলশান থানার মামলায় ১০ দিনের রিমান্ডে নিতে আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। এছাড়া রাজধানীর ভাটারা থানার মামলায় গ্রেফতার দেখানোসহ ১০ দিন এবং খিলক্ষেত থানার আরেক মামলায় গ্রেফতার দেখানোসহ সাত দিনের রিমান্ডে নিতে আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। তিন মামলার শুনানি শেষে বিচারক গুলশান থানার মামলায় দুই দিন, ভাটারা থানার মামলায় তিন দিন ও খিলক্ষেত থানার মামলায় তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এদিকে, মোহাম্মদপুর থানায় মাদক মামলায় মডেল মরিয়ম আক্তার মৌকে শুক্রবার ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করা হয়। এরপর মোহাম্মদপুর থানায় মাদক আইনে করা মামলায় তাকে ১০ দিনের রিমান্ডে নিতে আবেদন করে পুলিশ। শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম সত্যব্রত শিকদার আসামী মরিয়ম আক্তার মৌ’র চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এর আগে গত ২ আগস্ট ঢাকা মহানগর হাকিম আশেক ইমামের আদালত মৌয়ের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ওই রিমান্ড শেষে তাকে আবারও চার দিনের রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি পেয়েছে সিআইডি।
পরীমনির মুখে যত নাম : চিত্র নায়িকা পরীমনিকে র্যাব আটকের পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে র্যাব। পরীমনি র্যাবকে জানিয়েছেন যে, তাকে মূলত চলচ্চিত্রে এনেছেন রাজ। এছাড়া তার উত্চ্ছৃঙ্খল জীবনের পেছনে রাজও দায়ী। তারা একসঙ্গে দেশে এবং বিদেশে বিভিন্নস্থান ঘুরে বেড়িয়েছেন। তার সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের একজন শীর্ষ আওয়ামী লীগ নেতা, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একজন শীর্ষ কর্মকর্তা, একজন শিল্পপতি যিনি একটি ক্লাবের সভাপতি, যুবলীগের একজন সাবেক শীর্ষ নেতা বর্তমানে যিনি সংসদ সদস্যসহ অন্তত অর্ধশত শীর্ষ ব্যক্তির নাম জানিয়েছেন র্যাবের কাছে।
প্রযোজক রাজের উত্থান যেভাবে: গোপালগঞ্জের সদর থানার দুর্গাপুর এলাকায় রাজের জন্ম হলেও পড়াশুনা করেছেন খুলনার ফুলতলার একটি মাদ্রাসায়। ১৯৮৯ সালে সেখানে দাখিল পাস করার পর আর্থিক অনটনে তার আর বেশী পড়াশুনা করা হয়নি। চলে আসেন ঢাকার সাভার এলাকায় এক আত্মীয়র বাসায়। সেখানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন। পরে সেখানকার এক ঠিকাদারের সঙ্গে তার পরিচয় হলে তিনি এক পর্যায়ে অল্প পুঁজি নিয়ে সড়কের উপকরণ সরবরাহ করা শুরু করেন। এরপর সেখানে ড্রেজিং ব্যবসাসহ বিভিন্ন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হন। উত্তরার একটি ক্লাবে ২০০৮ সালে এক সিনেমা পরিচালকের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। এতেই তার সিমেনা জগতের কপাল খুলে যায়। ওই পরিচালক ঢাকায় প্রায় ৪০টি এর অধিক সিনেমা নির্মাণ করেছেন। এখন তিনি আর সিনেমা নির্মাণ করেন না। একাধিক প্রযোজকের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে রাজের বিরুদ্ধে। ওই পরিচালকের হাত ধরেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন রাজ মাল্টিমিডিয়া। রাজ মাল্টিমিডিয়া মডেল ও নায়িকা বানানোর নামে ব্ল্যাক মেইলের ফাঁদ তৈরি করে বলে র্যাব জানতে পেরেছে। ওই সব মডেল ও নায়িকাদের পরে উচ্চবিত্ত সন্তানদের কাছে ভিড়িয়ে রাজ মোটা অংকের টাকা আদায় করতেন।