সরকারি উন্নয়ন খাতে প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধন পদ্ধতি সম্পর্কে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এক পরিপত্রে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হইয়াছে যে, কোনো প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ৫০ কোটি টাকা বা তাহার অধিক হইলে তাহা বাস্তবায়নের জন্য একজন পূর্ণকালীন পরিচালক (প্রজেক্ট ডিরেক্টর বা পিডি) নিয়োগ করিতে হইবে। একই কর্মকর্তাকে একাধিক প্রকল্পের পরিচালক হিসাবে নিয়োগ করা চলিবে না। এই নির্দেশনাটি দেওয়া হইয়াছে আজ হইতে এক যুগেরও অধিক কাল পূর্বে, ২০০৮ সালের এক পরিপত্রে; কিন্তু দীর্ঘদিনেও এই নির্দেশনা ঠিকমতো পালিত হয় নাই। এমনকি একজন ব্যক্তির ১৪টি প্রকল্পের পরিচালক হিসাবে দায়িত্ব পালনের কথাও জানা যায়। অতঃপর এই বত্সরের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একনেকের এক সভায় ইহা লইয়া তুমুল সমালোচনামুখর হইলে এই পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হইয়াছে বটে, তবে এখনো অনেক পরিচালক একাধিক প্রকল্পে দায়িত্ব পালন করিতেছেন। অবশ্য ক্রমান্বয়ে ইহা কমাইয়া আনিবার চেষ্টা চলিতেছে; কিন্তু পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পানি উন্নয়ন বোর্ডে টাস্কফোর্স বলিয়া এমন একটি কর্তৃপক্ষ আছে যাহা অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ে নাই। এই টাস্কফোর্সের প্রধান বা তাহার অনুমোদিত ব্যক্তির হুকুম ছাড়া সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে কেহ একটি পাথরও ফেলিতে পারেন না। ইহা কেমন করিয়া সম্ভব? তাহা হইলে এসও, এসডি, নির্বাহী প্রকৌশলী, ডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার, অ্যাডিশনাল চিফ ইঞ্জিনিয়ার, চিফ ইঞ্জিনিয়ার প্রমুখ কর্মকর্তা থাকিয়া কী লাভ?
একজন ব্যক্তির হস্তে একাধিক প্রকল্পের কর্তৃত্ব থাকিলে তাহার সহিত অনৈতিক চর্চার যোগসূত্র তৈরি হয়। ইহাতে রাষ্ট্রের ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়। প্রকল্প সময়মতো বাস্তবায়িত হয় না। বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার কারণে ব্যয় বাড়ে। সরকারের অভীষ্ট উন্নয়ন ব্যাহত ও বিলম্বিত হয়। এই জন্য একাধিক প্রকল্পের পরিচালকের দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাগণ অতিরিক্ত প্রকল্পের দায়িত্ব ছাড়িয়া দিবেন ইহাই একান্ত কাম্য। টাস্কফোর্সের সদস্য হিসাবে যাহারা একাধিক প্রকল্প দেখাশুনার ভার লইয়াছেন, দেশ ও জাতির স্বার্থে তাহাদেরও বোধোদয় হওয়া উচিত। এমন তো নহে যে, যোগ্য কর্মকর্তার অভাব আছে। তাহার পরও যদি প্রয়োজন হয়, তাহা হইলে নূতন করিয়া পোস্ট বা পদ সৃষ্টি করা যায়। এই ধরনের টাস্কফোর্সের মানে কী?
প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে মন্ত্রীর ক্ষমতা সেই কবে খর্ব করা হইয়াছে। আগে বাংলাদেশ উন্নয়ন প্রকল্পে পিডি নিয়োগের রীতি অনুযায়ী সাধারণত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এককভাবে পিডি নিয়োগ দিতেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ও বিভিন্ন প্রকল্পে পিডি নিয়োগ দিতেন। এখন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় আট সদস্যের একটি কমিটি গঠন করিয়া দিয়াছে। ইহার সভাপতি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব। ফলে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি বাস্তবায়নের দায়িত্বও এখন সচিবের হস্তে ন্যস্ত। অথচ মন্ত্রী হইলেন সেই মন্ত্রণালয়ের চিফ এক্সিকিউটিভ বা প্রধান নির্বাহী! ইহা কি স্ববিরোধিতা নহে? তাহা হইলে কোনো প্রকল্প ঠিকমতো ও যথাসময়ে বাস্তবায়িত না হইলে তাহার জন্য দায়ী কে? অথচ এই জন্য আবার মন্ত্রীদেরই জবাবদিহি করিতে হয়! প্রধানমন্ত্রীর নিকট শপথ গ্রহণ করিয়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন একজন মন্ত্রী। শপথ নিতেছেন মন্ত্রী আর সকল কিছু চালাইতেছেন সচিব! অর্থ বরাদ্দের পর টাকা বিভাজনের পত্রে সচিবরা স্বাক্ষর করিয়া থাকেন। প্রধানমন্ত্রীর নিকট এই সংক্রান্ত অনেক কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়, যাহা মন্ত্রীরাও জানেন না।
অতএব, যাহারা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের দায়িত্ব লইয়াছেন, প্রকল্প যথাসময়ে বাস্তবায়িত না হইবার দায়দায়িত্ব তাহাদেরই। তাহাদের কারণে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হইলে ও সরকারি ব্যয় বাড়িলে জবাবদিহিতার জন্য তাহাদের কেন ডাকা হইবে না? এই কারণেই কি অনেকে মন্ত্রীর সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করিবার দুঃসাহস পান? তাই কোনো প্রকল্পে যাহা কিছু ব্যর্থতা তাহার জন্য প্রকৃতপক্ষে যাহারা দায়ী, জবাবদিহিতা তাহাদেরই করিতে হইবে।