করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনতে সারা দেশে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত ছয় দিনে ৩২ লাখ মানুষকে টিকা দিতে গণটিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। গতকাল শনিবার সকাল ৯টায় ১৫ হাজারের বেশি কেন্দ্রে টিকা দেওয়া শুরু হয়। সকাল থেকেই কর্মসূচিতে সাড়া দিয়ে টিকাদান কেন্দ্রগুলোতে সাধারণ মানুষের ভিড় দেখা গেছে। ব্যাপক উত্সাহ-উদ্দীপনায় টিকা নিতে আসা মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। এ অবস্থায় অনেকেই টিকা না পেয়ে ফিরে গেছেন। কোভিড-১৯ টিকা বাস্তবায়ন কমিটির সদস্যসচিব ডা. শামসুল হক বলেন, ‘গ্রামে-গঞ্জে প্রচুর মানুষ টিকা নিতে এসেছেন। আমরা মনে করি, এই গণটিকাদান কর্মসূচি মানুষের মধ্যে একটা উত্সাহ-উদ্দীপনা তৈরি করবে। ছয় দিনব্যাপী এই কর্মসূচি সারা দেশের আনাচে-কানাচে আমরা ছড়িয়ে দেব।’
দেশ জুড়ে শুরু হওয়া এই কর্মসূচি সিটি করপোরেশন এলাকায় চলবে ৯ আগস্ট পর্যন্ত। এছাড়া প্রথম দিন বাদ পড়া ইউনিয়ন ও পৌরসভা পর্যায়ের ওয়ার্ডে টিকা দেওয়া হবে ৮ ও ৯ আগস্ট। ৮ ও ৯ আগস্ট টিকা দেওয়া হবে দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকায়। আর ১০ থেকে ১২ আগস্ট ৫৫ বছরের বেশি বয়সি ও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে টিকা কর্মসূচি চলবে।
সরকারের কেনা, উপহার পাওয়া ও কোভ্যাক্সের মাধ্যমে পাওয়া টিকা মিলিয়ে এ পর্যন্ত দেশে এসেছে ২ কোটি ৫৬ লাখ ৪৩ হাজার ৯২০ ডোজ টিকা। তবে নতুন করে টিকা আসতে থাকায় বড় পরিসরে ভ্যাকসিন ক্যাম্পেইন করে বিশাল জনগোষ্ঠীকে নিয়ে আসতেই পরীক্ষামূলক ধাপ হিসেবে এবার টিকা দেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক এর আগে ৭ আগস্ট থেকে সাত দিনে প্রায় ১ কোটি মানুষকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যের কথা জানিয়েছিলেন। শেষ মুহূর্তে তা অনেকটা কমিয়ে শুক্রবার প্রায় ৩২ লাখ মানুষকে প্রথম ডোজ টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা জানান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম। এখন পর্যন্ত দেশে দেড় কোটির বেশি মানুষকে টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয়েছে। ৫০ লাখ মানুষ টিকার দুটি ডোজই নিতে পেরেছেন। সরকারের টিকাদান টাস্কফোর্স বলছে, বাংলাদেশে ৪০ শতাংশ নাগরিককে টিকা দিতে ১৩ কোটি ১৮ লাখ ডোজ টিকা লাগবে। আর ৬০ শতাংশকে টিকা দিতে লাগবে প্রায় ২০ কোটি ডোজ টিকা। বাংলাদেশ এখন যে হারে টিকা দিচ্ছে, তাতে এ বছর নাগাদ ১৯ দশমিক ৬৪ শতাংশকে টিকা দেওয়া সম্ভব হবে বলে টাস্কফোর্সের অনুমান।
খুলনা অফিস জানায়, খুলনা মহানগরীসহ জেলার অধিকাংশ কেন্দ্রে করোনার গণটিকা ফুরিয়ে যায় মাত্র তিন ঘণ্টার মধ্যেই। ফলে বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে দীর্ঘ সময় লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও টিকা না পেয়ে অনেককেই হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরতে হয়েছে।
গতকাল টিকাকেন্দ্রগুলোতে ছিল মানুষের উপচে পড়া ভিড়। কারো মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনো বালাই ছিল না। গাদাগাদি করে লাইনে দাঁড়িয়ে টিকার জন্য অপেক্ষা করেছেন সবাই। এ কারণে অনেক কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতিটি কেন্দ্রে ৬০০ মানুষকে টিকা দেওয়ার কথা থাকলেও দ্বিগুণের বেশি মানুষ টিকার জন্য ভিড় করেন। ফলে অধিকাংশ মানুষই টিকা না পেয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী জানান, রাজশাহী মহানগরীসহ জেলার ইউনিয়ন গণটিকা কেন্দ্রগুলোতে গতকাল ছিল মানুষের উপচে পড়া ভিড়। টিকা নিতে সকাল থেকেই কেন্দ্রের সামনে লাইনে দাঁড়াতে থাকেন মানুষ। এরপর সকাল ৯টা থেকে টিকা গ্রহণ করেন তারা। টিকা নিতে আসা পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যা অনেক বেশি।
এদিকে রাজশাহী টিচার্স ট্রেনিং (টিটি) কলেজ কেন্দ্রে গতকাল সকাল ১০টা ৩৯ মিনিটে যখন স্বেচ্ছাসেবীর হ্যান্ডমাইকে ঘোষণা আসে ‘টিকা শেষ’, সঙ্গে সঙ্গে সেই কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। শুরু হয় হুড়োহুড়ি, ধাক্কাধাক্কি। বিশৃঙ্খলার একপর্যায়ে টিকাদানে নিয়োজিত স্বাস্থকর্মীরা সংশ্লিষ্ট বুথ ফেলে পালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত বেশির ভাগ মানুষ টিকা না নিয়েই বাড়ি ফিরে যান। তারা সবাই প্রথম ডোজের টিকা নিতে গিয়েছিলেন। তবে প্রায় সোয়া ঘণ্টা পর আবারও টিটি কলেজ কেন্দ্রে টিকাদান শুরু হয়।
রাজশাহী মহানগরী এবং জেলার অন্য কোথাও টিকাকেন্দ্রে এ ধরনের কোনো বিশৃঙ্খলার খবর পাওয়া যায়নি। সকালে রাজশাহী নগরের অধিকাংশ কেন্দ্রে টিকার পরিমাণের চেয়ে মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় দ্বিগুণ। ফলে টিকা না পেয়ে অনেককেই ফিরে যেতে হয়েছে।
রাসিকের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. এফ এ এম আঞ্জুমান আরা বেগম বলেন, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ৩০টি ওয়ার্ডের ৮৪টি কেন্দ্রে একযোগে সকাল থেকে টিকা কার্যক্রম শুরু হয়। প্রতিটি কেন্দ্রে ৩০০ জন করে টিকা পাবেন। রাজশাহীর সিভিল সার্জন ডা. কাইয়ুম তালুকদার জানান, রাজশাহী জেলার ৭৩টি ইউনিয়নেই গণটিকা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রতিটি কেন্দ্রে তিনটি করে বুথে টিকা দেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি বুথে ৬০০ জন করে টিকা পাবেন। টিকাদানে বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী ও নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
চট্টগ্রাম অফিস জানায়, চট্টগ্রামে মোট ৩২৬টি কেন্দ্রে গণটিকা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। টিকাকেন্দ্রে ছিল নারী ও পুরুষের দীর্ঘ লাইন। অনেক কেন্দ্রে নির্ধারিত সময়ের আগেই টিকা প্রদান শেষ হয়ে যায়। নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডের মধ্যে প্রতি ওয়ার্ডে তিনটি করে টিকাকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। প্রতি কেন্দ্রে ৩০০ জনকে টিকা প্রদান করা হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলায় মোট ইউনিয়ন রয়েছে ১৯০টি। পৌরসভা রয়েছে ১৩টি। প্রতিটি ইউনিয়ন ও পৌরসভায় একটি করে টিকাদান কেন্দ্র করা হয়েছে। প্রতি কেন্দ্রে ৬০০ করে টিকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
বরিশাল অফিস জানায়, গতকাল শনিবার সকাল সাড়ে ৯টায় বরিশাল সিটি করপোরেশনের ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলরের কার্যালয় থেকে গণটিকাদান কার্যক্রম উদ্বোধন করেন সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র গাজী নাইমুল ইসলাম লিটুসহ অন্যরা। মেয়র সে?রনিয়াবাত সা?দিক আবদুল্লাহ ব?লেন, নগরী?তে ৬৪টি কে?ন্দ্রে টিকা প্রদান শুরু হ?য়ে?ছে। সিটি করপোরেশন এলাকা ও বরিশাল জেলা-উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে মোট ১৫১টি কেন্দ্রে করোনা ভাইরাসের গণটিকা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সিটি করপোরেশন এলাকায় ৩০ ওয়ার্ডে ৬৪টি কেন্দ্র এবং প্রতিটি কেন্দ্রে তিনটি করে বুথ চালু করা হয়েছে। অন্যদিকে বরিশালের ১০ উপজেলায় ৮৮টি ইউনিয়ন পরিষদ, ছয়টি পৌরসভায় টিকাদান কার্যক্রম চলবে। প্রতিটি কেন্দ্রে তিনটি বুথ থাকবে। প্রতিটি বুথ থেকে ২০০ জন টিকা নিতে পারবেন।
পিরোজপুর অফিস জানায়, পিরোজপুর জেলার সাতটি উপজেলার ইউনিয়ন পর্যায়ে গতকাল শনিবার উত্সবমুখর পরিবেশে ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে করোনা প্রতিরোধে গণটিকা কার্যক্রম একযোগে শুরু হয়েছে। সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়ন পরিষদে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন পিরোজপুরের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক চৌধুরি রওশন ইসলাম। এ সময় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পুলিশ সুপার মো. সাইদুর রহমান, সিভিল সার্জন ডা. হাসানাত ইউসুফ জাকী, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মজিবুর রহমান খালেক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বশির আহমেদ, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শিশির রঞ্জন অধিকারী, ইউপি চেয়ারম্যান তোফাজ্জেল হোসেন মল্লিক স্বপন।
পিরোজপুর সিভিল সার্জন ডা. হাসানাত ইউসুফ জাকী জানান, জেলার সাতটি উপজেলার ৫২টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভার ১৮টি ওয়ার্ডের ১৫৬টি টিকাকেন্দ্রের মাধ্যমে ৩৪ হাজার ৮০০ জন বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী, নারী ও পুরুষকে করোনার ভ্যাকসিন প্রদান কার্যক্রমের আওতায় এনে এ টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে।
সিলেটে গণটিকা উদ্বোধন করলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
সিলেট অফিস জানায়, সিলেট বিভাগে ২ লাখ ৩৫ হাজার ৫০০ জনকে টিকা দেওয়ার কর্মসূচি নিয়ে সকাল ৯টায় নগরের রেড ক্রিসেন্ট মাতৃমঙ্গল হাসপাতালে সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) এলাকায় ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পেইন-এর উদ্বোধন করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন এমপি।
স্বাস্থ্য বিভাগ, সিলেটের পরিচালক ডা. হিমাংশু লাল রায় জানান, সিলেট বিভাগে ২ লাখ ৩৫ হাজারেরও বেশি লোককে টিকা দেওয়া হবে। টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী, বয়স্ক লোকজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
সিসিকের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহিদুল ইসলাম জানান, সিলেট মহানগরেও শান্তিপূর্ণ টিকা দেওয়া হয়। টিকা প্রদানের লক্ষ্যে সিটি করপোরেশনের ২৭টি ওয়ার্ডসহ বিভিন্ন উপজেলার ইউনিয়ন ও পৌরসভার ওয়ার্ড পর্যায়ে মোট ৪১৯টি কেন্দ্রে টিকা কেন্দ্র ছিল। এজন্য ১ হাজার ১৩৭টি বুথ প্রস্তুত করা হয়। সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকায় মডার্না ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সিনোফার্মের টিকা দেওয়া হয়। সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রতিটি বুথে ৩০০ জনকে এবং ইউনিয়নের প্রতিটি বুথে এক দিনে সর্বোচ্চ ২০০ জনকে টিকা দেওয়া হয়।
সুনামগঞ্জে ৮৮টি ইউনিয়নে তিনটি করে ২৬৪টি বুথ ও পৌরসভায় ৯টি ওয়ার্ডে একটি করে বুথ ছিল। পৌরসভা ও ইউনিয়নে সিনোফার্মের টিকা দেওয়া হবে। প্রতি বুথের জন্য মোট ২০০ ডোজ করে ৫৪ হাজার ৬০০ ডোজ টিকা বরাদ্দ রাখা হয়।