জয়া পতি কেন পদক পেলেন

বাঙালির মুক্তিসংগ্রামে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের রয়েছে অপরিসীম অবদান। বঙ্গমাতা ছিলেন বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য সহধর্মিণী এবং বাঙালির স্বাধীনতা অর্জনের অন্যতম নেপথ্যের কারিগর। মহীয়সী নারী বঙ্গমাতার দেশপ্রেম, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা, সাহসিকতা, মানবকল্যাণ ও ত্যাগের মহিমা বাঙালিসহ বিশ্বের সব নারীর কাছে চিরন্তন অনুপ্রেরণার উত্স হয়ে থাকবে। বঙ্গমাতার অবদান চিরস্মরণীয় করার লক্ষ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর গৌরবোজ্জ্বল অবদানের স্বীকৃতির জন্য এ বছর  থেকে সরকার ‘বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব পদক’ প্রবর্তন করেছে।

রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধ, গবেষণা, কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন এবং সরকার কর্তৃক নির্ধারিত অন্য যে কোনো ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ও গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার জন্য এই পদক দেওয়া হচ্ছে। এই সম্মানসূচক পদকে ভূষিত হয়েছেন সমাজসেবক জয়া পতি।

জয়া পতি অদম্য এক সাহসী যোদ্ধার নাম। ব্যক্তিত্বময়ী এই নারী সারা জীবন ব্যক্তিগত অর্জনের ব্যাপারে ছিলেন নিস্পৃহ। নারীর স্বাবলম্বন, মানবতাবাদী কর্মকাণ্ড, সর্বোপরি দেশসেবাই ছিল তার ধ্যান-জ্ঞান। জয়া পতির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট ১৯৮২ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হয়। তাঁর পিতা কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা শহিদ দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা ১৯৭৭ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে (মরণোত্তর) ভূষিত হন। জয়া পতি অত্যন্ত সফল মেধাবী শিক্ষক, শিক্ষা প্রশাসন পরিচালক, অত্যন্ত সফল উদ্যোক্তা। তিনি পিতার যোগ্য উত্তরসূরি।

জয়া পতি ১৯৩২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। বিদেশে বোর্ডিং স্কুলে লেখাপড়া শেষে ১৯৫০ সালে লন্ডনের কিংস কলেজ থেকে শরীরচর্চা বিষয়ে উচ্চশিক্ষা লাভ করে দেশে ফেরেন। এরপর বাংলাদেশের প্রথম আবাসিক বালিকা বিদ্যালয় ভারতেশ্বরী হোমসের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বাবা ছিলেন তাঁর আদর্শ। বাবার নির্দেশনা পেলেও মুক্তচিন্তা ও সংস্কারমুক্ত জয়া পতি ছাত্রীদের তৈরি করতেন আত্মমর্যাদাশীল-প্রত্যয়ী-স্বাবলম্বী হিসেবে। সেই পঞ্চাশের দশক থেকেই ঢাকা স্টেডিয়ামে ভারতেশ্বরী হোমসের মেয়েরা শরীরচর্চা ডিসপ্লে করছে, যা আজ ভাবতে অবাক লাগে।

১৯৬৪ সালে স্বামী ডা. বিষ্ণুপদ পতির ডাকে লন্ডনে চলে যান। এরপর ১৯৭০-এর শেষের দিকে অসুস্থতার খবর পেয়ে বাবাকে দেখতে আসেন। বেশ কিছুদিন থাকার পর দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তার ফিরে যাওয়া বারবার পিছিয়ে যাচ্ছিল।

এলো ভয়াল ’৭১। মহান মুক্তিযুদ্ধের সেই সময়টাতে কেবল জীবন বাঁচানোর জন্য মানুষ দিগিবদিক ছুটছে, করছে দেশত্যাগ। কিন্তু রণদা প্রসাদ সাহা রয়ে গেলেন পরিবারসহ। তিনি তাঁর স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান কুমুদিনী হাসপাতালে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাসহ কয়েক শ রোগী, ভারতেশ্বরী হোমস ও কুমুদিনী মহিলা কলেজকে অভিভাবকহীন করে কোথাও চলে যেতে পারেননি। ফলাফল দাঁড়াল ৭ মে রাতের অন্ধকারে পুত্র ভবানী প্রসাদ সাহাসহ তিনি অপহূত হলেন পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের দ্বারা। দখল হয় তখনকার সময়ে ট্রাস্টের প্রধান আয়ের উত্স বেঙ্গল রিভার সার্ভিস। এ অবস্থায় কুমুদিনীর সেবা প্রতিষ্ঠানগুলো অসহায় হয়ে পড়ে। জয়া পতি এই সংকটময় অবস্থায় কুমুদিনীর হাল ধরেন। আর ভেতরে ভেতরে চেষ্টা চলতে থাকে বাবা ও ভাইয়ের সন্ধান, জীবন বাজি রেখে  যোগাযোগ করেন বিদেশি দূতাবাস থেকে শুরু করে রেডক্রস, এমনকি মিলিটারি হেডকোয়ার্টার পর্যন্ত। বাড়ি ফিরে নিজেকে শক্ত রেখে স্বজনদের সান্ত্বনা দেন, দেন ভরসা। তখনকার প্রেক্ষাপটে সংখ্যালঘু এক নারীর পক্ষে সেটা ছিল কঠিন অকল্পনীয় যুদ্ধ। সেই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে কমুদিনী হাসপাতালে অতিগোপনে চিকিত্সার্থে আগত মুক্তিযোদ্ধাদের রান্না করা খাবার ও অষুধ সরবরাহ করতেন। বন্দুকের নলের মুখেও তিনি মাথা নত করেননি। যুদ্ধ শেষে তার শ্রম ও বিচক্ষণতায় কুমুদিনী ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হলেও ফিরে পাননি প্রাণপ্রিয় দুই স্বজনকে। স্বাধীন বাংলাদেশে কুমুদিনী পরিবার বুক বাঁধে—তারা একদিন ফিরবেন এই আশায়। কিন্তু সেই শূন্যস্থান আর পূরণ হয়নি।

জয়া পতি বাবার রেখে যাওয়া দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি চিন্তা করতে থাকেন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের আত্মকর্মসংস্থানের। ১৯৭৩ সালে কুমুদিনী  হাসপাতালকে কেন্দ্র করে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন কুমুদিনী নার্সিং স্কুল, যা সারা দেশে অত্যন্ত সুপরিচিত। এরপর শ্রমজীবী নারীদের নিয়ে গড়ে তোলেন কুমুদিনী হ্যান্ডিক্রাফট। শুরু থেকেই এর অন্যতম উদ্দেশ্য হয় নারীর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং বিশ্বসভায় তা তুলে ধরা। জামদানি শাড়ি নিয়ে গবেষণার ব্যাপারেও তিনি পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ঝরে পড়া তরুণদের জন্য ’৮৪ সালে ট্রেড ট্রেনিং স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের নিয়ে তিনি হাতে তৈরি কাগজ প্রকল্পটি সফল করে তুলেছিলেন। কাগজ তৈরির কাঁচামাল ছিল কচুরিপানা।

রণদা প্রসাদ সাহার সময় থেকেই নারীর ভাগ্যোন্নয়নে কুমুদিনী বিশেষ ভূমিকা পালন করে আসছে। সেই ধারাবাহিকতায় জয়া পতি কুমুদিনী গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানেও সিংহভাগ নারী শ্রমিক। এরপর প্রতিষ্ঠা করেন কুমুদিনী ফার্মা। নারায়ণগঞ্জের খানপুর প্রাঙ্গণে শীতলক্ষ্যার তীরে কুমুদিনী কমপ্লেক্সে পুরোপুরি নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ গড়ে তুলেছিলেন, যা এখনো অব্যাহত। এরই মধ্যে তিনি কুমুদিনী ট্রাস্টকে ‘শত্রু সম্পত্তি আইন’-এর অভিশাপ থেকে মুক্ত করেন ১৯৮৫ সালে। এভাবেই তিনি পিতার আদর্শে প্রতিষ্ঠানগুলো সময়ের সঙ্গে ও প্রয়োজনে গতিশীল করার আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন।

তিনি দীর্ঘ ৩০ বছর কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালনা, রিলায়েন্স ইনসিওরেন্স, মাইডাস অ্যাসেনশিয়াল ড্রাগ কোম্পানি, ফোর্ড ফাউন্ডেশন, PACT, INTERNATIONAL USA, জাতীয় কারুশিল্প পরিষদ, বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশন, তাঁত বোর্ড প্রভৃতি উন্নয়ন সংস্থার নীতিনির্ধারক পদে দায়িত্ব পালন করেন।

বাবা রণদা প্রসাদ সাহার মতো জয়া পতিও বিশ্বাস করতেন কেবল বণিকবৃত্তি নয়, তার সঙ্গে মানবিক বৃত্তির মিশেল দিয়েই উন্নয়ন করতে হয় সমাজের, দেশের। এবং ত্যাগের মধ্যেই আনন্দ। শোককে শক্তিতে পরিণত করে তিনি যেমন সমাজসেবায় কাজ করে গেছেন নিরলসভাবে, তেমনি পরিবারের প্রতিও ছিল সমান মনোযোগ।

২০১৬ সালের ৯ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন জয়া পতি। ‘মিসেস পতি’ এই পোশাকি নামের বাইরে ঘরোয়াভাবে তিনি সবার কাছে ছোটদি বলেই পরিচিত। ছোটদির স্মৃতি তার অসংখ্য ছাত্রীকে জাগিয়ে রাখবে, অদৃশ্য পরশ বুলাবে তার অপার মমতা। প্রতিষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানের বাইরে তার স্নেহ-মমতায় সিক্ত হয়েছে সবাই। তিনি সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ‘বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব পদকে’ ভূষিত হওয়ায় আমরা গর্বিত।

n লেখক : শিক্ষক, ভারতেশ্বরী হোমস, মির্জাপুর, টাঙ্গাইল