আজ রামেন্দু মজুমদারের আশিতম জন্মদিন, যিনি বাংলাদেশের সংস্কৃতি অঙ্গনের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব বলে অখ্যায়িত এবং বহুল পরিচিত। আরো অনেক-অনেক আনন্দময় জন্মদিন ফিরে ফিরে আসুক তার জীবনে—এ আশা আমরা প্রিয়জন-বন্ধু-সুহূদরা করতেই পারি।
২০০৩ থেকে ২০০৪ সময়কালে রামেন্দু মজুমদার ধারাবাহিকভাবে আমার কথা নামাঙ্কে তার স্মৃতিভেলা ভাসিয়েছিলেন, যেটি ২০০৭ সালে ‘প্রথম তিরিশ’ শিরোনামে সাহিত্য প্রকাশ গ্রন্থাকারে মুদ্রিত করেছিল। এ কথা অতিব সত্য যে আত্মজীবনী বাস্তব অর্থে কখনোই শেষ হয় না, কারণ মৃত্যুর ক্ষণ পর্যন্ত কেউ লিখতে পারে না, আর তাই অত্মজীবনী চিরকালই অসমাপ্ত থেকে যায়। রামেন্দু মজুমদারের স্মৃতিগ্রন্থ ‘প্রথম তিরিশ’ নামটিই ব্যাখ্যা করে এটি তার জীবনের শুরু থেকে তিরিশ বছরের স্মৃতিকথা—অর্থাত্, বিশেষ অর্থে অসমাপ্ত। ফলে দেখা যাচ্ছে, তিনি তার জীবনের সেই সময়কালের কথা লিপিবদ্ধ করেছেন, যে সময়টি ছিল মূলত তার শারীরিক ও মানসিক পরিপুষ্টির বিবর্তনকাল। ধরা যায়, ঐ তিরিশ বছরের মধ্যে লম্বা বিশ বা একুশ বছরই কেটেছে উপরোল্লিখিত সম্পূর্ণতাপ্রাপ্তির বিলম্বিত প্রক্রিয়া রূপে। সে যা-ই হোক, রামেন্দু নিজে এই সময়কালেকে কীভাবে মূল্যায়ন করেছেন?
‘আমার জীবনের এই তিরিশ বছর বেশ ঘটনাবহুল। আমি নানা পরিবেশে এই বছরগুলো পার হয়ে এসেছি। লক্ষ্মীপুরে আমার স্কুলজীবন, কুমিল্লাতে ইন্টারমিডিয়েট পড়বার সময়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থা, চৌমুহনী কলেজে কর্মজীবনের শুরু, করাচিতে দুই দফায় আড়াই বছরের অবস্থান, মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে কলকাতা-দিল্লিতে উদ্বাস্তু জীবন—সব মিলিয়ে নানা অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে আমি পথ চলেছি।’
কিন্তু রামেন্দু তার প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করেছেন—তিনি তার প্রথম তিরিশ নামকরণেই যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা এখনো পর্যন্ত পূরণ করেননি, অথচ তারপর আরো পঞ্চাশ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেল। শুধু তা-ই নয়, ঐ স্মৃতিগ্রন্থের শেষ বাক্যে তিনি লিখেছিলেন :‘স্মৃতিকথার দ্বিতীয় খণ্ডে জীবনের বাকি কথা লিপিবদ্ধ করার বাসনা রইল।’ আমরা জিগ্যেস করতেই পারি সেই প্রতিশ্রুত বাসনার বাস্তবায়নে কালবিলম্ব হয়ে যাচ্ছে না কি?
রামেন্দুর অন্তর্গত শিল্প যাপন-কাঙ্ক্ষা লালিত হয়েছে শৈশবকাল থেকেই, যার আভাস মেলে তার জীবনের প্রথম তিরিশে। তারই এক পরোক্ষ প্রভাবে সেই পাকিস্তান আমলেই তার বিজ্ঞাপন সংস্থার সঙ্গে পেশাগত সংশ্রব, যা আজও তিনি পরিত্যাগ করতে পারেননি। আর ছিল অভিনয়স্পৃহা, যেটি তিনি অনুশীলন করছিলেন ছাত্রজীবন থেকেই। স্বাধীনতা-উত্তরকালে তিনি নিয়মিতই পাকিস্তান টেলিভিশনে অভিনয় করতেন। তারই ফলে স্বাধীনতা-পরবর্তী জীবনে, অর্থাত্ দ্বিতীয় তিরিশে, থিয়েটার নাট্যদল, থিয়েটার স্কুল (বর্তমানে আব্দুল্লাহ আল মামুন থিয়েটার স্কুল), থিয়েটার পত্রিকার জন্ম। এক অর্থে ফেরদৌসী মজুমদারের সঙ্গে প্রণয় ও পরিণয় অভিনয়ের সূত্র ধরেই। আরো একটি শৈল্পিক অর্জন নাট্যকার, নির্দেশক, অভিনেতা প্রয়াত আবদুল্লাহ আল মামুনের সঙ্গে এই দম্পতির ঘনিষ্ঠতা এবং থিয়েটার নাট্যগোষ্ঠীর জন্য মামুনের অনবদ্য কিছু নাটক মঞ্চে উপস্থাপন। এ বিষয়ে রামেন্দুর উত্সাহ ও প্রচেষ্টা ছিল আপসহীন।
রামেন্দু মজুমদার নিঃসন্দেহে একজন বহুমাত্রিক ক্রিয়াশীল ব্যক্তি। শিল্পের শুধু একটি ক্ষেত্র, অর্থাত্ অভিনয়জগত্ নয়, তার পরবর্তী ৫০ বছরের জীবনে তিনি দেশ ও জাতীয় জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেই পদচারণ করেছেন। যেমন শিক্ষা, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় একাধিক প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ের পরামর্শকতা, সুনাগরিকত্বের পৃষ্ঠপোষকতা, জাতীয় নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণ, সাংগঠনিক ও আন্তর্জাতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অবস্থান। তার এই বহুমাত্রিক উপস্থিতির বিশাল বর্ণনা দেওয়ার চেষ্টা আমি করব না, তবে একটি বিষয় না উল্লেখ করলেই নয়।
রামেন্দু মজুমদার একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক। তিনি নিজ দেশকে বিশ্বে প্রচার করার জন্য যা কিছু করেছেন, তার মধ্যে প্রধানতম কাজ হলো ইউনেসকোর ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউটে বাংলাদেশকে প্রক্ষেপ করা। ১৯৮২ সালে প্রায় এক হাতে লড়াই করে বাংলাদেশের শৌখিন নাট্যচর্চাকে ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউট কর্তৃক স্বীকৃতি দিতে শুধু বাধ্যই করেননি, ঐ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বিশ্বসভাপতি হিসেবে দীর্ঘতম সময় কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি উক্ত প্রতিষ্ঠানের সাম্মানিক সভাপতি।
মানুষ সর্বগুণে গুণান্বিত হলে আর মানুষ বলে দাবি করতে পারে না। মানুষের দোষ থাকে, চারিত্রিক খামতি থাকে। রামেন্দু মজুমদারও কোনো ব্যতিক্রম নন। মানতেই হবে, তার এই বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক কর্মক্ষেত্রের অনেক সমালোচক আছেন—তাদের মধ্যে কিছু সমালোচনা হয়তো সঠিক এবং কিছু ঈর্ষাপ্রসূত, তবে আমি আমার একান্ত ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণে যে চারিত্রিক ত্রুটি রামেন্দু মজুমদারের ভেতরে নির্ণয় করেছি, সেটা হলো তার স্থান ও কাল বিশেষে মাত্রার চাইতে বেশি ভালোমানুষি এবং আবেগতাড়িত বন্ধুবাত্সল্য। ফলে তার ভেতরে অনেক সময়ই প্রয়োজনীয় ক্রিয়াশীলতার সঙ্গে অযথা নিষ্ক্রিয়তা ও রক্ষণশীলতার একটি দ্বন্দ্ব লক্ষ করা যায়।
সবশেষে বলব, রামেন্দু মজুমদার আপনি ক্রিয়াশীলতা থেকে বিরত হবেন না। কারণ আপনার বয়স বাড়ছে আর ক্রিয়াশীলতা থেকে বিরত হওয়া অর্থ বয়সকে প্রশ্রয় দেওয়া। আপনি আপনার পরবর্তী পঞ্চাশ বছরের কথা এখনই লিখুন—যেমন জর্জ বার্নার্ড শ বলেছেন :যে মানুষ নিজের এবং নিজের সময়ের কথা লেখে, সেই-ই একমাত্র মানুষ, যেসব মানুষ এবং সব সময়ের কথা লিপিবদ্ধ করে।
n লেখক :শিক্ষাবিদ