বিপদের দিনে পাশে দাঁড়িয়েছিল ভারত

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হলেও কাকতালীয়ভাবে প্রাণে বেঁচে যান তার কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার স্বামী ওয়াজেদ মিয়া, তাদের দুই সন্তান এবং বঙ্গবন্ধুর ছোট কন্যা শেখ রেহানা। শেখ হাসিনাসহ অন্যরা তখন বেড়াতে গিয়েছিলেন জার্মানিতে শেখ ওয়াজেদ মিয়ার কর্মস্থলে। ৩০ জুলাই তারা জার্মানিতে পৌঁছান।

১৫ আগস্ট, জার্মানি, কার্লসরুই। ভোর সাড়ে ৬টা। টেলিফোনের শব্দে ঘুম ভাঙে সবার। প্রথমে শেখ হাসিনা ফোন ধরেন। জার্মানির বন থেকে ফোন করেছেন রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। উত্কণ্ঠিত মুখে ফিরে এসে শেখ হাসিনা জানান, রাষ্ট্রদূত ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে কথা বলতে চান। এরপর শেখ হাসিনার স্বামী এম এ ওয়াজেদ মিয়া এসে ফোন ধরেন। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী বলেন, ‘আজ ভোরে বাংলাদেশ ‘ক্যু-দে-টা’ হয়ে গেছে। আপনারা প্যারিসে যাবেন না। রেহানা ও হাসিনাকে এ কথা জানাবেনও না।’ তক্ষুনি ‘বন’-এ (জার্মানির একটি শহর) যাবার পরামর্শ দেন হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। এ সময় তাদের বাসায় ছিলেন বেলজিয়ামের রাষ্ট্রদূত সানাউল হক। তার সঙ্গে সবার প্যারিসে বেড়াতে যাওয়ার কথা ছিল। শেখ হাসিনাসহ সবার নিরন্তর প্রশ্নের মুখে ওয়াজেদ মিয়া বাংলাদেশে একটা ক্যু হওয়ার কথা জানান। এ কথা শুনে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যাই কান্নায় ভেঙে পড়েন।

১৫ আগস্ট বিকেল সাড়ে ৪টায় সবাই বনে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর বাসায় পৌঁছান। সেদিনই তত্কালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন যুগোশ্লাভিয়া সফর শেষে জার্মানিতে যাত্রাবিরতি করে শেখ হাসিনাদের সঙ্গে মিলিত হন। তখন পর্যন্ত শেখ হাসিনাসহ তার পরিবারের অন্যরা বিস্তারিত কিছুই জানতে পারেননি যে ঢাকায় ঠিক কী ঘটেছে।

এ সময় হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী শেখ হাসিনা, শেখ রেহানাকে নিরাপদ স্থানে না পৌঁছানো পর্যন্ত কিছু না জানানোর শর্তে ওয়াজেদ মিয়াকে বলেন, ঢাকাস্থ ব্রিটিশ মিশন থেকে প্রচারিত বিবরণীতে বলা হয়েছে, ‘বঙ্গবন্ধুর পরিবারের কেউ বেঁচে নেই।’ উদ্ভূত এই পরিস্থিতিতে একমাত্র ভারত ছাড়া আর কোনো দেশ তাদের থাকার জন্য নিরাপদ হবে না বলে জানান রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী।

পরদিন ১৬ আগস্ট রাত ১১টার দিকে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী, তার স্ত্রী ও শেখ ওয়াজেদ মিয়াকে সঙ্গে নিয়ে এসে ভারতীয় দূতাবাসের কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করেন। একটি পূর্বনির্ধারিত স্থানে ভারতীয় দূতাবাসের একজন কর্মকর্তার সঙ্গে একা কথা বলেন ওয়াজেদ মিয়া। সেই কর্মকর্তা ওয়াজেদ মিয়াকে নিয়ে যান ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের বাসায়। এ সময় ওয়াজেদ মিয়া পুরো বিপর্যয়ের কথা তার কাছে বর্ণনা করেন। তখন উক্ত রাষ্ট্রদূত জানতে চান, তারা ভারতীয় সরকারের কাছ থেকে কী প্রত্যাশা করেন। তখন ওয়াজেদ মিয়া তার শ্যালিকা শেখ রেহানা, স্ত্রী শেখ হাসিনা, শিশুপুত্র জয়, মেয়ে পুতল এবং তার নিজের জন্য রাজনৈতিক আশ্রয় কামনা করেন।

২২ আগস্ট পর্যন্ত চরম উত্কণ্ঠায় দিন কাটান বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যরা। ভারতের কাছ থেকেও তখন পর্যন্ত কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। ২৩ আগস্ট সকালে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত ফোন করেন ওয়াজেদ মিয়াকে। দুপুর ২টার দিকে ভারতীয় দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি ওয়াজেদ মিয়ার বাসভবন কার্লসরুয়েতে দেখা করেন। তিনি জানান, পরদিন ২৪ আগস্ট সকাল সাড়ে ৯টায় তিনি তাদের ফ্রাংকফুর্ট বিমানবন্দরে নিয়ে যাবেন। পরদিন খুব গোপনীয়তার সঙ্গে দুটি ট্যাক্সি নিয়ে শেখ হাসিনাসহ সবাই বিমানবন্দরে পৌঁছান। এয়ার ইন্ডিয়ার একটি ‘জাম্বো’ বিমানে করে জার্মানির ফ্রাংকফুর্ট থেকে দিল্লির পালাম বিমানবন্দরে সবাই অবতরণ করেন ২৫ আগস্ট সকাল সাড়ে ৮টায়।

দিল্লি পালাম বিমানবন্দরের ‘আগমন হল’-এ তখন কেউ ছিল না। নানা দুশ্চিন্তা গ্রাস করে বঙ্গবন্ধু পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে। এ সময় ওয়াজেদ মিয়া ভারত সরকারের কারোর সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য বাইরে আসেন। প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা ধরে চেষ্টা করেও কারোর সঙ্গে দেখা হয় না। দুশ্চিন্তায় বিপর্যস্ত অবস্থায় ফিরে আসেন ‘আগমন হল’-এ। কিন্তু সেখানে তখন কেউ নেই। আরো আতঙ্কিত হয়ে পড়েন তিনি। এ সময় এক শিখ কর্মকর্তা এসে বলেন, ‘মাত্র দুই সপ্তাহ আগে যুবতি মহিলাদ্বয়কে দুই বাচ্চাসহ ভিআইপি হিসেবে এই বিমানবন্দর হয়ে যেতে দেখেছেন। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস যে, আজকে তাদের কী নিদারুণ করুণ অবস্থা! এটা একেবারেই অবিশ্বাস্য দৃশ্য।’ সেই শিখ কর্মকর্তা সেদিন তাদের বসার ব্যবস্থা করেছিলেন।

এরও প্রায় সোয়া ঘণ্টা পরে ভারত সরকারের দুই জন কর্মকর্তা তাদের নয়া দিল্লির ডিফেন্স কলোনির একটি বাসায় নিয়ে যান। সেই বাসার চত্বরের বাইরে না যাওয়া, কারো সঙ্গে যোগাযোগ না করার পরামর্শ দিয়ে কর্মকর্তা দুই জন চলে যান। এভাবে দুই সপ্তাহ কেটে যায়। সে সময় সারা ভারতে জরুরি অবস্থা আইন বলবত ছিল। প্রায় দুই সপ্তাহ পর যে কর্মকর্তা শেখ হাসিনাসহ অন্যদের বাসায় নিয়ে এসেছিলেন তিনি ফোন করেন। জানান, ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাদের সঙ্গে দেখা করবেন। সেদিন রাতে শেখ হাসিনাসহ সবাই প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বাসভবনে পৌঁছান। তার বাড়ির বৈঠকখানার একটি লম্বা সোফায় বসেন শেখ হাসিনা। এর মিনিট দশেক পর ইন্দিরা গান্ধী শেখ হাসিনার পাশে এসে বসেন। এ সময় ইন্দিরা গান্ধী তাদের ভারতে আসার পুরো ঘটনার বর্ণনা শোনেন। এ সময় ভারতীয় একজন উচ্চ পদমর্যাদার কর্মকর্তা নিশ্চিত করেন যে, বঙ্গবন্ধুর পরিবারের কেউ বেঁচে নেই। এই সংবাদে শেখ হাসিনা কান্নায় ভেঙে পড়েন।