বজ্রপাত হইতে বাঁচিবার উপায়

বিশ্বব্যাপী বজ্রপাত এখন একটি বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসাবে বিবেচিত। বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও দিনদিন বজ্রপাতের পরিমাণ ও ইহাতে হতাহতের সংখ্যা বাড়িতেছে। সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্টর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরামের (এসএসটিএএফ) দেওয়া তথ্য মতে, ২০২০ সালে সমগ্র দেশে যেইখানে বজ্রপাতে ১৩৩ জনের মৃত্যু হইয়াছে, সেইখানে চলতি বত্সর মার্চ হইতে জুনের মধ্যেই ঝরিয়াছে ১৭৭টি তাজা প্রাণ। সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ ইউনিয়নে পদ্মা নদীর পাড়ের একটি ঘাটে বজ্রপাতে একই সঙ্গে ১৭ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হইয়াছে। ঐ ব্যক্তিরা বরযাত্রী দলের সদস্য ছিলেন। ইহার পূর্বে ২০১৬ সালের মে মাসে মাত্র দুই দিনে সর্বোচ্চ ৮১ জনের মৃত্যু হয় বজ্রপাতে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাব মতে, ২০১১ সাল হইতে ২০২০ সাল পর্যন্ত দেশে বজ্রপাতে মৃত্যু হইয়াছে দুই সহস্রাধিক। ইহাতে বিপুলসংখ্যক গবাদি পশুও মারা গিয়াছে। 

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল বজ্রপাতপ্রবণ এলাকাসমূহের অন্যতম। মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার গবেষণায় দেখা যায়, বিশ্বের ৫০০টি বজ্রপাতপ্রবণ এলাকার মধ্যে বাংলাদেশের শেরপুর ১০৫, কিশোরগঞ্জ ২৭২ ও পাবনার অবস্থান ৪১০ নম্বরে। শুধু তাহাই নহে, বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বিশ্বে বাংলাদেশেই অধিক। প্রতি বত্সর বিশ্বে বজ্রপাতে মৃত্যুর এক-চতুর্থাংশই ঘটে এই দেশে। বাংলাদেশ ছাড়া ভেনেজুয়েলা, কঙ্গোসহ কয়েকটি দেশে বজ্রপাত অধিক হয়। মহাদেশ হিসাবে আফ্রিকা এখন বিশ্বের বজ্রপাতের হটস্পট। ইহার পর রহিয়াছে এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা, উত্তর আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়া। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তাপমাত্রা ও বাতাসে সিসার পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়া, জনজীবনে ধাতব পদার্থের ব্যবহার বাড়িয়া যাওয়া, প্রচুর মোবাইল ফোন ব্যবহার ও ইহার রেডিয়েশন, গ্রামাঞ্চলে উঁচু গাছের সংখ্যা কমিয়া যাওয়া, জলাভূমি ভরাট ও নদী দখল ইত্যাদি কারণে বজ্রপাতের পরিমাণ বাড়িতেছে। বজ্রপাতের শিকার মানুষের বড় অংশ কৃষক ও জেলে। ইতিমধ্যে বজ্রপাতের ক্ষয়ক্ষতি প্রতিরোধের লক্ষ্যে দেশবাসীকে আগাম সতর্কবার্তা দিতে দেশের আটটি স্থানে পরীক্ষামূলকভাবে বজ্রপাত চিহ্নিতকরণ যন্ত্র বা লাইটনিং ডিটেকটিভ সেনসর স্থাপন করিয়াছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। এই ব্যাপারে জনসচেতনতাও গড়িয়া তোলা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন, বজ্রপাত সার্বিকভাবে উপকারী। ভূমির উর্বরা শক্তি বৃদ্ধিতে ইহার অবদান রহিয়াছে। আমাদের কেবল জান ও মালের ক্ষয়ক্ষতি এড়াইতে হইবে। এই বজ্রপাত হইতে প্রাণ বাঁচাইতে রহিয়াছে প্রধানত তিনটি উপায়। তাহার একটি হইল পূর্বাভাসের উন্নতি বিধান। বজ্রপাতের ১৫ মিনিট পূর্বে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিতে পারে কোন কোন এলাকায় বজ্রপাত হইবে। এই খবর মোবাইল ফোনে মেসেজ আকারে সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষকে জানানোর জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইতে পারে। উপকূলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড় হইতে রক্ষায় কেবল আগাম সতর্কবার্তাই দেওয়া হয় না, তাহাদের সাইক্লোন শেল্টারে আনিতে প্রয়োজনে পুলিশও প্রেরণ করা হয়। বজ্রপাতের ক্ষেত্রেও এমন উদ্যোগ লওয়া যাইতে পারে। শক্তিশালী রাডার ও স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পূর্বাভাসের উন্নতি বিধান করিতে পারি আমরা। প্রাকৃতিক প্রতিরোধ হিসাবে তালগাছ, নারিকেলগাছ, বটগাছ প্রভৃতি দ্রুত বর্ধনশীল গাছ লাগাইতে হইবে খোলা জায়গার মধ্যখানে। ইহার পাশাপাশি জনসমাগমের স্থানে স্থাপন করিতে হইবে লাইটনিং অ্যারেস্টার বা বজ নিরোধক দণ্ড।

ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের চাইতেও এখন বজ্রপাতে মৃত্যুর হার অধিক। এই জন্য মানুষের জীবন বাঁচাইতে এই খাতে অর্থ বরাদ্দ বাড়ানো সবচাইতে জরুরি। মাঠে, হাওর-বাঁওড় ও ফাঁকা কৃষিকাজের এলাকায় বজ নিরোধক যন্ত্র স্থাপনসহ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা আবশ্যক। থান্ডার প্রটেকশন সিস্টেমের সকল পণ্যে প্রয়োজন শুল্ক মওকুফ করা। ইহা ছাড়া কোনো নূতন ভবনের নকশা অনুমোদন করা সংগত হইবে না।