কথা, গদ্য, কবিতা, গান

পবিত্র সরকার

১. কথার কথা

এই বক্তৃতায় এমন কোনো কথা থাকবে না, যা আপনাদের অজানা। কথাবার্তা, গদ্য, কবিতা আর গান—এই চারটি  পরিচিত আর দৈনন্দিন কাজে ও বিনোদনে ব্যবহূত বিষয়কেই আমি একসঙ্গে জড়িয়ে ভাববার এবং আপনাদের কাছে বলবার  সংকল্প নিয়েছি, কারণ এগুলির সঙ্গে নন্দনতত্ত্বের একটা সম্পর্ক আছে, রবীন্দ্রনাথ-সহ অনেকেই বলেছেন যে, এগুলিতে ধাপে ধাপে সুন্দরের বা আনন্দের মাত্রা বেড়ে যায়।  কেন বেড়ে যায় তার সন্ধান এই বক্তৃতায় থাকবে। ওপরের চারটি প্রসঙ্গই ভাষার সঙ্গে জড়িত, আর শেষের ‘গান’ কথাটিতেও আমি কথাশ্রিত গানের (বা সুরাশ্রিত কথার) কথাই ভেবেছি, গান কথাটার প্রচলিত যে অর্থ আমাদের প্রতিদিনকার ব্যবহারে আছে। তাই এখানে ‘গান’ অর্থ সুরে আশ্রিত কথা।

এগুলির তফাত আমরা মোটামুটি সাধারণ বুদ্ধিতে জানি। এই জানাতেই কাজ চলে যায় এবং যেত, কিন্তু বিশেষজ্ঞরা সব কিছু নিয়েই অকারণে একটু বেশি বেশি মাথা ঘামান—তাঁরা নিখুঁত আর গভীরতর তুলনায় যেতে চান। তাঁদের সাহায্য নিয়ে আমরা ওই অ্যাডভেঞ্চারে যেতে পারি—বিষয়গুলো আরেকটু তলিয়ে দেখতে পারি। তবে নিশ্চিন্ত থাকুন, এটা বেশি পাণ্ডিত্যপূর্ণ পরিভাষাকণ্টকিত বক্তৃতা হবে না, কারণ আমারও পাণ্ডিত্যের একটা সংকুচিত সীমা আছে।   সেই হিসেবে গভীরতার পরিমাণও শ্বাসরোধী হবে না।

আমাদের আলোচনার প্রথম বিষয় সেই কথাবার্তা, যা মূলত আমরা মুখে বলি। তাই সাধারণভাবে কথাবার্তা অলিখিত থাকে। যা অলিখিত তার সৌন্দর্যতত্ত্বও পলায়মান থাকে, তাকে চিহ্নিত করা মুশকিল। তবে আজকাল প্রযুক্তি  কথাবার্তাকে ইচ্ছেমতো তার ধ্বনিরূপ সহ নথিবদ্ধ করতে পারে। সেক্ষেত্রে কথা কতটা সুন্দর হবে তাতে বক্তার কণ্ঠস্বর আর বাচনভঙ্গির দুটো উপাদান যুক্ত হয়। আর অবশ্যই ভাষার লিখিত রূপও তৈরি হয়েছে, তাতে ওই দুটি উপাদান অনুপস্থিত থাকে। আমরা লেখা আবিষ্কার করেছি, কারণ আমরা আমাদের ভাষাকে দুভাবে—এক, সময় এবং দুই, স্থানের দিক থেকে মুক্তি দিতে চেয়েছি। প্রযুক্তির সাহায্য ছাড়া কথা সামনে থাকা অল্প কিছু লোক শোনে, আর কথা শেষ হলে পরে আসা লোকেরা শুনতে পায় না। লিখিত রূপে কথার ধ্বনি প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থাকে না। কথা বললাম আর তা বাতাসে ধ্বনির ঢেউ তুলে মিলিয়ে গেল, এ অবস্থা মানুষ দীর্ঘদিন মেনে নেয়নি, তাই তাকে স্থায়ী আর সর্বত্রগামী করার জন্য লেখার উদ্ভব ঘটিয়েছে। আমার বিবেক আগের বাক্যের কথাটাকে এখুনি শুধরে নিতে বলছে, আসলে মানুষ দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেছে লেখার জন্য। ভাষার অর্থাত্ কথা বলার বয়স যদি চল্লিশ হাজার বছর হয়, তবে লেখার বয়স ছ-হাজার বছরের বেশি নয়। 

যা-ই হোক, কথাবার্তার লিখিত রূপ বেশি করে আমরা পাই নাটকে, যা আসে সংলাপ বা ডায়ালগ হিসেবে। নাটক মূলত সংলাপসর্বস্ব। এই সংলাপ কথাসাহিত্য বা গল্প-উপন্যাসেও অপরিহার্য, কারণ গল্প-উপন্যাসে মানবজীবনেরই প্রতিচিত্রণ থাকে। তবে কথাসাহিত্যে ভাষার দুটি স্তর থাকে—একটি লেখকের কথন, অন্যটি তাঁর অঙ্কিত চরিত্রগুলির সংলাপ। লেখকের বর্ণনা সাধারণভাবে সংলাপের আধার বা ফ্রেম হিসেবে কাজ করে। কখন কোন সংলাপটি আসবে বর্ণনা থেকেই আমরা তা বুঝতে পারি। বলা বাহুল্য, বাস্তব জীবন-পরিবেশে কথা যতটা সুপরিকল্পিত ও সংগঠিত, সাহিত্যে তা তুলনায় অনেক বেশি গঠন-ঋদ্ধ, তার কারণ সংলাপ দিয়ে লেখক নানা ধরনের কাজ করেন। কখনো চরিত্রটির ভিতর-বাহিরকে ধরিয়ে দেন, কখনো ঘটনাকে এগিয়ে নিয়ে যান।  নাটকে কথার এই দুটি স্তর থাকে না।  লেখকের বক্তব্য কখনো মঞ্চনির্দেশ হিসেবে, ব্র্যাকেটের মধ্যে থাকে। তা নাটকের পাঠ বা টেক্সটের অন্তর্গত নয়।  

‘কথা’র মানে এই বক্তৃতায় অন্তত, আমাদের রোজকার ভাষাব্যবহার। কত বিচিত্রভাবেই না আমরা মানুষের এই অনন্য অর্জন (পৃথিবীতে অন্য কোনো প্রাণীর তো ভাষা নেই), তার ভাষাকে, কাজে লাগাই। খবর দিই, ঝগড়া করি, আড্ডা দিই—আড্ডাতেও তর্কাতর্কি আর ঝগড়া করি, প্রেমের কথা বলি, ঘৃণা আর ধিক্কার প্রকাশ করি, ক্লাসে পড়াই,  রাজনৈতিক বক্তৃতা দিই, প্রাতঃসম্ভাষণ আর বিদায়-সম্ভাষণ করি, খেলার মাঠে নিজের দলের সমর্থনে গলা ফাটাই, মিছিলে স্লোগান দিই,  রসিকতা করি, ব্যঙ্গ করি, অভিযোগ করি, কাঁদুনি গাই, ফেসবুকে বন্ধুর অতি বাজে লেখাকেও অসাধারণ বলে চিহ্নিত করি ইত্যাদি ইত্যাদি—তার সর্বাঙ্গীন তালিকা করা প্রায় অসাধ্য। এমনকি কথা দিয়ে মিথ্যে কথাও বলি। এও মানুষ বলেই সম্ভব, প্রাণীরা কখনো মিথ্যে ভান করে, কিন্তু কোনো প্রাণী এমন একটানা নির্জলা মিথ্যে ভানও করতে পারে না।     

কিন্তু এ ধরনের রোজকার কথাবার্তা প্রায়ই অসংগঠিত; এই অর্থে নয় যে, সমস্ত কথাই ব্যাকরণের নিয়মকে লঙ্ঘন করে। না। আমাদের মস্তিষ্কের মধ্যে ভাষাটার একটা নিয়মবদ্ধ ব্যাকরণ ভর্তি করা আছে, তার ফলে আমরা সাধারণ বুদ্ধিসম্পন্ন কেউ ভুলভাল কথা বলি না, আমাদের কথা পরস্পরের কাছে দুর্বোধ্য হয় না। মুখের কথার ভুল যা হয় তা নানা মানসিক চাপে আর প্রতিবেশের তাড়নায়, আমাদের ভাষার জ্ঞানে কোনো ভুল সে অর্থে নেই। এতে ‘শিক্ষিত’ আর ‘অশিক্ষিত’-এর কোনো তফাত নেই।  অনেক তথাকথিত ‘অশিক্ষিত’ (মানে ‘নিরক্ষর’, স্কুলে-না যাওয়া; এঁরা  কোনো অর্থেই ‘অশিক্ষিত’ নন) মানুষও তথাকথিত শিক্ষিতের চেয়ে ভাষাব্যবহারে অনেক পটু। তবু আমাদের প্রতিদিন বলা কথাগুলি সব সময় গোছানো হয় না, মুহূর্তের তোড়ে, অন্যের কথার উত্তরে, প্রতিবেশের প্রতিক্রিয়ায়  আমরা এক-একটা বাক্য বলি, একটা প্রসঙ্গ থেকে অন্য প্রসঙ্গে, সে কথা এক লক্ষ্য থেকে অন্য লক্ষ্যে চলে যায়।  সেটা যেকোনো আড্ডায় লুকিয়ে একটা টেপরেকর্ডার বা মোবাইলের রেকর্ড করার ব্যবস্থা চালু রেখে শুনলেই বোঝা যাবে।  বা একজন লোকের সারাদিনের কথাবার্তা অনুসরণ করলেই বোঝা যাবে। বাড়ির কথা, বাজারের কথা,  অফিসের কথা, বিকেলের আড্ডার কথা—স্ত্রী ছেলেমেয়ের সঙ্গে কথা থেকে বাস-কন্ডাক্টরের সঙ্গে কথা—অর্থাত্ প্রতিবেশ, ব্যক্তি, উপলক্ষ—কত কিছু আমাদের কথাবার্তাকে নিয়ন্ত্রিত করে তা আপনারা অনুমান করতে পারেন। 

সেইসঙ্গে এটাও আমরা লক্ষ করি যে, আমাদের বাস্তব জীবনে কথা কোনো বিষয়ে দীর্ঘ সংগতিপূর্ণ, ধারাবাহিক,  একবিষয়বদ্ধ একটা বাচনক্রিয়া নয়। বা ছাড়া-ছাড়া, টুকরো-টাকরা সংলাপ। তা আমাদের দৈনন্দির রুটিনের সঙ্গেই বেশিরভাগ যুক্ত। বিভিন্ন প্রসঙ্গ আসে, তা-ই নিয়ে আমরা কথা বলি, একটার সঙ্গে আরেকটার প্রায়ই যোগ থাকে না।  আর তাতে বেশ দ্বিধাযতি বা ‘অ্যাঁ, ম্, মানে, ইয়ে হচ্ছে, আসলে, হলো গিয়ে, ওর নাম কী’, ইত্যাদি দ্বিধাধ্বনি এসে যায়। তাছাড়া রোজকার আলাপে আমরা অনেক সময় অন্যকে কথা শেষ করতে দেওয়ার যে সামাজিক সৌজন্য, ইংরেজিতে যাকে বলে taking turns, তা মানি না, ফলে আমাদের কথা আরও টুকরো হয়ে যায়। 

অন্যান্য প্রাণীদের ‘ডাক’, উপস্থিতের সঙ্গে সংলগ্ন। অর্থাত্ বিড়াল বা কুকুর খিদে পেলে এক রকম ডাক ডাকবে, ভয় পেলে আরেক রকম, রেগে গেলে আরেক রকম। মানুষের ভাষা সব সময় তা নয়। এমনিতে মানুষের ভাষার একটি লক্ষণ হলো উপস্থিত থেকে বিচ্ছিন্নতা, অর্থাত্ সেই মুহূর্তের কোনো প্রসঙ্গ সে কথাবার্তায় নাও থাকতে পারে। দুটি ছেলেমেয়ে দু-মাস পরেকার স্কুল টেস্ট, দুটি তরুণ-তরুণী এক বছর পরে তাদের বিবাহ, বা দুজন বৈজ্ঞানিক পৃথিবীতে আসন্ন হিমযুগ নিয়ে কথা বলতে পারে। কিন্তু তবু দৈনন্দিন কথাবার্তায় অব্যবহিত প্রতিবেশ পরিবেশের প্রভাব খুব বেশি থাকে। তা বক্তার গলার অবস্থা, মনের অবস্থাই হোক, আর ঘরের অন্যান্য লোক, বস্তুবিষয়, আবহাওয়া ইত্যাদি যা-ই হোক। বক্তৃতা দৈনন্দিন টুকরো সংলাপের তুলনায় দীর্ঘ, একবিষয়বদ্ধ ভাষাব্যবহার থাকে, তা ক্লাসের পড়ানোতে হোক, বা রাজনৈতিক মঞ্চে হোক, আলোচনাচক্রে হোক। আপনাদের সামনে আমার এই বক্তৃতাটি যেমন একটা ব্যাপক বিষয়ের নানা উপাদান নিয়ে (আশা করি) কিছুটা গুছিয়ে আলোচনার চেষ্টা করছে।   

 

২. ভাষার নানা কাজ

আমরা আগে বলেছি ভাষা দিয়ে আমরা অনেক কাজ করি, আমাদের ব্যবহারের অনেক লক্ষ্য থাকে। ভাষাবিজ্ঞানীরা এই লক্ষ্যগুলিকে ছয়টি বড়ো ভাগে ভাগ করেছেন। আমাদের বেশিরভাগ কথাই সংলাপ—হয় অন্যদের সঙ্গে, ক্বচিত্ নিজের সঙ্গে—আর এই সংলাপে বক্তা আর শ্রোতার অংশগ্রহণ সব ক্ষেত্রে সমান থাকে না, সে সব সংলাপের (একক, দ্বৈত, এক থেকে বহু—এবং আদর, ঝগড়া, উপদেশ, বক্তৃতা ইত্যাদির) চরিত্র নিয়ে ভাষাবিজ্ঞানীরা গবেষণা করে চলেছেন। কিন্তু তাঁদের একজন, অন্যান্যদের সূত্র গ্রহণ করে রুশ ভাষাবিজ্ঞানী রোমান ইয়াকবসন মূলত যে ছয়টি কাজ আমরা ভাষা দিয়ে চালাই তার একটা মোদ্দা হিসেব দিয়েছেন। এক হলো ‘জ্ঞাপন’, যার ইংরেজি নাম হলো Communication/Communicative Function—যার মানে নিছক খবরের আদান-প্রদান। যেমন—‘আজ তোমাদের বাড়িতে কী রান্না হয়েছিল?’ উত্তর দেওয়া হলো, ‘ভাত, মসুর ডাল আর রূপচাঁদা মাছের ঝোল।’ ব্যাস, এইটুকু। এই সব সংলাপে খুব দীর্ঘ প্রসঙ্গ থাকে না, দৈনন্দিন এই সব কথাবার্তায় খুব আবেগ-উত্তেজনাও থাকে না। তবু ভাষার ক্ষেত্রে এই কাজটা গুরুত্বপূর্ণ, এবং আমাদের দিনের অনেক ভাষাব্যবহার এই ‘জ্ঞাপন’ ধরনের। বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ, খবরের কাগজের অধিকাংশ খবর অনেকটা এই ‘জ্ঞাপন’ গোত্রের।  

ভাষার গঠনগত বিস্তার নেই, অথচ সামাজিক মূল্য আছে—এরকম একটা কাজ হলো ‘ভাষাসৌজন্য’ যার ইংরেজি নাম Phatic Communion। এই যে আমরা দিনে প্রথম দেখা হলে কাউকে ‘নমস্কার’, ‘গুড মর্নিং’, ‘কেমন আছেন’ বলি, উত্তরে একই কথা বলে সাড়া দিই বা ‘ভালো আছি’ বলে পালটা জিজ্ঞেস করি, ‘আপনি ভালো তো?’, এবং উত্তর পাই ‘এই চলে যাচ্ছে’—এগুলি হলো সেই ‘ভাষাসৌজন্যে’র কাজ। বুঝতেই পারছেন এই সংলাপের অভিধান খুব সীমাবদ্ধ, এখানে বিস্তারিত কোনো আলোচনার সুযোগ নেই। বাক্যের সংক্ষিপ্তরূপের ব্যবহারই এখানে বেশি, কখনো একটি শব্দের বাক্যই বেশি ব্যবহূত। এগুলিতে অর্থবস্তু কম থাকে, এগুলি মূলত প্রতীকী সংকেত। বাঁধা বুলি, যার উত্তরে আমরাও বাঁধা বুলি উচ্চারণ করি। তাই ‘কেমন আছেন’ প্রশ্নের উত্তরে ‘ভালো আছি’ না বলে কেউ যদি তার নানা শারীরিক ও পারিবারিক সমস্যার ফিরিস্তি দিতে থাকে আপনি পালাবার পথ খুঁজবেন। এগুলির নান্দনিকতার স্তর খুব উঁচু নয়। 

ভাষার আরেকটা কাজ আছে, যাতে সাধারণ মানুষ খুব একটা এগোয় না। ভুল বললাম, তেমনভাবে এগোয় না।  সেটা হলো ভাষা দিয়ে ভাষাকে বিচার আর বিশ্লেষণ করার কাজ, যার নাম আধিভাষিক ভূমিকা বা Metalinguistic Function। ভাষার বিচার-বিশ্লেষণে যে ভাষা ব্যবহূত হয়, তার নাম অধিভাষা (Metalanguage)। সাধারণ স্তরে ‘এটা আবার কী ধরনের কথা হলো?’ প্রশ্ন থেকে ব্যাকরণ রচনা আর ভাষাবিজ্ঞানের বই লেখা এই কাজের অন্তর্গত। পরেরগুলো খুব সুস্থ মস্তিষ্কের লোকে করে না। সৌন্দর্য নির্মাণের লক্ষ্য থেকে ভাষার এই ব্যবহারও মোটামুটি দূরেই থাকে। পাণিনির ব্যাকরণের সৌন্দর্য যদি কিছু থাকে তা সাধারণ মানুষের কাছে উপলব্ধ হয় না।

ভাষার একটা বড়ো কাজ, আর ব্যাপক কাজ হলো আবেগপ্রকাশ (Emotion/Emotive Function)। এই কাজও আমরা রোজই করি ভাষা দিয়ে—ওই আদর সোহাগ অভিমান ক্রোধ ঘৃণা ব্যঙ্গ প্রত্যাখ্যান সব প্রকাশ করতে।  সোজা কথায় প্রকাশ করি, বাঁকা কথায় প্রকাশ করি। যাকে কেউ ভালোবাসে তার কাছে একটা বিরল মুহূর্তে কেউ বলতেই পারে, ‘আমি তো একজনকে ভালোবেসেছিলাম, কিন্তু সে আমাকে ভালোবাসে কি না কে বলবে?’ গোছের কথা। এই সাহস আমরা দেখাতে পারতাম না, কিন্তু আজকালকার ছেলেমেয়েরা নিশ্চয়ই আমাদের চেয়ে সাহসী।  আবেগ ভাষার সৌন্দর্যের একটা ভিত্তি। কারণ যেকোনো রকমের তীব্রতাপ্রকাশ ভাষার সৌন্দর্যের একটা ভিত্তি। তা যদি আঘাত করার জন্য ব্যবহূত না হয়, তবে তার থেকে সৌন্দর্যের দিকে এগোনো খুব অসম্ভব নয়। তার কারণ, আমরা দেখব যে, পরে আমরা যাকে ‘প্রকাশ’ বলব, তার একটি ভিত্তি এই আবেগ। 

ভাষার আরও একটা কাজ হলো প্ররোচন বা (Conation/Conative Function)। তা হলো কাউকে কোনো কাজে উত্সাহিত বা নিরুত্সাহিত করা। ‘চল্? তো একটু চা খেয়ে আসি’, ‘খবরদার ওই মেয়েটার সঙ্গে ঘুরবি না’  থেকে শুরু করে ‘ধাও ধাও সমরক্ষেত্রে’ পর্যন্ত এর বিস্তার। নিছক কাজ হিসেবে এতে সৌন্দর্যের বড় ভূমিকা নেই, কিন্তু পরের কাজটি যুক্ত হলেই এখানেও সৌন্দর্য প্রবেশ করতে পারে।

আমাদের অনেকের কাছে ভাষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো প্রকাশ বা Expression/Expressive Function। এখানেই ভাষা নিজের চেনা চেহারাটা ঘুচিয়ে রোজকার কথাবার্তার চেয়ে একটা অন্য অনুভবের, সুন্দরের অনুভবের জগতে আমাদের নিয়ে যেতে চায়, নিজে একটু বেশি করে সাজগোজ করে, নিজেকে ভাঙচুর করে।  বলে, আমি কী বলছি সেটা নিশ্চয়ই জানতে চাইবে, কিন্তু আমার সাজগোজ আর ভাঙ?চুরও লক্ষ করো। এখানেই কবিতার আবির্ভাব  হয়। ওই যে ইয়াকবসনের নাম আগে করেছি, তিনি বলেছেন যে কবিতা হলো, (an) organized violation of language. এই কথাটা আমরা মনে রাখব। রোজকার কথাবার্তায় কখনো কবিতা তৈরি হয় না তা নয়। কিন্তু তা এতই অভাবিত এবং আপতিক বা আকস্মিক যে, তার সম্ভাবনা নিয়ে আমরা খুব ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারি না। ভাষার সেই সৌন্দর্য নিয়েই কথাবার্তা বলা চলে যা পরিকল্পিত এবং সংগঠিত। 

কিন্তু দৈনন্দিন সংলাপেরও যে কোনো সৌন্দর্য নেই তা নয়। তবে তার বেশির ভাগই অপরিকল্পিত। পরিকল্পিত ভাষাব্যবহার যখন দৈনন্দিন সংলাপে হয়, তাতে যখন সৌন্দর্য সৃষ্টির ইচ্ছা থাকে, তখন তার জন্য একটা পূর্বপ্রস্তুতি থাকে।

 

৩ গদ্য  

কবিতায় যাওয়ার আগে গদ্যের কথাটা তো বলতেই হবে। মুখের কথাও অবশ্যই গদ্য, এবং এ কথা জেনে মলিয়েরের ‘লে বুর্জোয়া জাঁতিয়োম’ নাটকের মসিয়েঁ জুর্দ্যাঁ কীরকম অবাক হয়েছিল তাও আপনারা অনেকে জানেন। তবু এই  বক্তৃতায় গদ্য বলতে আমি মৌখিক গদ্য নয়, লিখিত গদ্য বোঝাচ্ছি। এ তো আপনাদের জানা কথাই যে, লিখিত গদ্য দৈনন্দিন কথার চেয়ে অনেক বেশি সংগঠিত, একটা প্রসঙ্গ নিয়ে কিছুটা সময় ধরে নির্মিত হয়। তা সে চিঠিই হোক, প্রবন্ধই হোক, আর গল্প-উপন্যাসই হোক। এমনকি গদ্য-নাটক, যাতে দৈনন্দিন কথা কিছুটা জায়গা পায়, তাতেও একটা সুগঠিত লক্ষ্য থাকে, কথাগুলি সেই লক্ষ্যে নাটককে পৌঁছে দেয়। গদ্য মূলত লিখিত ভাষারূপ। সাহিত্য যতক্ষণ মৌখিক আর স্মৃতিনির্ভর থাকে ততক্ষণ কবিতা আর গানের রাজ্যপাট, কিন্তু লিখিত হতে শুরু হলেই গদ্য এসে অনেকটা জায়গা দখল করে। 

অবশ্যই সব গদ্য এক রকম নয়। বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধের গদ্য এক, আবার বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আমার দুর্গোত্সব’-এর গদ্য, মীর মশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ-সিন্ধু’ বা  রবীন্দ্রনাথের ‘লিপিকা’র গদ্য, গল্প-উপন্যাসের গদ্য আরেক, তার  মধ্যেও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আর কমলকুমার মজুমদারের গল্প বলার গদ্য আরেক। অর্থাত্ সাহিত্যের সংরূপ বা (genre) অনুযায়ী গদ্যের তফাত হয়, ব্যবহারিক ক্ষেত্র (যেমন আইন, ধর্মোপদেশ, সাংবাদিকতা, রাজনৈতিক ভাষণ ইত্যাদি) অনুযায়ী গদ্যের তফাত হয়—যার নাম রেজিস্টার বা আমাদের পরিভাষায় ‘নিরুক্তি’, আবার সৃষ্টি ও ব্যবহার সব ক্ষেত্রেই ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে গদ্যের শৈলী বা স্টাইলের তফাত হয়—সব মিলিয়ে গদ্যের বিচিত্র রূপ ফুটে ওঠে। তবু রোজকার কথাবার্তার চেয়ে লিখিত গদ্য যে অনেক বেশি সংলগ্ন, সংহত, ধারাবাহিক, আবেগ বা যুক্তি বা উভয়ের দ্বারা অল্পবিস্তর সুশৃঙ্খলভাবে পরম্পরাবদ্ধ—তা তো আমরা লক্ষই করি। লিখিত গদ্যের একটা সাজানো রূপ থাকে তা আমরা সহজেই ধরতে পারি। অবশ্য মুখেও বক্তৃতায়, ক্লাসে পড়ানোর সময় এই রকম একটা সাজানো সংগঠন চলে আসে, না এলে, অর্থাত্ বক্তৃতা বা ক্লাসের পড়ানো এলোমেলো হলে, তা বেশি গ্রহণযোগ্য হয় না।  অনেকে ডি কুইন্সির Literature of knowledge আর Literature of power-এর ফর্মুলা ধরে যুক্তিপ্রধান আর আবেগপ্রধান—এই ভাবে গদ্যের ভাগ করতে চান, কিন্তু এ দুয়ের মধ্যে এত স্তর আছে যে সব শ্রেণিবিভাগের মতো এও একটা মোটামুটি বিভাগ হিসেবেই থেকে যায়। গদ্য কখনো কখনো কবিতায় প্রমোশন পেতেই পারে, গদ্যকবিতা তার প্রমাণ, নানা সাহিত্যে গদ্যের বর্ণনাও কবিতার চেহারা নেয়—তার নানা উদাহরণ আমাদের সকলেরই জানা আছে। ভালো হতো যদি আমরা ধাপে ধাপে গদ্যের সৌন্দর্য-নির্মাণের প্রক্রিয়াটি দেখাতে পারতাম।  কিন্তু তার অবকাশ নেই—তাই দুটি দু-প্রান্তের উদাহরণ দিয়েই বোঝাই কেজো গদ্য আর সুরম্য গদ্যের আবেদন কোথায় আলাদা—

কেজো গদ্য :এ সময় রবীন্দ্রনাথ কলকাতায়। পালাই পালাই করেও বিজয়াদশমীর দিনও কলকাতায়।  অবনীন্দ্রনাথের বাড়িতে রাতে গানবাজনা, বিশেষ করে বীণাবাদন শুনে প্রীত হয়েছেন। এর বিবরণ রয়েছে ১১ অক্টোবর ইন্দিরা দেবীকে লেখা চিঠিতে। কলকাতা থেকে রবীন্দ্রনাথ ১৭ অক্টোবর বোলপুরের উদ্দেশে যাত্রা করেন। শান্তিনিকেতনের নির্জনে, প্রাকৃত সৌন্দর্যের মধ্যে লেখার তাগিদ অনুভব করেন রবীন্দ্রনাথ। (রবীন্দ্রজীবন ৩, আহমদ রফিক, ঢাকা বাংলা একাডেমি, পৃ. ৩)।

এ গদ্য ছোট ছোট বাক্যে সাবলীল ও স্বচ্ছন্দ হলেও, এ সৌন্দর্য নির্মাণের লক্ষ্যে রচিত হয়নি। কিন্তু নিচের এই গদ্যাংশ দেখুন—

এমন সুন্দর শরতের সকালবেলা চোখের উপর যে কি সুধাবর্ষণ করছে সে আর কী বলব? তেমনই সুন্দর বাতাস দিচ্ছে এবং পাখি ডাকছে। এই ভরা নদীর ধারে, বর্ষার জলে প্রফুল্ল নবীন পৃথিবীর উপর শরতের সোনালি আলো দেখে মনে হয় যেন আমাদের এই নবযৌবনা ধরণীসুন্দরীর সঙ্গে কোন্?-এক জ্যোতির্ময় দেবতার ভালোবাসাবাসি চলছে, তাই এই আলো এবং এই বাতাস, এই অর্ধ-উদাস অর্ধ-সুখের ভাব, গাছের পাতা এবং ধানের ক্ষেতের মধ্যে এই অবিরাম স্পন্দন—জলের মধ্যে এমন অগাধ পরিপূর্ণতা, স্থলের মধ্যে এমন শ্যামশ্রী, আকাশে এমন নির্মল নীলিমা। (ছিন্নপত্র, চিঠি ৫৫)।

লক্ষ করুন, শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনাতেই একধরনের সৌন্দর্য প্রতিফলিত হতো। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তাতে সীমাবদ্ধ থাকেননি, তার মধ্যে মানবিক ভালোবাসাবাসির মেটাফরের আরোপ ঘটিয়ে তার মধ্যে নতুন রসায়ন তৈরি করেছেন, ফলে এই বর্ণনার সৌন্দর্য আরও রমণীয় হয়ে উঠেছে। গদ্যে এইভাবে সৌন্দর্যসৃষ্টির নানা উপায় গ্রহণ করেন লেখকেরা। তাই কখনো কখনো গদ্য ছন্দহীন কবিতা হয়ে ওঠে। অনেক পণ্ডিতই সেই জন্য ‘কবিতা’ বাহন হিসেবে গদ্য ও পদ্যের মধ্যে তফাত করতে চাননি। সংবাদ বা যুক্তি থেকে যে গদ্য চিত্রে বা সংগীতের উড়ান দেয় সেই গদ্য সৌন্দর্যের আশ্রয় নিতে চায়। তা নন্দনতত্ত্বের প্রাসাদে প্রবেশার্থী গদ্য।

 

(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)

অলঙ্করণ :সোহেল আশরাফ