মেরি অলিভারের কাব্যিক ভুবন

তাসনুভা রাইসা

১৭ জানুয়ারি পুলিত্জার পুরস্কার বিজয়ী ও আমেরিকার বেস্ট সেলিং কবি মেরি অলিভারের জীবনাবসান ঘটে, ৮৩ বছর বয়সে তাঁর নিজ বাসভবনে। তিনি অনেকদিন ধরেই লিম্ফোমা নামক ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন।

সাবলীল ভাষার ব্যবহার এবং প্রকৃতির প্রতি তাত্ক্ষণিক মনস্তাত্বিক সংযোগের অনন্য বৈশিষ্ট্যের জন্য তাঁর কবিতা বিভিন্ন মহলে ছিল সমাদৃত। কবির প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ২০-এর অধিক। ‘আমেরিকান প্রিমিটিভ’ বইয়ের জন্য ১৯৮৪ সালে তিনি পুলিত্জার পান। তাছাড়া ‘নিউ অ্যান্ড সিলেক্টেড পোয়েমস’-এর জন্য অর্জন করেন ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড, ১৯৯২ সালে।

তাঁর কবিতার ভাষা সাবলীল, শব্দালংকার সহজেই অনুমেয়, শিক্ষণীয় এবং বহুলাংশে নৈতিক বক্তব্যের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। এসব বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি তাঁর বেশিরভাগ কবিতা নাতিদীর্ঘ হওয়ায় বৃহত্ পরিসরে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। একদিকে চার্চের পাদ্রিরা তাঁদের বক্তব্যে মেরি অলিভারের কবিতা থেকে বিশেষ পঙিক্ত উদ্ধৃত করতেন যেমন, তেমনি কবিতা থেরাপিস্টরা অলিভারের কবিতায় সংবেদনশীলতা তাদের থেরাপির জন্য খুব উপযোগী মনে করতেন। রোনাল্ড পেরেরা এবং অগাস্টা রিড থমাসের মতো কম্পোজাররা তাদের  কম্পোজিশনের সময় অলিভারের কবিতা অনুসরণ করতেন। লরা বুশ এবং মারিয়া শ্রিভারের মতো ব্যক্তিত্বদের পছন্দের তালিকায়ও মেরি অলিভারের কবিতা।

মেরি অলিভার নিভৃতে থাকতে পছন্দ করলেও তাঁর বিপুল জনপ্রিয়তা তাঁকে জীবনের শেষ লগ্নে জনসমক্ষে আসতে বাধ্য করেছিল। হল-ভর্তি দর্শকের সামনে নিয়মিত কবিতা পাঠে তিনি হয়ে ওঠেন—‘Bookish Rockstar’।

মিস অলিভার তাঁর সমস্ত কাজে নিবদ্ধ ছিলেন উদ্ভিদকুল এবং প্রাণীকুলের ঘনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণে, তাঁর অনেক কবিতার শিরোনাম দেখলে ধারণা আরো স্পষ্ট হবে ‘Mushrooms’, ‘Egrets’, ‘The Swan’, ‘The Rabbit’, ‘The Waterfall’—এই কবিতাগুলো চরমভাবে অনুভূত স্থির বিষয়বস্তুকে ঘিরে, দৃশ্যপট জুড়ে আছে প্রোভিন্সটাউনের বন, নিচু জমি, সাঁকো ইত্যাদি। যে শহরে তাঁর অধিবাস প্রায় ৪০ বছরেরও বেশি সময়, তাঁর লেখায় ফুটে ওঠে সেটির ভূমিরূপের অনবদ্য উপস্থাপন। আর সেখানকার মানুষ ছাড়াও জড় ও জীব বাসিন্দাদের বর্ণনা পরিশিলীত, কথোপকথন স্টাইলে।

প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর চিরস্থায়ী যোগাযোগের জন্য অলিভারকে প্রায়ই ওয়াল্ট হুইটম্যান এবং রবার্ট ফ্রস্ট-এর সাথে তুলনা করা হতো। তিনি সবার সামনে তাঁর কবিতা পাঠ করতেন, কিন্তু সাক্ষাত্কার দিতেন খুব সামান্যই। তিনি চাইতেন তাঁর কাজই বলে দিবে সব, আলাদাভাবে। এসব বিবেচনায় তাঁকে এমিলি ডিকিন্সনের সঙ্গে তুলনা করা হয়।

মিস অলিভার প্রায়শই তাঁর কাজকে জীবনের পর্যবেক্ষণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, এবং আধ্যাত্মিকতাকেও গুরুত্ব দিয়েছেন। এখানে তিনি রুমি দ্বারা অণুপ্রাণিত।

প্রকৃতি-নিসর্গ এবং অন্যান্য বিষয়ের মিশেলে একটা নিগূঢ় আধ্যাত্মিকতা ফুটে ওঠে তাঁর কবিতায়—যেমনটি পাওয়া যায় উইলিয়াম ব্ল্যাক বা জেরার্ড ম্যানলি হপকিন্স-এর কবিতায়।

এমন জনপ্রিয় কবি, কিন্তু সমালোচকরা তাঁর পেছনে লেগে ছিল জীবনভর। তাঁর কবিতা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ছিল। তাঁর সাদাসিধে ভাষা এবং বিপুল পাঠকপ্রিয়তার জন্য কিছু সমালোচক তাঁর কবিতা পর্যালোচনা থেকে নিজেদের বিরত রাখেন, যাদের মত ছিল—তাঁর কবিতা কখনোই সম্পূর্ণ নয়। এসব কবিতায় নিপুণতা থাকলেও যথাযথ সাহিত্য উপাদান অনুপস্থিত।

১৯৩৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ক্লিভ ল্যান্ডে এডওয়ার্ড এবং হেলেন অলিভারের ঘরে জন্ম হয় মেরি অলিভারের। ওহাইয়োর ম্যাপল হাইটস-এ তাঁর বেড়ে ওঠা। বাবা ছিলেন স্কুলশিক্ষক এবং মা এলিমেন্টারি স্কুলের সেক্রেটারি।

তিনি খুব কমই সাক্ষাত্কার দিয়েছেন জীবনে। এর মধ্যে একটি; যা অপরাহ ম্যাগাজিনে ২০১১ সালে প্রকাশিত হয়, সেখানে তিনি শিশু অবস্থায় যৌন হয়রানির শিকার হয়েছিলেন বলে জানান, যদিও তিনি তা ব্যাখ্যা করেননি। মা-বাবার ভেতর সুখ ছিল না এবং তাঁর শৈশব হয়ে উঠেছিল কঠিন। ফলে  নীরব শব্দের ভিতরেই তিনি মুক্তি খুঁজে নিয়েছিলেন। তরুণ বয়সে পরিবার ছেড়ে ওহাইয়ো স্টেট ইউনিভার্সিটিতে এবং ভাসসার কলেজে কিছুদিন পড়াশোনা করেন, কিন্তু পড়াশোনা শেষ করেননি কোথাও। একসময় অলিভার স্বেচ্ছায় আরেক পুলিত্জারজয়ী কবি এদনা সেন্ট ভিনসেন্ট মিল্লাই-এর খামারবাড়িতে থাকতে শুরু করেন। তাছাড়া তাঁর কবিতায় মিল্লাই-এর প্রভাব লক্ষণীয়। সেখানে তিনি প্রায় ৬ বছর স্থায়ী হন, তিনি মিল্লাই-এর বোন নরমার কাগজপত্র দেখাশোনা করতেন।

বেনিংটন কলেজসহ নানা কলেজে শিক্ষকতা করেন। তাঁর কবিতার বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য—‘ওহিও’ (১৯৭২), ‘হাউস অব লাইট’ (১৯৯০), ‘দ্য লিফ অ্যান্ড দ্য ক্লাউড’ (২০০০), ‘এভিডেন্স’ (২০০৯), ‘ব্লু হর্সেস’ (২০১৪) এবং ফেলিসিটি (২০১৫)। তাঁর গদ্য গ্রন্থগুলির মধ্যে কবিতার শৈলী বিষয়ক দুইটি বই ‘রুলস ফর দ্য ডান্স’ (১৯৯৮) এবং ‘অ্যা পোয়েট্রি হ্যান্ডবুক’ (১৯৯৪) অন্যতম।

তাঁর কবিতার আপাত দ্বন্দ্ব—অগভীর এবং গভীর,  প্রণোদিত এবং বিষাদগ্রস্ত। জীবন মানে তো শুধু অবিচ্ছেদ্য আনন্দ নয়, বেঁচে থাকার জন্য যতটুকু আনন্দ এবং মৌলিক যে দুঃখবোধটুকু প্রয়োজন অলিভারের শব্দগুচ্ছ তা উভয়কেই আবদ্ধ করে।

‘সামার ডে’ কবিতায় মেরি অলিভারের কবিতার বহুল উদ্ধৃত একটা লাইন আছে—‘What is it you plan to do with your one wild and precious life?’

৭৫ বছর বয়সে মারিয়া শ্রিভার-কে দেওয়া এক দুর্লভ সাক্ষাত্কারে তিনি বলেছিলেন—‘জীবনকে একটি  অপূর্ব উপহার হিসেবে পেয়েছেন এবং এই জীবনে তিনি শিখেছেন কীভাবে অন্যকে ভালোবাসতে হয় আর ভালোবাসা অর্জন করতে হয়, এগুলো কোনোটাই সহজ কোনো ব্যাপার ছিল না, কিন্তু জীবন সেটাই এই অনুরণন।

 

তথ্যসূত্র :  ইন্টারনেট : মূলত নিউ ইয়র্ক টাইমস