রবীন্দ্রগান :ভিতর দিয়ে যার ভুবন দেখা

রবীন্দ্রগান নিয়ে ভাবতে গেলে দুটি প্রবহমান স্রোতের প্রচণ্ডতা, তীব্রতা, নিজের মনমানসকে তাড়িত করে, বিচলিত করে, ভাবিত করে। একটা বিরোধিতা অন্যটা পক্ষপাতিত্ব। পক্ষেবিপক্ষে বহু যুক্তি, তর্ক আছে এ নিয়ে। যদিও এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে অজ্ঞতা, মূর্খতা, কুসংস্কার, সামাজিক প্রথা-পদ্ধতি এবং বিভিন্নমুখী ঐতিহ্যগত ধ্যানধারণার ফলস্বরূপ এটা উত্থিত হতে পারে, জাগ্রত হতে পারে একচোখা, একদেশদর্শিতা, আর নিরর্থক বিমুখিনতা বা বিরুদ্ধবাদিতা। রবীন্দ্রগানে যারা মুগ্ধ, উপকৃত, রবীন্দ্রগানের প্রতি যারা একাত্ম, শ্রদ্ধাশীল এবং আত্মনিবেদিত তাদের চিন্তাচেতনার জাগ্রত রূপ আর বিরুদ্ধবাদীদের উগ্ররূপ—এ দুয়ের দ্বন্দ্ব সংঘর্ষ যেমনি স্বাভাবিক, তেমনি আবার অবাঞ্ছিতও।

হিন্দুয়ানি ঐতিহ্যের পরিমণ্ডলে থেকেও তিনি হিন্দুয়ানি গানের আদর্শে বাণীকে গৌণ করে রাখেননি, আবদ্ধ করে রাখেননি। তাই এ কথা বলা অতিরঞ্জিত নয় যে, রবীন্দ্রগান অর্থহীন ধ্বনি ও সুরের বহন নয়, নয় কোনো আধার। সুরের ক্ষেত্রেও তিনি বেরিয়ে এসেছেন পরিমাপ মতো মার্জিত অবয়বে। সুর ও বাণীকে তিনি করেছেন সমানভাবে আসীন তার গানের জগতে।

তার পরও কথা আছে। সুর নিয়ে, বাণী নিয়ে, তাদের প্রাধান্য ও গুরুত্ব নিয়ে। রবীন্দ্রনাথের বাণী তথা কাব্যকে অধিকতর গুরুত্বারোপের কথা স্বয়ং রবীন্দ্রনাথই বলেছেন। তিনি বলেন সংগীত আর কিছু নয়, সর্বোত্কৃষ্ট উপায়ে কবিতা পাঠ করা, অর্থাত্ এক্ষেত্রে বাণী মুখ্য, সুর গৌণ। অন্য কথায় সুর হচ্ছে বাণীর বাহক মাত্র। আবার তিনি এও বলেছেন যে, কথা যেন গানকে ছাড়িয়ে শুধু কথা হয়ে না যায়, গান যেন কথা ও সুরের মিলনে কানে সংগীত হয়েই বাজে। অর্থাত্ তিনি বলতে চেয়েছেন, এ গান শুধু চিত্তবিনোদনের গান হয়ে না যায়, যেখানে এমন কবিতা থাকে যার মর্যাদা নেই, মহত্ত্ব নেই, গুরুত্ব নেই। এ গানে ধ্বনিবৈচিত্র্য বাঞ্ছনীয়, তবে তা-ই মুখ্য বা যথেষ্ট নয়, এতে থাকা চাই কাব্যরস।

রবীন্দ্রগান বিষয়ে শ্রদ্ধেয় সন্জীদা খাতুনের অনুভূতিটা এখানে স্মরণযোগ্য। তিনি যখন বলেন, ‘জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে আপনার দিকে তাকাবার ফলে, সমগ্র জাতিসত্তার ঐক্যবদ্ধ জাগরণের দিনেও রবীন্দ্রনাথের গান বাঙালিকে গাইতেই হয়’—তখন বাঙালিকে নিশ্চিতভাবেই ভাবতে হয় তার ইতিহাস ঐতিহ্যের দিকে।

রবীন্দ্রগান ড্রয়িংরুমের শোভাবর্ধনের জন্য নয়। এ গান কেবল শ্রবণেন্দ্রিয়ের সন্তুষ্টির জন্য নয়, নয় সুশোভিত হল বা বলরুমের তুমুল করতালির মধ্যে গজল স্টাইলে ‘জোশ’ বলে অনবরত গেয়ে চলা। কিংবা নয় ডিসকো বা রক অ্যান্ড রোল স্টাইলে দর্শক নিয়ে নাচানাচি করা, বাড়াবাড়ি করা, বা হলরুম কাঁপিয়ে তোলা। এ চোখের নয় কানের, আবার কানের নয় মনের, হূদয়ের। তাই ভিন্নভাবে দিতে হবে দৃষ্টি, করতে হবে মূল্যায়ন। বুঝতে হবে, স্বীকার করতে হবে এ সম্পদ বাঙালির অতি সহজ অথচ গৌরবান্বিত উত্তরাধিকার।

রবীন্দ্রগান সময়ের ব্যাপ্তিগানে যেমন অনন্ত অসীম, ভাবের বিভিন্নমুখিতায় হাইড্রামুখী, তেমনি মাত্রায় অফুরন্ত। বাঙালির চাওয়া-পাওয়া ধ্যানধারণার এক মোহনীয় শক্তি আর লোভনীয় উত্স এ রবীন্দ্রগান। এ উত্স অক্ষয়, অব্যয়, যেন ক্ষয়ে ক্ষয়ে বৃদ্ধি পায়। বাউল, রামপ্রসাদী, গজল, কীর্তন যেমন সর্বজনীন তেমনি রবীন্দ্রগান সর্বকালের সর্বজনের। গৌরী আইয়ুবের ভাষায়, ‘যত অক্ষম অপটুভাবেই তার অধিকাংশ দেশবাসী তাকে আত্মস্থ করুক তবু রবীন্দ্রনাথকে যতটুকু গ্রহণ করবে বাঙালি ততটুকুই তার লাভ।’ 

রবীন্দ্রগান বাংলার কবিমানসকে, ভাবুক মানসকে কিংবা তাড়িত-তাপিত মানসকে আচ্ছাদিত করেছে, প্রভাবিত বা অনুরণিত করেছে আপন ক্ষমতাবলে। এ ক্ষমতা অসুরের কিংবা দৈত্যের বেশে তাণ্ডবলীলা সহকারে আগত নয়, ঘূর্ণিঝড় জ্বলোচ্ছ্বাসের মতো দৈবাত্ উড়ে এসে জুড়ে, ঝাঁকিয়ে বসা নয়। অতি সন্তর্পণে ধীরলয়ে, শান্ত, নিরবচ্ছিন্ন পদক্ষেপে ক্রমশ পদার্পণ করে জনমানসে। মল্লিকা সেনগুপ্ত তাই হয়তো বলেছেন, ‘লোকান্তরে যেভাবে ধীরে ধীরে বন্যার জল ঢোকে এবং যেভাবে জনপদ তলিয়ে যায় জলের তলায়, সেভাবে ধীরে, নিশ্চিতভাবে বাঙালি কখন ডুবে গেছে গীতবিতানের আসামান্য লিরিকগুলোর তলায়।’

রবীন্দ্রগানের প্রায় সব পর্যায়ে কমবেশি প্রেমের আবেগ প্রকাশ পেয়েছে সুস্পষ্টভাবে এবং যথাযথ পরিক্রমায়। প্রকৃতির সব ঋতুর গানেই এমনকি শীতকে নিয়ে গান রচনায়ও প্রেমের আবেগ-অনুভূতি স্থান পেয়েছে, যা রেওয়াজ হিসেবে এ দেশে অবশ্যই বিরল।

অন্যদিকে কেউ কেউ রবীন্দ্রগানের প্রকৃতিকে ব্যাখ্যা করেছেন তিন ভাবে। তাদের মতে কিছু কিছু রবীন্দ্রগানের প্রকৃতির স্বরূপ কোনো সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যে আবদ্ধ করা বা বিশেষায়িত করা যায় না। যেমন, পূজা পর্যায়ের অনেক গান স্বচ্ছন্দে প্রেমের গান বলে শনাক্ত হতে পারে, শ্রেণিবদ্ধ হতে পারে। অন্যদিকে এমন কিছু প্রেমের গান আছে, যা পূজা পর্যায়ের গান ভাবতে দ্বিধা লাগে না, সংগতিহীন বলে মনে হয় না।

রবীন্দ্রগানে গণচেতনার স্বরূপ নিয়ে যখন প্রসঙ্গ ওঠে তখনই মানসপটে ভেসে ওঠে বাঙালির জাতিসত্তার ক্রান্তিলগ্নে এর নীরব, অবিরত ক্রিয়াকর্ম, অনল ধারা। এ অগ্নি দাউ দাউ করে প্রজ্বলিত অগ্নিশিখা নয়, নয় দপ করে জ্বলে ওঠা আবার দপ করে নির্বাপিত হওয়া। গণসংগীতে যদি থাকে উপলব্ধি, বোধ, দুঃখ, সংগ্রাম, আশা আকাঙ্ক্ষা, তাহলে রবীন্দ্রগানের ক্ষেত্রে এর প্রকৃত স্বরূপটি বুঝতে হবে গভীর অনুশীলনে, নিরবচ্ছিন্ন সাধনায়। সুপ্ত জনগণকে জাগিয়ে তোলে মিছিলে, সংগ্রামে মুখর করে তুলতে হবে এ মুহূর্তে, অন্তরে জাগাতে হবে তাত্ক্ষণিক উন্মাদনা, উগ্র মাদকতা—এহেন সুর, ধারা উপকরণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নেই রবীন্দ্রগানে—এ কথা যেমন সত্য তেমনি এটাও সত্য যে কাম্যবোধে জাগ্রত করতে, সংগ্রামের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে, সংগ্রামের বীজ উপ্ত করতে, ন্যায় ও সত্যের উপলব্ধিতে, শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে স্বাধিকার ও দেশপ্রেমের পক্ষে তাদের উজ্জীবিত করতে, তাদের প্রস্তুত করতে রবীন্দ্রগানের অবদান অনস্বীকার্য। আমরা চাষ করি আনন্দে, হবে হবে হবে জয়, বাধা দিলে বাধবে লড়াই প্রভৃতি জাতীয় গান গণচেতনা জাগিয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে।

ভাবের আতিশয্যে ক্ষেত্র প্রস্তুকরণে যথেষ্ট মনোযোগী না হওয়ার অপবাদ দেওয়া গেলেও অনুভব করা যায় রবীন্দ্রগানের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, এই বাংলায়, এই জনপদে। ব্যাপকতা প্রকাশের মধ্যমটি, ধরনটিকে গৌণ ধরে অগ্রসর হলে অন্তর্নিহিত বিষয়কে, ভাবকে অনুধাবন করা সহজ হয়। আর তখনই ধরা দেবে আকাশের সেই পাখিটি, যার কণ্ঠে নিয়তই ধ্বনিত হচ্ছে, উচ্চারিত হচ্ছে  ‘গানের ভিতর দিয়ে যখন দেখি ভুবনখানি।’

n লেখক : সাবেক সচিব