আদালতে রিমান্ড শুনানির সময় গতকাল মঙ্গলবার কাঁদলেন গ্রেফতার নায়িকা পরীমনি। নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেছেন, মিথ্যা মামলা দিয়ে তাকে ‘ফাঁসানো’ হচ্ছে। এদিকে গতকাল আদালতে গিয়েছিলেন পরীমনির বয়োবৃদ্ধ নানা শামসুল হক গাজী। তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, পরীমনি পরিস্থিতির শিকার। সে কোনো অপরাধ করেনি। অপরদিকে পরীমনি, প্রযোজক নজরুল ইসলাম রাজ ও মডেল মরিয়ম আক্তার মৌকে ফের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। এদের মধ্যে পরীমনি ও মৌ দুই দিনের এবং রাজের দুটি মামলায় ছয় দিনের রিমান্ড হয়েছে। দ্বিতীয় দফা রিমান্ড শুনানি শেষে গতকাল ঢাকার হাকিম আদালত থেকে সিআইডি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় উপস্থিত জনতার সামনে পরীমনি দাবি করেন, তিনি নির্দোষ, তাকে ফাঁসানো হচ্ছে। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশে চিত্কার করে বলতে থাকেন, ‘আমার বিরুদ্ধে মামলা শতভাগ মিথ্যা। সাংবাদিক, আপনারা কী করছেন?’
বনানী থানার মাদক আইনের মামলায় চার দিনের রিমান্ড শেষে পরীমনিকে আদালতে হাজির করে আরো পাঁচ দিনের রিমান্ড চেয়েছিল সিআইডি। শুনানি শেষে মহানগর হাকিম দেবব্রত বিশ্বাস দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পরীমনির সঙ্গে গ্রেফতার তার সহযোগী আশরাফুল ইসলাম দীপুকেও দুই দিনের রিমান্ডে পাঠানো হয়।
শুনানি শেষে এজলাস থেকে বেরিয়ে লিফটে ওঠার আগে ভিড় করে থাকা উত্সুক জনতাকে উদ্দেশ্য করে পরীমনি বলেন, ‘আমাকে মিথ্যা মামলা দিয়ে ফাঁসানো হচ্ছে, আর আপনারা হাসছেন!’ এর আগে আদালতে শুনানির সময় পরীমনি কাঁদতে থাকেন। মিনিট পাঁচেক ধরে তিনি কাঁদতে থাকেন। আশরাফুল ইসলাম দীপুও কাঁদছিলেন। আর পরীমনির এক সিনেমার প্রযোজক রাজ ছিলেন বিমর্ষ। আদালতে তারা কোনো কথা বলেননি।
রিমান্ড শুনানি চলাকালে পরীমনির আইনজীবী মজিবুর রহমান দাবি করেন, পরীমনি গ্রেফতার হওয়ার পর যে পোশাক পরে ছিলেন, আজও সেই পোশাক পরে আছেন। তিনি তার আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করার বা কথা বলার কোনো সুযোগ পাননি। এটি একজন নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থি। এই আইনজীবী বিচারকের উদ্দেশে বলেন, ‘একশ কয়েক ঘণ্টা ধরে তিনি একই কাপড় পরে আছেন।’ তখন পরীমনির পাহারায় থাকা নারী পুলিশ সদস্য এবং রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বিচারককে বলেন, এই চিত্রনায়িকা হাজতে অন্য পোশাকে ছিলেন। এজলাসে আসার সময় তিনি পোশাক পালটে আগের পোশাকই পড়েছেন।
গতকাল সিএমএম আদালতে পরীমনির আসার সংবাদে ব্যাপক ভিড় হয়। দুপুর ১২টার দিকে আদালতে আসেন পরীমনির বৃদ্ধ নানা শামসুল হক গাজী। আদালতে শুনানির সময় অবশ্য তিনি অন্য কক্ষে ছিলেন। তার সঙ্গে পরীমনির দেখা হয়নি। ঢাকার বনানীর বাসায় পরীমনির সঙ্গেই থাকতেন শামসুল হক গাজী। আদালত প্রাঙ্গণে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, পরীমনি নিজের জন্য জীবনে কিছুই করেনি। সব মানুষের জন্য সে দান করেছে। আর এখন পরিস্থিতির শিকার হয়ে গেছে। র্যাবের অভিযানের দিন শামসুল হক গাজীও বনানীর এ বাসায় ছিলেন। বাসা থেকে মাদক উদ্ধারের বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, খালি বোতল ছিল। এখন সেগুলো মাদকের বোতল নাকি কিসের বোতল জানি না। বাবা-মাকে হারানোর পর পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়ার সিংহখালী গ্রামে নানাবাড়িতেই তার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে।
নানা শামসুল হক এক সময় স্থানীয় একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। পরে পরীমনির সঙ্গে তিনিও ঢাকায় চলে আসেন।
পরীমনির মুক্তি দাবি করে তার নানা বলেন, নিজে একটা ফ্ল্যাট করে নাই, কিছু করে নাই। এফডিসিতে প্রত্যেক বছরে গরিবদের জন্য গরু কোরবানি দেয়। নিজে কিছু করে নাই, সেসব মানুষের জন্য বিলিয়ে দেয়। আল্লাহ পাক যদি ওরে মাফ করে, আর কী। তিনি বলেন, মেয়েটার বাপ-মা কেউ নাই। আমার কাছেই বড় হয়েছে, মানুষ হয়েছে। ওর জন্য দুশ্চিন্তায় আমার ঘুম হয় না। কেউ নেই ওকে দেখার জন্য। আমার নিজেরও কিছুদিন আগে অপারেশন হয়েছে। এখনো আমি অসুস্থ। তাকে কত দিন দেখি না। তাই বাধ্য হয়েই এখানে এসেছি।
মাদক মামলায় চার দিনের রিমান্ড শেষে পরীমনি ও প্রযোজক নজরুল ইসলাম রাজসহ চার জনকে ফের রিমান্ডে পাঠিয়েছে আদালত। বনানী থানার মাদক আইনের মামলায় পরীমনি ও তার সহযোগী আশরাফুল ইসলাম দীপুকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আরো দুই দিন করে রিমান্ডে পেয়েছে সিআইডি। আর প্রযোজক রাজ এবং তার ব্যবস্থাপক সবুজ আলীকে মাদক ও পর্নোগ্রাফি আইনের দুই মামলায় মোট ছয় দিন করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছে আদালত। এদিকে মাদক দ্রব্যসহ গ্রেফতার কথিত মডেল মরিয়ম আক্তার মৌকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আবার দুই দিনের হেফাজতে পেয়েছে পুলিশ। গতকাল তাকে আদালতে হাজির করে মোহাম্মদপুর থানার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলায় আরো পাঁচ দিনের হেফাজত চাওয়া হয়। শুনানি শেষে ঢাকার মহানগর হাকিম আবু সুফিয়ান মো. নোমান দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।