বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেই খুনি চক্র বসে থাকেনি। বাংলাদেশে যেন আর বঙ্গবন্ধুর অনুসারীরা বা আওয়ামী লীগ দেশ পরিচালনায় আসতে না পারে সেজন্য খন্দকার মোশতাক তার গ্রামের বাড়িতে বসে ফারুক আর রশিদকে নিয়ে জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পরিকল্পনা করে। খুন করার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ফারুক বলে যে, শেখ মুজিবকে তারা যেভাবে উত্খাত করেছে, সেভাবে খন্দকার মোশতাকও উত্খাত হতে পারে। ঐ অবস্থায় ভারতের সহায়তায় কোনো পালটা অভ্যুত্থান ঘটে গেলে, জেলে আটক চার নেতার যে কোনো একজনকে এনে পালটা সরকার গঠনের ব্যবস্থা করা হবে। সুতরাং তাদের সরিয়ে ফেলার ব্যবস্থা করাটাই ওরা নিরাপদ মনে করে।
বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার অন্যতম পরিকল্পনাকারী মেজর ফারুক এভাবেই সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসকে তাদের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের কথা জানিয়েছিল বলে মাসকারেনহাস তার গ্রন্থ ‘এ লিগ্যাসি অব ব্লাড’-এ উল্লেখ করেন।
‘এ লিগ্যাসি অব ব্লাড’ গ্রন্থের বর্ণনা মতে, ওরা একমত হয় যে, মোশতাককে হত্যা করা হলে বা পালটা অভ্যুত্থান ঘটলে অবিলম্বে দুটো কাজ করতে হবে। প্রথম কাজ হবে—প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে সরকারের শূন্যতা পূরণের জন্য সঙ্গে সঙ্গেই প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়াতে হবে। পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে একটা ‘জল্লাদ বাহিনী’ দ্রুত কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে জাতীয় ‘চার নেতা’কে হত্যা করবে। ওরা এই ধরনের কাজের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। এটা ছিল রিসালদার মুসলেহউদ্দিনের দল।
নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদ এবং খন্দকার মোশতাক আহমদ ও ‘মেজর চক্র’কে উত্খাতের উদ্দেশ্যে ’৭৫-এর ৩ নভেম্বর ভোররাতে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে যে সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল তাতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ঢাকাস্থ পদাতিক ডিভিশন এবং বিমানবাহিনীর একটি দল অংশ নেন। অভ্যুত্থানকারীরা খুনি খন্দকার মোশতাক আহমদের অবস্থানস্থল বঙ্গভবন অবরোধ করে ফেলেন, ঢাকা রেডিও স্টেশন দখল করেন, সেনাবাহিনী প্রধান জিয়াউর রহমানের বাসভবন অবরোধ করেন এবং খুনি মেজর চক্রকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন। কিন্তু ট্যাংক বাহিনীর পাকিস্তানপন্থি সদস্যদের সমর্থনপুষ্ট খুনি মেজর চক্রটি আত্মসমর্পণে অস্বীকৃতি জানায়। এই পর্যায়ে একটি জিপে সাদা পতাকা উড়িয়ে সেখানে হাজির হন জেনারেল (অব.) এম এ জি ওসমানী। তিনি খালেদ মোশাররফ এবং খুনি খন্দকার মোশতাক আহমদ ও মেজর চক্রকে শান্তিপূর্ণভাবে আলাপ-আলোচনায় একটি পরস্পর গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করার প্রস্তাব দেন। দুই পক্ষই উক্ত প্রস্তাবে সম্মত হয়। ৩ নভেম্বর সারা দিন অতিবাহিত হয় উক্ত আলাপ-আলোচনায়। অবশেষে নিরাপদে বাংলাদেশের বাইরে যাওয়ার বন্দোবস্ত করা হবে, এই শর্তে খুনি মেজর চক্রটি আত্মসমর্পণে সম্মত হয়। অতঃপর ৩ নভেম্বর রাত ৮টার দিকে খুনি মেজর চক্রটির লোকজনদের বাংলাদেশ বিমানের একটি বিমানে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে পৌঁছেই মেজর সৈয়দ ফারুক রহমান একটি সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারবর্গের সদস্যদের হত্যা করার কথা স্বীকার করে। খুনি ফারুকের সঙ্গে প্রায় ২৯ জন তখন ব্যাংককে পালিয়ে গিয়েছিল। তাদের মধ্যে ছিল খন্দকার আব্দুর রশিদ, শরিফুল হক ডালিম, আজিজ পাশা, মহিউদ্দিন, শাহরিয়ার, বজলুল হুদা, রাশেদ চৌধুরী, নূর, শরফুল হোসেন, কিসমত হোসেন, খায়রুজ্জামান, আব্দুল মাজেদ, মোসলেউদ্দিন, মারফত আলী, মো. হাশেম প্রমুখ।
পরবর্তী সময়ে ক্ষমতায় এসে জিয়া তার বিদ্রোহীদের কঠোর হাতে দমন করেন। এ সময় প্রায় ১ হাজার ১৪৩ জন সেনা সদস্যকে হত্যা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে ফারুক, রশিদ, ডালিমসহ অন্য সহযোগীদের বিদেশে পুনর্বাসনের সুযোগ করে দিয়েছিলেন তিনি।