লকডাউন শেষে অফিস-আদালত, দোকানপাট খুলে গেছে, রাস্তায় নেমেছে গণপরিবহন। মানুষের ব্যস্ততা আর গাড়ির চাপে রাজধানীতে ফিরেছে চিরচেনা যানজট আর কোলাহল, শুরু হয়েছে ট্রেন এবং লঞ্চ চলাচলও। তবে মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মানার প্রবণতা কম দেখা গেছে। ১৯ দিন বন্ধ থাকার পর শপিংমল খুলে দেওয়া হলেও ক্রেতা না পাওয়ার কথাই বলেছেন বিক্রেতারা। গতকাল বুধবার ঢাকার বিভিন্ন শপিংমলে ঘুরে পোশাক, ইলেকট্রনিক্সসহ অন্যান্য দোকানের বেশির ভাগই ফাঁকা দেখা গেছে। বিক্রয়কর্মীরা অলস সময় পার করছিলেন। বিক্রেতারা বলছেন, করোনার প্রকোপ ভয়াবহ হয়ে ওঠায় ক্রেতা অনেক কম দেখা যাচ্ছে।
গতকাল সকাল ১০টার দিকে রাজধানীর শ্যামলী ওভারব্রিজের নিচে গণপরিবহনের জন্য অপেক্ষায় থাকতে দেখা যায় অর্ধশতাধিক মানুষকে। পরপর ৮ নম্বর রুটের দুটি বাস এলেও কোনো গাড়িরই দরজা খোলা হয়নি। রফিকুল ইসলাম যাবেন শাহবাগের একটি কার্যালয়ে। ২০ মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে থেকেও তিনি কোনো বাসে উঠতে পারেননি। রাস্তায় যাত্রীর চাপ বাড়লেও লকডাউনে শুরু হওয়া ভাড়ার মোটরসাইকেল চালকদের লম্বা হাঁক এখনো কমেনি। এতদিন ‘ভিআইপি’ সড়কগুলোতে রিকশা চললেও গতকাল থেকে সেসব সড়কে রিকশা আটকে জরিমানা করেছে পুলিশ। খুলেছে সরকারি-বেসরকারি অফিস, দোকানসহ বিপণিবিতানগুলোও। তবে গতকালের সকালটা বিপণিবিতানের কর্মীদের ধোয়া-মোছায় সময় পার হয়েছে।
মোহাম্মদপুর আর ধানমন্ডি সাত মসজিদ রোড এলাকায় রাস্তাঘাট, অলিগলিতে সকাল থেকেই ছিল মানুষের স্রোত। দোকানপাটেও ছিল ব্যস্ততা। কাওরান বাজারে কথা হয় একটি ইনসিওরেন্স কোম্পানির কর্মী আবুল আসাদের সঙ্গে। তিনি বলেন, প্রথম দিনেই রাস্তায় মানুষজন হামলে পড়েছেন। দীর্ঘক্ষণ যানজটে আটকে থেকে হাঁটা শুরু করেছেন তিনি। চায়ের দোকানি আবুল কাশেম বলেন, এতদিন পর মানুষ হাফ ছেড়ে বেঁচেছে। তবে পথে বের হওয়া অনেকেই স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না। অনেকই মাস্ক ছাড়া ঘোরাঘুরি করছেন।
লঞ্চ চলাচল শুরু :১৯ দিন বন্ধ থাকার পর লঞ্চ চলাচল শুরু হয়েছে সদরঘাট থেকে। গতকাল ভোর ৬টায় সদরঘাট থেকে এমভি ইমাম-হাসান লঞ্চ চাঁদপুরের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। এরপর এমভি সোনারতরী, গ্রিন লাইন সদরঘাট ত্যাগ করে। চাঁদপুর থেকে ছেড়ে আসা সোনারতরী-২ ও রফরফ-৭ লঞ্চে যাত্রীর চাপ ছিল বলে জানান বিআইডব্লিউটিএর পরিবহন পরিদর্শক মোহাম্মদ নেওয়াজ। তিনি বলেন, সকাল ১০টা পর্যন্ত সদরঘাট থেকে ১৯টি লঞ্চ ছেড়ে গেছে। এই সংখ্যা স্বাভাবিক সময়ের মতোই। স্বাস্থ্যবিধি মেনে যাত্রীরা আসছেন কি না সেদিকেও লক্ষ্য রাখা হচ্ছে। সদরঘাট থেকে দুপুর পর্যন্ত চাঁদপুর, শরীয়তপুর, ভোলা, বরিশাল ও মুলাদী রুটের লঞ্চ ছেড়ে গেছে। সন্ধ্যায় বরিশালসহ অন্যান্য দূরের পথের লঞ্চগুলো ছেড়েছে।
ভরা যাত্রী নিয়ে ছাড়ছে ট্রেন :কঠোর বিধিনিষেধ শেষে গতকাল সকাল থেকে সারা দেশে ফের ট্রেন চলাচলও শুরু হয়েছে। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে বলাকা এক্সপ্রেস, তুরাগ এক্সপ্রেস, দেওয়ানগঞ্জ কমিউটার, পারাবত এক্সপ্রেস, সোনার বাংলা এক্সপ্রেস, তিস্তা এক্সপ্রেস ও মহানগর প্রভাতী সকাল থেকে ছেড়ে গেছে। রেলওয়ের দেওয়া ঘোষণা অনুযায়ী, সকাল থেকে ৩৮ জোড়া আন্তঃনগর ট্রেন এবং ২০ জোড়া কমিউটার ট্রেন চলাচল করছে।
তবে ঢাকা থেকে একতা এক্সপ্রেস, সুন্দরবন এক্সপ্রেস, নীলসাগর এক্সপ্রেস, রংপুর এক্সপ্রেস এবং টুঙ্গীপাড়া এক্সপ্রেস ট্রেনটি গোবরা থেকে গতকাল ছাড়েনি। গত ১ জুলাই দেশে লকডাউনের কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ হলে অন্য সব যাত্রীবাহী গণপরিবহনের মতো ট্রেন চলাচলও বন্ধ রাখা হয়। ঈদ ঘিরে ১৫ জুলাই থেকে ২২ জুলাই লকডাউন শিথিল করা হলে রেলপথ মন্ত্রণালয়ও ট্রেন চালু করে। এরপর ২৩ জুলাই থেকে আবার কঠোর লকডাউন শুরু হলে ট্রেনও থেমে যায়।
অভ্যন্তরীণ রুটে আকাশপথে যাত্রীর চাপ কম :লকডাউন উঠে যাওয়ার পর প্রথম দিন দেশের ভেতরে আকাশপথে যাত্রীদের তেমন চাপ নেই বলে জানিয়েছে দেশের দুই বেসরকারি এয়ারলাইন্স। ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ শাখার মহাব্যবস্থাপক কামরুল ইসলাম বলেন, শুক্রবার থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ফ্লাইট চালুর পর থেকে যাত্রীরা দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে নিয়মিত যাতায়াত করছেন। তবে আজকে যাত্রীদের বাড়তি কোনো চাপ নেই। আগের মতোই তারা চলাচল করছে। নভোএয়ারের মার্কেটিং অ্যান্ড সেলস বিভাগের ব্যবস্থাপক মাহফুজুল আলম অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রীদের বাড়তি চাপ না থাকার কথা জানিয়ে বলেন, আমরা আশা করছি সামনে যে টানা তিন দিন ছুটি রয়েছে তারপর হয়তো বিমানের যাত্রীর চাপ বাড়বে।
দোকানে ক্রেতা মেলেনি :বসুন্ধরা সিটি শপিংমলে ছেলেদের পোশাকের দোকান ‘লিন্ড’র বিক্রয়কর্মী সাহরিমান মুন বলেন, সকালের দিকে কাস্টমার একেবারেই ছিল না। বিকালের দিকে কাস্টমার টুকটাক আসছে, দেখছে, কেউ কিনছে আর কেউ দেখে চলে যাচ্ছে। বলতে গেলে বেচাকেনা একবারেই কম। এই শপিংমলের ইলেকট্রনিক দোকানের কর্মী আবু হানিফ বলেন, এখন বেচাবিক্রি নেই। সকালে বৃষ্টির কারণেও লোকজন কম।
হাতিরপুলের ইস্টার্ন প্লাজার শাড়ির দোকান ‘নীল আঁচল’র বিক্রয়কর্মী মো. রাজু বলেন, সকাল থেকে চার জনের কাছে বিক্রি করেছি। আজকে এতদিন পর দোকান খুলেছি, কাস্টমার নেই। আবার কখন কাস্টমার আসবে, সেই আসায় বসে আছি। হাতিরপুলের মোতালেব প্লাজায় মোবাইল সার্ভিসিংয়ের দোকানে কিছুটা ভিড় দেখা গেলেও অন্যান্য দোকানে ক্রেতা একবারেই কম ছিল।