চাপ আর চাপ। জীবনযাপনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো ‘মানসিক চাপ’। মানসিক চাপ জীবনের একটি ধ্রুব বাস্তবতা। মানবজীবনে বিচিত্র ধরনের উত্থান-পতন রয়েছে, রয়েছে অসংলগ্নতা, দুঃখ-কষ্ট, অপ্রাপ্তি, বেদনা ইত্যাদি। অনার্সে অল্পের জন্য ফার্স্ট ক্লাস ছুটে গেছে, মাস্টার্সে না পেলে ভবিষ্যত্ অন্ধকার। ছেলের দুর্ঘটনার খবর হজম করেছি কি করিনি, পদোন্নতি হয়ে গেল পাশের টেবিলের সহকর্মীর। এমন সময়ে কেবলই মনে হতে থাকে আমরা ক্রীতদাস এই নিষ্ঠুর বাস্তবতার। মনকে চেপে ধরে উদ্বেগ, উত্কণ্ঠা, হতাশা। এ যুগে প্রশান্তি চপল-চরণ সোনার হরিণ। প্রশান্তি তো নিছক ফেসবুকে পাওয়া ১০ মিনিটে চাপমুক্তির রেসিপি নয়। এ এক অটুট আবরণ। চাপ, উত্তেজনা আর অস্থিরতা থেকে যা আমাদের পুরো অস্তিত্বকে মুড়ে রাখে। এই চির সত্য বাস্তবতা নিয়েই আমদের পার্থিব জীবন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি কোরআনে এমন বিষয় নাজিল করি, যা সব রোগের সুচিকিত্সা এবং মুমিনের জন্য রহমত।’ (সুরা বানি ইসরাইল, আয়াত ৮২)।
শরীর হলো খাঁচার মতো, মন হলো চিন্তা করার জায়গা আর মনকে তার জায়গায় ঠিক রাখাই আমাদের প্রশান্তির প্রথম কাজ। শরীর যেমন সুষম আহারে, সুনিদ্রায় সুস্থ থাকে। আবার শরীর সুস্থ রাখার পথ এখন হাজারো। এখন ব্যায়াম করার জন্য জিম দেখা যায়। আবার অনেকে মন ফ্রেশ রাখার জন্য সকাল বেলা হাঁটতে বের হন। ঘাসের সবুজ, লেকে সরের মতো শেওলা, ফেরিওয়ালার চাঙাড়িতে ফলের হরেক রং, চেনা মানুষের চকিত হাসি মেজাজ চনমনে করে দেয়। পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন জায়গায় এ বিষয়ে আলোচনা রয়েছে। ঐ সব আলোচনার সারমর্ম হলো—যাদের অন্তর ইমানের নূরে আলোকিত, তারা সমগ্র পৃথিবীতে সুন্দর, কল্যাণ আর ভালো ছাড়া অন্য কিছুই চোখে দেখেন না। তারা মহাপ্রজ্ঞাবান সেই স্রষ্টা ও প্রতিপালক খোদার প্রার্থনা করেন, যিনি এই বিশ্ব সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিয়ে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি সুন্দর ও কল্যাণ ছাড়া তার সৃষ্টিকুলের জন্য অন্য কোনো কিছুই পছন্দ করেন না।
মানুষ যখন মানসিক চাপের সম্মুখীন হয়, তখন একধরনের নেতিবাচকতা তাকে পেয়ে বসে। নিজের সম্পর্কে বা নিজের দিকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে তাকাতে শুরু করে দেয়, যার ফলে আত্মবিশ্বাস নড়বড়ে হয়ে ওঠে, বিষণ্নতা অবসাদ পেয়ে বসে। ফলে সে অশালীন ও অসংলগ্ন আচরণ করতে শুরু করে, অযথা উত্তেজিত হয়ে যায়। গবেষণায় উঠে এসেছে, মুসলিমরাই এই পৃথিবীতে সবচেয়ে সুখী। কারণ মুসলিমরা একজন সৃষ্টিকর্তার ওপর পরিপূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রেখে জীবন পরিচালনা করেন। মুসলিমরা তকদির বা ভাগ্যে বিশ্বাস করেন। ফলে অল্পতেই তারা সন্তুষ্টি ও পরিতৃপ্তি বোধ করেন। মুসলিমদের মনে আল্লাহর ভয় থাকে বদ্ধমূল। ফলে তারা বহুবিধ পাপাচার থেকে বিরত থাকেন। আল্লাহর একত্ববাদ আর আল্লাহর ওপর দৃঢ় বিশ্বাস মুসলিমদের প্রভাবিত করায় হতাশা ও উদ্বেগ তাদের খুব বেশি গ্রাস করতে পারে না। গবেষণার বিশ্লেষণে দেখা যায়, অতিমাত্রায় একত্ববাদে বিশ্বাস বিষণ্নতা, মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও আত্মহত্যার ঝুঁকি কমিয়ে দেয়। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, ধর্ম ও সুখের সঙ্গে একটি ইতিবাচক সংযোগ আছে। (সূত্র :দৈনিক ইত্তেফাক, ১১ জুলাই ১৯)।
ইতালির বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী ৩৮ বছর বয়স্ক রোকসানা ইলিনা নেগ্রা ইসলাম গ্রহণের পর তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘আমি পবিত্র কোরআন অধ্যয়ন করেছি। যতই পড়েছি, ততই আমি মুগ্ধ হয়েছি। এই মুগ্ধতা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমি মনোবিজ্ঞানের ছাত্র। আমি সব সময় প্রশান্তির জন্য, অসুস্থতা থেকে নিরাময়ের উপায় খুঁজে বের করার চেষ্টা ও গবেষণা করেছি। আলহামদুলিল্লাহ! আমি এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি—ইসলামেই রয়েছে সবকিছুর সঠিক সমাধান।’ (সূত্র :দৈনিক ইনকিলাব, ১৬ জানুয়ারি ২০১৭)
ইসলামের প্রধান ইবাদত নামাজ অনুশীলন দুনিয়ায় প্রশান্তি লাভের অন্যতম সেরা মাধ্যম।’ (প্রাগুক্ত)। নামাজ আদায়ের মাধ্যমে মানুষের অন্তরে প্রশান্তি আসে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে ভীরুরূপে। যখন তাকে অনিষ্ট স্পর্শ করে, তখন সে হা-হুতাশ করে। আর যখন কল্যাণপ্রাপ্ত হয়, তখন কৃপণ হয়ে যায়। তবে তারা স্বতন্ত্র, যারা নামাজ আদায়কারী। যারা তাদের নামাজে সার্বক্ষণিক কায়েম থাকে।’ (সুরা মায়ারিজ, আয়াত ১৮-২৩)। পরিপূর্ণ মানসিক প্রশান্তি লাভ ও সব রকম মানসিক উত্কণ্ঠা থেকে মুক্তির অন্যতম উপায় হলো আল্লাহ তায়ালাকে স্মরণ করা। আল্লাহ তায়ালাকে স্মরণের মাধ্যমে মানসিক প্রশান্তি ও হূদয়ের পরিতৃপ্তি অর্জিত হয়। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা ইমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে তাদের অন্তর প্রশান্ত হয়। জেনে রেখো, আল্লাহর স্মরণেই শুধু হূদয় প্রশান্ত হয়।’ (সুরা রাদ, আয়াত ২৮)
রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হতেন, বেলাল (রা.)কে বলতেন, ‘নামাজের ইকামত দাও, এর মাধ্যমে আমাকে প্রশান্তি দাও।’ আবু দাউদ, হা/৪৯৮৫। রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন পেরেশান হতেন, নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। আবু দাউদ, হা/১৩১৯। আমাদের প্রত্যেকের জীবনের আলাদা ও ভিন্ন লক্ষ্য রয়েছে, নির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। যার প্রতি নজর দেওয়া প্রয়োজন এবং তার আগে প্রয়োজন সেই লক্ষ্য স্থির করা। ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভ্যানিয়ার সাইকোলজিস্ট মার্টিন সেলিগম্যান জানান, যে কোনো বিষয়ে লক্ষ্য খুঁজে বের করার মাধ্যমে দীর্ঘায়ু পাওয়া সম্ভব হয়। জীবন আনন্দের সঙ্গে কাটানো যায়। নিজের পরিবার, বন্ধু, ভালোবাসার মানুষ ও প্রিয় বিষয়গুলো নিয়েই লক্ষ্যের উদ্দেশ্যে কাজ করা যায়। একজন ইমানদার আল্লাহ তায়ালার ওপর এই বিশ্বাস রাখেন যে, সর্ববিষয়ে আল্লাহ তায়ালা তার জন্য যথেষ্ট। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর নির্ভর করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।’ (সুরা তালাক, আয়াত ৩) আল্লাহর ওপর নির্ভরশীলতা এবং পরিপূর্ণভাবে বিশ্বাস স্থাপনে তার মনোবল বেড়ে যায়। ফলে সে অন্তরে খুঁজে পায় এক অনাবিল সুখ ও পরিতৃপ্তি।
lলেখক :ইসলামি গবেষক