রবীন্দ্রনাথ :নিরন্তর বৈভবে

রবীন্দ্রনাথ নিরন্তরভাবে বাংলা সাহিত্য, বাঙালির জীবন ও যাপনে বহমান। এক অনিঃশেষ চেতনা যা কাল থেকে মহাকালে পরিব্যাপ্ত। তাঁর জন্ম ও প্রয়াণ দিবসে যে সব আয়োজনে আমরা তাঁকে স্মরণ করি, তা চিরকালীন আয়োজনে পরিণত হয়েছে অনেক আগে। কখনো নীরবে, কখনো সরবে। রবীন্দ্রনাথ চিরকালীন ঐশ্বর্যে মহিমান্বিত। অসীম, অনন্ত জাগরণে ধ্বনিময়, প্রসারিত ও স্থিত।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর অতুলনীয় প্রতিভায় সাহিত্যের বিভা ছড়িয়েছেন। তাঁর সৃজনশীলতার স্পর্শ বাংলা সাহিত্য জুড়ে সর্বত্র। তাঁর সৃষ্ট কর্ম চিরকালীন সমৃদ্ধির এক অমিয় ভান্ডার। শুধু বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে নয়, তাঁর লেখা, সৃষ্টি বিশ্বসাহিত্যেরও এক অমূল্য সংযোজন। একবিংশ শতকের আজকের দিনে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির মূল্যায়ন বা আলোচনা নতুন করে এ মহান সাধকের কীর্তিকে তুলে ধরার জন্য নয়। তাঁর অসীমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা বিনয়াবনত হূদয়ের মুগ্ধতার প্রকাশ মাত্র। রবীন্দ্রনাথ ও বাংলা সাহিত্য, বাঙালির জীবন অবিচ্ছেদ্য, অতলান্তিক সম্পর্কের বুননে ঋদ্ধ। বহুবিচিত্র নানামাত্রিক সৃষ্টিসম্ভার ও সংস্কারে তিনি উচ্চারিত, উপলব্ধিতে ধ্বনিময় নিয়ত। রবীন্দ্রনাথ কবি—এটা তাঁর সর্বজনগ্রাহ্য সর্বজনীন পরিচয়। এর সাথে এটাও সর্বজনবিদিত যে, তাঁর প্রতিভার বহুমাত্রিকতা কালের বিবর্তনে উজ্জ্বল ও উত্তীর্ণ শাশ্বত বর্ণচ্ছটায়।

কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক, সংগীত, ভ্রমণসাহিত্য, চিঠিপত্র, চিত্রকলা কোথায় নেই রবীন্দ্রনাথ। সাহিত্যের সব শাখাতে তিনি সোনা ফলিয়েছেন। যখন যেখানে হাত দিয়েছেন সেখানে তাঁর জাদুকরি স্পর্শ অজর হয়ে উঠেছে। বাংলা কবিতাকে তিনি দেশ ও সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে ব্যাপ্ত করেছেন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আন্তর্জাতিক পরিচয় ও প্রতিষ্ঠায় তিনি একক সারথি—একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। উপন্যাসে আধুনিকতা বলতে যা বোঝায়, রবীন্দ্রনাথ বাংলা উপন্যাসে তার দ্বার উন্মুক্ত করেছেন। জীবনবোধ ও মানবিক সংঘাতে যে জীবন নিয়ত তাড়িত, সংকট ও সম্ভাবনায় কখনো উজ্জ্বল তা তিনি সফলভাবে তুলে ধরেছেন। বাংলা ছোটগল্প তাঁর হাত ধরে সাফল্যের সোপানে স্থায়িত্ব লাভ করেছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর অসাধারণ দক্ষতায় বাংলা নাটকের ঐতিহাসিক ভিত্তি নির্মাণ করেছেন। সংগীতের ক্ষেত্রে তিনি ভাব ও সংবেদের এক বিশাল ভুবন তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। চিঠিপত্রকে তিনি সাহিত্যের মর্যাদায় উন্নীত করেছেন। বিশ্বভারতী থেকে প্রকাশিত ‘রবীন্দ্র চিঠিপত্র’ এর স্বাক্ষর বহন করে। এ সবই রবীন্দ্রনাথের সহজাত প্রতিভার ফসল। এর বাইরে তাঁর অনেক সংস্কার ও উদ্ভাবন রয়েছে যা রবীন্দ্রমানস থেকে সৃষ্ট ও সম্প্রসারিত।

জমিদার তনয় হওয়া সত্ত্বেও কোনো অহংবোধ তাঁর মানসপটে বড় হয়ে দেখা দেয়নি কখনো। মানুষ, মানবতা, কল্যাণ ও শাশ্বত বোধকে তিনি সবসময় লালন করেছেন। এর বাস্তব প্রতিফলন ঘটিয়েছেন সংস্কার ও উদ্ভাবনীমূলক কর্মকাণ্ডে। তিনি অনুধাবন করেছিলেন, কৃষিভিত্তিক সমাজে গ্রামীণ জনগণের ভাগ্যোন্নয়ে সাধারণ মানুষকে মানব সম্পদে পরিণত করা অত্যাবশ্যক। শুধু কৃষি উত্পাদন বৃদ্ধি নয়, মধ্যস্বত্বভোগীদের হাত থেকে কৃষকদের স্বার্থরক্ষায় তিনি তাদের উত্পাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। ১৮৯৯ সালের দিকে তিনি কৃষি গবেষণা কার্যক্রম শুরু করেন। দারিদ্র্য মোচনে তিনি কৃষি ব্যাংকের প্রতিষ্ঠা, গ্রামীণ নারী সমাজের উন্নয়নে বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রচলন করেন। তিনি সাধারণ মানুষের জীবনের উন্নয়নে ক্ষুদ্র ঋণের প্রবর্তক। ১৯০৬ সালে কৃষি ও গবাদি পশু লালন-পালন সম্পর্কে লেখাপড়া ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের জন্য তিনি পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বন্ধুপুত্র সন্তোষ কুমারকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিয়ন ইউনিভার্সিটিতে পাঠিয়েছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ এদেশে সমবায়ভিত্তিক কৃষি আন্দোলনের পথিকৃত্। সমবায়ভিত্তিক কৃষিব্যবস্থাকে কার্যকর করার মানসে কৃষকদের জন্য সুদমুক্ত কৃষিঋণের ব্যবস্থা চালু করেন। এ লক্ষ্যে শিলাইদহ ও পতিসরে দুটি কৃষি ব্যাংকের প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর প্রাপ্ত অর্থের সিংহভাগ তিনি পতিসরের ব্যাংকে মূলধন হিসাবে জমা দিয়েছিলেন। এভাবে নিজ অর্থে তিনি সাধারণ মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, শুধু কৃষির উন্নয়নে গ্রামীণ জনগণের উন্নয়ন হবে না। এর সাথে প্রয়োজন রাস্তাঘাটের উন্নয়ন ও শিক্ষাব্যবস্থার প্রসার। সেই সাথে চেয়েছিলেন মানবিকতার বিকাশসহ তাদের অধিকার-সচেতন করতে। তিনি বিশ্বাস করতেন অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী মানুষগুলো শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে উঠবেন। তাদের অধিকার ও স্বাধীনতা সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠবেন। মানবিকতার বোধ জাগ্রত হবে তাদের মধ্যে। অসাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প থেকে তারা নিজেদের মুক্ত রাখবেন।

শিক্ষাবিস্তারে তাঁর চিন্তাভাবনা এখনো গুরুত্ব সহকারে বিবেচিত হয়। শিক্ষার সাথে প্রযুক্তি ব্যবহারের গুরুত্বকে তুলে ধরে তিনি একজন আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক মনীষী হিসেবে যে দূরদর্শিতার স্বাক্ষর রেখেছেন সত্যি তা বিস্ময়কর। রবীন্দ্রনাথ শিশু শিক্ষার সাথে বয়স্ক শিক্ষার উপরও সমান গুরুত্ব আরোপ করেন। বয়স্ক শিক্ষার জন্য তিনি পতিসরসহ তাঁর জমিদারি এলাকায় দুই শতাধিক বয়স্ক শিক্ষা স্কুল বা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এর পাশাপাশি নারী শিক্ষার প্রসারে তিনি খুব আন্তরিক ও উদ্যোগী ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, গ্রামীণ সমাজের উন্নয়নে নারী, পুরুষ উভয়ের শিক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। তাই তিনি ছাত্রীদের জন্য শান্তি নিকেতনে শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। নারী শিক্ষার জন্য রবীন্দ্রনাথের এ উদ্যোগ প্রচলিত রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থার অন্ধ দৃষ্টিভঙ্গিতে অনেকটা আলোর উন্মোচন ঘটিয়েছিল।

রবীন্দ্রমানসে মানবকল্যাণ সাধনের বিষয়টি বিদ্যমান ছিল সবসময়। সাহিত্যে তাঁর অতুলনীয় প্রতিভার স্ফুরণের পাশাপাশি তিনি  কল্যাণমুখী বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন শেষ পর্যন্ত। এভাবেই বাংলা ভাষা, সাহিত্যে শুধু নয়, নানারকম সংস্কার, উদ্ভাবনে মানবকল্যাণের মধ্য দিয়ে তিনি নিরন্তর বৈভবে মহিমান্বিত। এ মহিমা কাল থেকে কালান্তরে পরিব্যাপ্ত।