এম এ মাসুম
নিয়মিতভাবে যারা প্রচুর কেনাকাটা ও ঘোরাঘুরি করতেন, তারা খরচের হাত গুটিয়ে রেখেছেন। প্রবাসীরা পর্যাপ্ত পরিমাণে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় পাঠাচ্ছেন। তাদের পাঠানো ডলার ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে কিনে নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর বিপরীতে নগদ টাকা দিচ্ছে। এভাবে ব্যাংকগুলোতে গচ্ছিত নগদ টাকার পরিমাণ বাড়ছে। আমানতের সুদহার কম হলেও সব টাকাই বিভিন্ন ব্যাংকে জমা হচ্ছে। এতে ব্যাংকগুলোতে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা জমা আছে। এর মধ্যে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা একেবারেই অলস। বাকি টাকায় কেনা হয়েছে বিভিন্ন বিল ও বন্ড। অনেক ব্যাংক অলস টাকার অপব্যবহার করছে বলেও অভিযোগ আছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, গত জুন পর্যন্ত ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য রয়েছে ২ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে একবারে অলস পড়ে আছে ৬২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অলস এ অর্থের বিপরীতে কোনো সুদ পায় না ব্যাংক। এতে করে অধিকাংশ ব্যাংক এখন আমানত নিতে অনীহা দেখাচ্ছে। করোনা ভাইরাসের প্রভাব শুরুর পর বাংলাদেশ ব্যাংক গত বছর বাজারে তারল্য বাড়াতে নানা নীতিসহায়তা দিলেও ঋণ চাহিদা বাড়েনি। যে কারণে অলস অর্থ বাড়ছে।
নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোকে গ্রাহকের গচ্ছিত আমানত থেকে ১৭ শতাংশ পরিমাণ অর্থ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সিআরআর (নগদ জমা) ও এসএলআর (সংবিধিবদ্ধ জমা) হিসেবে রাখতে হয়। বাকি টাকা ঋণ দিতে পারে ব্যাংকগুলো। ইসলামি ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে এই হার সাড়ে ৯ শতাংশ। একটি ব্যাংকে সংবিধিবদ্ধ জমার অতিরিক্ত টাকা জমা থাকলে সেটি অতিরিক্ত তারল্য হিসাবে বিবেচিত হয়। এছাড়াও অতিরিক্ত তারল্যের মধ্যে রয়েছে নগদ টাকা, ডলার, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সোনালি ব্যাংকে থাকা অতিরিক্ত জমা ইত্যাদি। এই অতিরিক্ত টাকা জমার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে এক. ঋণের সুদের হার বেঁধে দেওয়া, দুই. করোনাকালে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়া।
বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে সরকারি প্রণোদনার বাইরে ব্যাংকগুলোর তেমন ঋণ বিতরণ হচ্ছে না। কারণ, ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগে যাচ্ছেন না। তারা অনুকূল সময়ের অপেক্ষায় আছেন। ফলে ব্যাংকগুলোতে অলস তারল্যের পরিমাণ বেড়েই চলেছে।
ব্যাংকগুলো এখন জমতে থাকা টাকা সরকারের বিভিন্ন বন্ড ও অন্যান্য ব্যাংকের বন্ডে বিনিয়োগ করে আমানতের খরচ সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে সেখানেও চাহিদামতো বিনিয়োগ করতে পারছে না। ঋণের চাহিদা না থাকায় অনেক ব্যাংক ঋণের সুদহার কমিয়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। যদিও সুদের হার কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণের সুদ সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল। আবার অনেক ব্যাংক ঋণের সুদ কমানোর পাশাপাশি আমানতের সুদহারও কমিয়ে আড়াই শতাংশ করেছে। এতে সুদ আয়ের ওপর নির্ভরশীল আমানতকারীদের খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ব্যাংকগুলোও তারল্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কঠিন সময় পার করছে।
ব্যাংকাররা বলছেন, এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পেছনে কয়েকটি সুস্পষ্ট কারণ রয়েছে। যেমন একদিকে প্রবাসী আয়ে উল্লম্ফন চলছে, অন্যদিকে আমদানি গতিহীন হয়ে পড়ছে। গ্রাহকদের মধ্যে খরচ কমে সঞ্চয়ের প্রবণতা বাড়ছে। নতুন প্রকল্প না থাকায় ঋণ বিতরণ সেভাবে বাড়ছে না। ব্যবসায়ীরা এখন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বিদ্যমান ব্যবসাই ধরে রাখায় জোর দিয়েছেন। আবার অনেকেই প্রণোদনার ঋণ নিয়ে পুরোনো দায় শোধ করে চাপ কমানোর চেষ্টা করছেন।
সাধারণত ব্যাংকগুলোতে আসা প্রবাসী আয়ের অর্ধেক গ্রাহক তুলে নেন। বাকি অর্থ ব্যাংকগুলো আমদানি খাতে ব্যবহার করে। পাশাপাশি প্রতিটি ব্যাংকের ডলার রাখার একটি সীমা আছে। এর বেশি হলেই তা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বিক্রি করে দিতে হয়।
বিপুল পরিমাণ এ অলস তারল্যের নেতিবাচক নানা প্রভাব পড়তে শুরু করেছে অর্থনীতিতে। ইতিহাসের সর্বনিম্নে নেমেছে বেসরকারি ব্যাংকের মেয়াদি আমানতের সুদহার। কলমানির সুদহারও নেমে এসেছে ১ শতাংশের নিচে। এ অবস্থায় বিনিয়োগের বিকল্প উত্স খুঁজতে গিয়ে অনুত্পাদনশীল খাতে টাকা ঢালতে শুরু করেছে ব্যাংকগুলো। সব মিলিয়ে মুদ্রাবাজারে সৃষ্টি হওয়া অভূতপূর্ব এ পরিস্থিতি সামাল দিতেই বাংলাদেশ ব্যাংক বিলের নিলাম শুরু করেছে। অতিরিক্ত তারল্যের কুফল থেকে মুদ্রাবাজারকে সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল দুই হাতিয়ার রিভার্স রেপো ও স্বল্পমেয়াদি বিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে রিভার্স রেপোর বিকল্প হাতিয়ার হিসেবে স্বল্পমেয়াদি বিলকে কাজে লাগাতে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ব্যাংক গ্রাহকের কাছ থেকে কম সুদে আমানত সংগ্রহ করে। সংগৃহীত আমানত বেশি সুদে সাধারণ ঋণ গ্রাহক (ভোক্তা ঋণ), শিল্প উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীর কাছে ঋণ হিসাবে প্রদান করে। ঋণ আর আমানতের সুদের পার্থক্য থেকে ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো মুনাফা অর্জন করে। ব্যাংক যদি কম সুদে আমানত গ্রহণ করতে পারে তবে তার দেওয়া ঋণের সুদের হারও কম হয়।
করোনা মহামারি ছড়িয়ে পড়ার পর গত বছরের মার্চের শেষদিকে লকডাউন শুরু হয় যা থেমে থেমে চলতি বছরেও চলতে থাকে। বিধিনিষেধে অর্থনীতির চাকার ঘূর্ণন কমে গেছে। এতে বাড়ছে ক্ষতির পরিমাণ। বিধিনিষেধ আরো দীর্ঘায়িত হলে ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়বে। নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনা থেকে সরে আসেন অনেক ব্যবসায়ী। চলমান ব্যবসাও বন্ধ হয়ে যায় কারও কারও আবার কেউবা ছোট করেন ব্যবসার পরিসর। চাকরিজীবীরাও সব ধরনের বিনিয়োগ ও বাড়তি খরচ থেকে সরে এসে সঞ্চয় শুরু করেন।
একটি দেশের তিন মাসের আমদানি চাহিদা মেটানো যায় এমন পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থাকা আবশ্যক বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদগণ। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে আমাদের এখন ১০ মাসের বেশি আমদানি ব্যয় মেটানোর জন্য বৈদেশিক মুদ্রা মজুত রয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অলস না রেখে অবকাঠামো তৈরিতে ব্যবহার করা যায়। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপে বিনিয়োগ করা যেতে পারে। বিপুল সম্ভাবনাময় গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণসহ বিভিন্ন আয় উত্সারী কর্মকাণ্ড বাড়ে এমন জায়গায় সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।