তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে উদীয়মান অর্থনৈতিক তারকা

স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে ডয়েচেভেলের মূল্যায়ন

শফিকুর রহমান রয়েল

 

দীর্ঘদিনের পরাধীনতা এবং ফলস্বরূপ শোষণ ও বঞ্চনা, তার ওপর ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের সময় বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থা কেমন ছিল, তা সহজেই অনুমেয়। তবুও বলা—পরিস্থিতি ছিল নিদারুণ করুণ ও চূড়ান্ত বিশৃঙ্খল। মোট জনসংখ্যার ৮০ শতাংশেরও বেশি লোকের বসবাস ছিল চরম দারিদ্র্যের মধ্যে। ভাবতেও অবাক লাগে, অর্থনৈতিকভাবে সেই ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ অবস্থা থেকে গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশ আজ নিজেকে রূপান্তরিত করেছে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধিষ্ণু অর্থনীতিগুলোর একটিতে। স্বাধীনতা-পরবর্তী  বেশ কয়েক বছর পর্যন্তও বলতে গেলে সংগ্রামই চলছিল। সামরিক অভ্যুত্থান, রাজনৈতিক অস্থিরতা, দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষের মোকাবিলা করতে গিয়ে একটা সময়ে মনে হচ্ছিল যে, নবসৃষ্ট দেশটির বিষয়ে সেই অপবাদ এবং অপবাদকারীরাই হয়তো সত্যি।

১৯৭০-এর দশকে এই নিয়ে যুক্ততর্ক চলত যে, ‘বাংলাদেশে উন্নয়ন সম্ভব হলে পৃথিবীর যে কোনো দেশেই তা সম্ভব।’ কী নির্মম পরিহাস, আর ডয়েচেভেলেকে দেওয়া সাম্প্রতিক এক সাক্ষাত্কারে ঐ তির্যক মন্তব্যটির কথা স্মরণ করেন বাংলাদেশ সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি আরো জানান, দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষুদ্র এ দেশটি মূল্যায়িত হতো উন্নয়নের ‘পরীক্ষা ক্ষেত্র’ হিসেবে। কিন্তু আজ মূল্যায়ন করতে গেলে বলতে হবে, সেই অবস্থা দ্রুতই কেটেছে আর বাংলাদেশের পরিস্থিতির ঘটেছে নাটকীয় উন্নতি।

নরওয়ের সামাজিক গবেষক এরিক জি ইয়ানসেন জানান, প্রায় সাড়ে তিন দশক পর ২০০৯ সালে তিনি আবার গিয়েছিলেন বাংলাদেশের এক গ্রামে। ৩৫ বছরের ব্যবধানে ঐ গ্রামের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও আয়ের স্তরের অগ্রগতি দেখে এককথায় বিস্মিত হন তিনি। এর মধ্যে লোকজনের আয় বেড়ে গেছে কমপক্ষে ১০ গুণ। তার কথায়, ‘পাঁচ কিংবা ছয় জনের একটি খানার জন্য আগে বড়জোর দেড় কিলোগ্রাম চাল আনা হতো, আর তা দিয়েই পুরো পরিবারটির খাবারের চাহিদা মেটানো হতো।’ ইয়ানসেন আরো যোগ করেন, তীব্র দারিদ্র্যের মানেই হলো—অসংখ্য লোকের পর্যাপ্ত খাবার না পাওয়া, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সেবা নামেমাত্র টিকে থাকা। বয়স ৪০ কিংবা ৫০-এর ঘরে থাকা অনেকেরই মৃত্যু ঘটত তখন। ঐ বয়সে এমন সব মৃত্যু ঘটত, যেগুলো পুষ্টির ঘাটতি না থাকলে সহজেই প্রতিরোধ করা যেত। শিশু মৃত্যুর হারও ছিল তখন অত্যধিক।

ইয়ানসেন আরো জানান, ২০১০ সালে মানিকগঞ্জের ঐ গ্রামটিতে আবার গিয়ে দেখতে পান, ছেলে ও মেয়েরা সমান তালে পরিমার্জিত একটি স্কুলে আসা-যাওয়া করছে। তার মতে বিশেষত নারী শিক্ষার কারণে আর্থসামাজিক কাঠামো পালটে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত করেন, ‘নারী ও মেয়েদের শিক্ষায় বৃত্তির বন্দোবস্ত করাটা উন্নয়নের আরো একটা বড় কারণ। নারীরা আজ অনেক সাহসী। দীর্ঘদিন আগে আমি তাদের যেমন লাজুক দেখেছিলাম, এখন আর সেরকম নেই।

৩০৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি জিডিপি নিয়ে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের ৪১তম বৃহত্ অর্থনীতি। প্রাক্কলন জানান দিচ্ছে ২০৩০ সাল নাগাদ অর্থনীতির আকার দাঁড়াবে দ্বিগুণ। ১৯৭১ সালে ছিল প্রায় পুরোপুরিই কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি। কিন্তু গত কয়েক দশকে অর্থনীতির মিশ্রণে ঘটেছে ব্যাপক পরিবর্তন। শিল্প ও সেবা এখন অর্থনৈতিক উত্পাদনের বড় অংশীদার। জিডিপিতে কৃষির হিস্যা নেমে এসেছে মাত্র ১৩ শতাংশে। ইয়ানসেন মনে করেন, কৃষির বাইরে কাজের পর্যাপ্ততা অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশাল ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশের সাফল্যগাথার নিয়ামক হচ্ছে গার্মেন্ট শিল্প। কয়েক দশকের চেষ্টায় এ দেশ এখন বছরে ৩৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের তৈরি পোশাক রপ্তানি করে। এ শিল্পে বাংলাদেশ ওপরে রয়েছে কেবল চীন। তারা ইদানীং ভারী শিল্পের দিকে বেশি ঝোঁকায় শীর্ষস্থানটি হয়তো ছেড়ে দিতে হতে পারে বাংলাদেশের কাছে।

গার্মেন্ট খাতে কাজ করে ৪০ লাখেরও বেশি লোক। এর সিংহভাগই নারী। এতে করে ঘটছে নারীর ক্ষমতায়ন। এই খাত কেবল অর্থনীতিকেই বদলে দিচ্ছে না, নারীর সামাজিক মর্যাদাও বৃদ্ধি করছে। এ খাত ছাড়াও বাংলাদেশের অর্থনীতির নাটকীয় উন্নতিতে রেমিট্যান্সের রয়েছে বিশাল ভূমিকা।

বাংলাদেশে স্কুলগামী শিশুর সংখ্যা বাড়লেও শিক্ষার গুণমান প্রশ্নবিদ্ধ। দক্ষ জনশক্তির উন্নয়নে এটি একটি বড় প্রতিবন্ধক। এছাড়া বিশেষজ্ঞদের মতে, চিত্তাকর্ষক প্রবৃদ্ধি ঘটছে ঠিকই কিন্তু এর সুফল সবাই সমানভাবে ভোগ করতে পারছে না। আয় বৃদ্ধির অসমতার পাশাপাশি রয়েছে চাকরি সৃষ্টির ধীর গতি। মাথাপিছু আয় অনেক বেড়েছে, কিন্তু আয় ও সম্পদের বিন্যাসের ফারাকটা যত কমানো যাবে ততই মঙ্গল। শীর্ষ আয়ের ৫ শতাংশ ও নিম্ন আয়ের ৪০ শতাংশ লোকের মধ্যে আয়ের ব্যবধান দিনে দিনে কেবলই বাড়ছে। আরেকটি সমস্যা হচ্ছে, ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোর অর্থনৈতিক কার্যক্রমের ওপর খুব বেশি মনযোগ দেওয়াতে শহর ও গ্রামের মধ্যে বিশাল বিভাজন তৈরি হচ্ছে। এর পাশাপাশি বাড়ছে নগর দারিদ্র্য। বাংলাদেশের আজ সবচেয়ে বড় যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি তা হলো—অর্থনৈতিক পিরামিডের একেবারে নিচের দিকে থাকা লোকজনের কাছে প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের সুফল পৌঁছে দেওয়াটা কীভাবে নিশ্চিত করা যায়।

—ডয়েচেভেলে অনুসরণে