‘সাপ্লাই ক্রিয়েটস ওন ডিম্যান্ড’ এই ধারণা কি ঠিক?

বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত করোনা ভাইরাস সংক্রমণ খুব শিগিগরই দূর হবে বলে মনে হয় না। এমনকি কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ বলছেন, আগামী দিনে কোনো দিনই বিশ্ব সম্পূর্ণরূপে করোনামুক্ত হতে পারবে না। কলেরা, ম্যালেরিয়া, গুটিবসন্ত ইত্যাদি রোগের মতোই করোনা বিশ্বব্যাপী বিরাজ করবে। তবে কখনো কম কখনো বেশি এবং কোনো কোনো বিশেষ অঞ্চলে এই সংক্রমণ বিরাজ করবে। কাজেই করোনাকালীন অবস্থাতেই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রম শুরু করতে হবে। ইতিমধ্যেই করোনায় প্রাণহানি সীমিত রাখার পাশাপাশি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে এই পুনরুদ্ধার কার্যক্রম কীভাবে বাস্তবায়ন করলে তা সবচেয়ে কার্যকর এবং ফলপ্রসূ হবে তা নিয়ে কিছুটা দ্বিমত লক্ষ করা যায়। অনেকেই এমন প্রশ্নও উত্থাপন করেন—জীবন বড়, নাকি জীবিকা বড়। এটা আসলে ‘মুরগি আগে নাকি ডিম আগে’ সেই অন্তহীন বিতর্কের মতোই। আসলে জীবন ও জীবিকা দুটোকে সমন্বয় করেই এগিয়ে যেতে হবে। জীবন ছাড়া জীবিকা যেমন অর্থহীন, তেমনি জীবিকা ছাড়া জীবনও মূল্যহীন। তাই জীবন বাঁচানোর পাশাপাশি মানুষের জীবিকার ব্যবস্থা করতে হবে। করোনার কারণে কর্মচ্যুত এবং জীবিকাচ্যুত হয়েছেন অনেকেই। তারা মারাত্মক দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন। সবচেয়ে বেশি দরিদ্র মানুষগুলোকে অর্থায়িত করা অর্থাত্ তাদের ক্রয়ক্ষমতা বা পারচেজিং পাওয়ার বাড়ানোর জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। যে কোনো দুর্যোগের সময় সাধারণ মানুষের আয়-রোজগার কমে যায় বলে তারা ইচ্ছে থাকলেও প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী ক্রয় করতে পারেন না। আর পণ্যসামগ্রীর বাজার চাহিদা কমে গেলে তার উত্পাদনও হ্রাস পায়। ১৯৩০ সালে বিশ্বব্যাপী সৃষ্ট ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দার পূর্ব পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী একটি সাধারণ ধারণা প্রচলিত ছিল যে, সাপ্লাই ক্রিয়েটস ওন ডিম্যান্ড অর্থাত্ বাজারে পর্যাপ্ত পরিমাণে পণ্য পাওয়া গেলে সেই পণ্যের চাহিদা সৃষ্টি হবেই। কিন্তু সেই মহামন্দার সময় বাজারে পর্যাপ্ত পরিমাণ পণ্যের উপস্থিতি থাকলেও সেই পণ্য ক্রয়ের মতো ভোক্তা পাওয়া যাচ্ছিল না। কারণ, ভোক্তার হাতে পণ্য ক্রয়ের মতো পর্যাপ্ত পরিমাণ অর্থ ছিল না। পরবর্তীকালে অর্থনীতিবিদগণ গবেষণা করে দেখেছেন, বাজারে পণ্যের উপস্থিতি এবং জোগান থাকলেই সেই পণ্য বিক্রি হয় না যদি ভোক্তার পারচেজিং পাওয়ার বা ক্রয় ক্ষমতা না থাকে। পরবর্তীকালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সরকারিভাবে ভোক্তাদের হাতে অর্থের জোগান বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করে। যারা এটা সঠিকভাবে করতে পেরেছিল সেই সব সরকারই অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলায় সমর্থ হয়েছিল। পরবর্তীকালে ১৯৪৩ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ভারতীয় উপমহাদেশে যে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয় সে সময় বাজারে নিত্যপণ্যের কোনো কমতি ছিল না। বাজারে প্রচুর পণ্য থাকলেও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সাংঘাতিকভাবে কমে যাওয়ার কারণে তারা পণ্য ক্রয় করতে পারছিল না। ফলে না খেয়ে অনেক মানুষ মারা যায়। ১৯৭৪ সালে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে যে দুর্ভিক্ষ হয় তার পেছনেও খাদ্যসংকট যত না ভূমিকা পালন করেছিল তার চেয়ে বেশি দায়ী ছিল সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং সাপ্লাই ম্যানেজমেন্ট সঠিকভাবে করতে না পারা। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস না পেলে যেভাবেই হোক তারা প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য ক্রয় বা জোগাড় করতে পারে।   

বর্তমানে করোনার কারণে বিশ্বব্যাপী যে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিয়েছে তা সঠিকভাবে  মোকাবিলা করতে না পারলে অনেক দেশেই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হচ্ছে কর্মহীন মানুষের জন্য দ্রুত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা এবং তাদের হাতে নগদ অর্থের জোগান বাড়ানো। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি আলোচনা করলে একই অবস্থা প্রত্যক্ষ করা যাবে। কিছু দিন আগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জরিপে উল্লেখ করা হয়েছিল, করোনার কারণে গত এক বছরের বেশি সময়ে বাংলাদেশের অন্তত ২ কোটি ৪৫ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। কর্মচ্যুত হয়ে অনেকেই শহর ছেড়ে গ্রামে চলে গেছে। এদের বেশির ভাগই আর শহরে ফিরে আসার মতো অবস্থায় নেই। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ১ হাজার ৬০০ পরিবারের ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখতে পায়, ৮০ দশমিক ৬০ শতাংশ পরিবার করনোরা কারণে খাদ্য ব্যয় কমিয়েছে। তারা আগের তুলনায় নিম্ন মানের খাবার গ্রহণ করছে। ৪৭ দশমিক ২০ শতাংশ পরিবার প্রোটিন খাওয়া কমিয়ে দিয়েছে। সিপিডির গবেষণায় যে তথ্য পাওয়া গেছে বাস্তব পরিস্থিতি তার চেয়েও ভয়াবহ। বিশেষ করে দেশের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বিপন্ন অবস্থার মধ্যে রয়েছে। তারা না পারছে কারো কাছে হাত পাততে, না পারছে পরিবারের সদস্যদের জন্য খাবারের সংস্থান করতে। উত্পাদন খাত কার্যত অচল হয়ে যাওয়ার পর্যায়ে রয়েছে। সরকার গত অর্থবছরে বৃহত্ শিল্পের জন্য ৪০ হাজার কোটি টাকার যে ঋণ প্রণোদনা ঘোষণা করেছিল তার প্রায় সবটুকুই তারা ব্যাংক থেকে ছাড় করিয়ে নিয়েছে। কিন্তু তার পরও জিডিপিতে ব্যক্তি খাতের অবদান কমে দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ২৫ শতাংশে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। সম্প্রতি ঘোষিত মুদ্রানীতিতে ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। গত অর্থবছরেও ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণ প্রবৃদ্ধি নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। কিন্তু অর্জিত হয়েছে ৮ দশমিক ৪ শতাংশ। ব্যাংকিং সেক্টর বিনিয়োগযোগ্য উদ্বৃত্ত তারল্য নিয়ে বসে আছে কিন্তু উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীরা ঋণ নিতে আসছে না। গত অর্থবছরে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে ব্যক্তি খাতে ভারতের ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৬ দশমিক ১ শতাংশ, পাকিস্তানের ৫ দশমিক ৭ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ায় ১ দশমিক ১ শতাংশ, শ্রীলঙ্কা ১০ দশমিক ৫ শতাংশ আর ভিয়েতনামে এটা ছিল ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভিয়েতনাম হচ্ছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক সামগ্রীর সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। কিছু দিন আগে ভিয়েতনাম বাংলাদেশকে পেছনে ফেলে বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় অবস্থানে চলে গেছে। ২০২০-২০২১ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানি পূর্ববর্তী অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে ১৩ শতাংশ। শিল্পে ব্যবহার্য কাঁচামাল আমদানিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। গত অর্থবছরে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১৫ দশমিক ১ শতাংশ এবং আমদানি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১৯ শতাংশ। রেমিট্যান্স আহরিত হয়েছিল ২ হাজার ৪৭৭ কোটি ৭৭ লাখ মার্কিন ডলারের। কিন্তু অর্থবছরের শুরুতেই পণ্য এবং জনশক্তি রপ্তানি খাতের আয় কমে গেছে।

সরকার করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। বিশেষ করে, দরিদ্র মানুষের হাতে অর্থ পৌঁছে দেওয়ার জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু সেই প্রচেষ্টা কতটা সফল হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করার অবকাশ রয়েছে। বাজেটে দরিদ্র মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে সামাজিক সুরক্ষা খাতে অর্থ বরাদ্দের পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। এই খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে ১ লাখ ৭ হাজার ৬১ কোটি টাকা। এটা মোট বাজেট বরাদ্দের ১৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ এবং জিডিপির ৩ দশমিক ১১ শতাংশ। গত বছর সামাজিক সুরক্ষা খাতে ৯৫ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এ বছর নতুন করে ১৪ লাখ মানুষকে সামাজিক সুরক্ষা খাতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গত বছর যারা সামাজিক সুরক্ষা খাত থেকে ভাতা গ্রহণ করেছেন তাদের মধ্যে ৪৬ শতাংশই এই ভাতা পাওয়ার যোগ্য নন। বাংলাদেশে যে উত্পাদন ইউনিট রয়েছে তার ৮৭ শতাংশই ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প। এই খাতের উদ্যোক্তারা পুঁজির অভাবে তাদের উত্পাদন কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছেন না। সামগ্রিকভাবে এসএমই খাত জিডিপিতে ২৫ শতাংশ অবদান রাখছে।

যারা অনানুষ্ঠানিক খাতে ব্যবসায়-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত, তারা করোনার কারণে সবচেয়ে বিপদে পতিত হয়েছেন। বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তারা বেশি সমস্যায় পড়েছেন। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ৫ শতাংশ সুদে ঋণদানের ব্যবস্থা করেছে। এছাড়া কৃষি ও পল্লি ঋণ কর্মসূচিতে এ বছর ২৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কিন্তু পদ্ধতিগত জটিলতার কারণে এসব উদ্যোগ কাজে আসছে না। এ মুহূর্তে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা একান্ত আবশ্যক। প্রয়োজনে তাদের জন্য সুদবিহীন ঋণদানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। দরিদ্র মানুষের জন্য ত্রাণের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি সুদমুক্ত ঋণদানের মাধ্যমে তাদের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

n লেখক :অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিষয়ক লেখক