আমেরিকান অসে¿ সজ্জিত আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর সংখ্যা ৩ লাখের মতো। বিমান বাহিনীও রয়েছে তাদের। অন্যদিকে তালেবানে যোদ্ধার সংখ্যা ৬০ থেকে ৮০ হাজারের মতো। কোনো ইউনিফর্ম নেই, সিংহভাগ যোদ্ধার পায়ে জুতা পর্যন্ত নেই। কিন্তু তাদের চাপে তাসের ঘরের মতো ধসে পড়ছে আফগান বাহিনীর প্রতিরোধ। তালেবানের এই সামরিক সাফল্যে হতচকিত হয়ে পড়েছে খোদ যুক্তরাষ্ট্র। এরই মধ্যে শুক্রবার রাজধানী কাবুলের মাত্র ৮০ কিলোমিটার দূরে পৌঁছে গিয়েছে তালেবান বাহিনী।
অধিকাংশ পশ্চিমা সামরিক বিশ্লেষক বলছেন, ন্যাটো বাহিনী তালেবানের কোনো ক্ষতি তো করতে পারেইনি, বরং গত ২০ বছরের মধ্যে তালেবান এখন সবচেয়ে শক্তিধর। অবিশ্বাস্য দ্রুত গতিতে তালেবান এগিয়ে যাওয়ায় যে কোনো সময় ঘানি সরকারের পতনের আশঙ্কা করা হচ্ছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, আফগানিস্তান এখন মানবিক বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে। অন্যদিকে তালেবান স্বীকৃতি আদায়ের জন্য চেষ্টা চালাচ্ছে। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ইতিমধ্যে বৈঠকও করেছে। আমেরিকা ও ভারতসহ কয়েকটি দেশ বলেছে, তালেবান জোর করে ক্ষমতা দখল করলে স্বীকৃতি দেওয়া হবে না। মার্কিন সিনেটের প্রভাবশালী রিপাবলিকান সদস্য মিচ ম্যাকোনেল আফগানিস্তান থেকে আমেরিকান নাগরিক ও কূটনীতিকদের সরিয়ে আনার সিদ্ধান্তের সঙ্গে ১৯৭৫ সালে ভিয়েতনামের সায়গন থেকে অপমানজনক প্রত্যাহারের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্¿ী বলেছেন, আমেরিকানদের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। কোনো ব্রিটিশ সরকারি মন্¿ীর মুখ থেকে আমেরিকান প্রেসিডেন্টের সমালোচনা বিরল ঘটনা।
এক দিনে সাত রাজধানীর নিয়ন্¿ণ
এক দিনে তালেবান অন্তত সাতটি প্রদেশের রাজধানী দখলে নিয়েছে। ৩৪ প্রদেশের মধ্যে তালেবান অন্তত ১৮ টি প্রাদেশিক রাজধানী দখল করেছে। বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার দুপুরের মধ্যে কালাত, তেরেনকোট, পুল-ই আলম, ফিরুজ কোহ, কালা-ই-নাও এবং লস্করগাহ শহর দখল করেছে গোষ্ঠীটি। কান্দাহারও দখল করেছে তারা। হেরাতে ৭০ বছর বয়সি আফগান কমান্ডার ইসমাইল খানকে আটক করেছে তালেবান।
যে কোনো সময় পতন ঘানি সরকারের
আফগানিস্তানে তালেবানের অবিশ্বাস্য সামরিক সাফল্যের দিকে আফগান সরকার তো বটেই, পুরো বিশ্বই এখন হা হয়ে তাকিয়ে আছে। কারণ গত সাত দিনে ডজন-খানেকের বেশি প্রাদেশিক রাজধানী শহর তাদের দখলে চলে গেছে। আরো বিস্ময়কর তা হলো, এগুলোর মধ্যে সাতটিই হলো আফগানিস্তানের উত্তর এবং উত্তর-পশ্চিমের প্রদেশ, যেখানে তালেবান অতীতে কখনই তেমন কর্তৃত্ব করতে পারেনি। প্রভাবশালী সংবাদপত্র ওয়াশিংটন পোস্ট এবং বার্তা সংস্থা রয়টার্স মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের নির্ভরযোগ্য সূত্র উদ্ধৃত করে খবর দিয়েছে যে আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মনে করছে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে অবরুদ্ধ হতে পারে কাবুল, আর তিন মাসের মধ্যে আফগান সরকারের পতন হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের শিক্ষক এবং আফগান রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড. আসিম ইউসুফজাই বলছেন, ‘আমি মনে করি আরো দ্রুত কাবুলের পতন হতে পারে। উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমে তালেবান যেভাবে এগুচ্ছে তা সত্যিই বিস্ময়কর।’ তালেবান আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানিকে পদত্যাগের আহ্বান জানিয়েছে। এরই মধ্যে প্রেসিডেন্ট গতকাল শুক্রবার বা আজ শনিবার জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন বলে একটি সূত্র জানিয়েছে। গতকাল এক অনুষ্ঠানে তিনি জানিয়েছেন, জনগন চাইলে তিনি পদত্যাগে প্রস্তুত। ইতিমধ্যে আফগান অর্থমন্¿ী পদত্যাগ করে দেশ ছেড়েছেন। ভাইস প্রেসিডেন্টের পালিয়ে যাওয়ার গুঞ্জন শুরু হয়েছে।
রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্¿ী সের্গেই ল্যাভরভ জানিয়েছে, পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হওয়ায় আফগান সরকার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক ডাকার আহ্বান জানিয়েছেন। এদিকে জাতিসংঘ আফগানিস্তানের প্রতিবেশি দেশগুলোর প্রতি তাদের সীমান্ত খোলা রাখার আহ্বান জানিয়েছে যাতে লড়াই থেকে পালানো বেসামরিক মানুষ সেসব দেশে আশ্রয় নিতে পারে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) জানিয়েছে, আফগানিস্তানে খাদ্য সংকট চরমে পৌঁছেছে। সেখানে একটা বিরাট মানবিক বিপর্যয় ঘটতে পারে বলে তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা ব্রিটেনের
যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্¿ী বেন ওয়ালেস বলেন, আফগানিস্তান গৃহযুদ্ধের দিকে যাচ্ছে। পশ্চিমাদের এটা বোঝা উচিত যে, তালেবান একা নয়, তাদের পেছনে কেউ না কেউ আছে। তাদের নিয়ে কারো স্বার্থ আছে। তাই আমাদেরকে গৃহযুদ্ধের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। এদিকে নাগরিকদের ফিরিয়ে আনতে দেশটি ৩ হাজার সৈন্য পাঠাচ্ছে যাদেরকে বিমানবন্দরে মোতায়েন করা হবে আমেরিকানদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার জন্য। যুক্তরাজ্যও জানিয়েছে, কাবুলে ব্রিটিশ দূতাবাসের কর্মী এবং ব্রিটিশ নাগরিকদের ফিরিয়ে আনতে ৬০০ সৈন্য কাবুলে পাঠানো হচ্ছে।
যেভাবে জয় পাচ্ছে তালেবান
ড. ইউসুফজাই বলেন, তালেবান জানত আমেরিকা একসময় আফগানিস্তান ছাড়বেই। শুধু সময়ের অপেক্ষা করছিল। তিনি আরো বলেন, আমেরিকানদের কৌশল ছিল আফগানিস্তানের প্রধান শহরগুলোকে কব্জায় রাখা। কিন্তু শহরের বাইরে গ্রামগঞ্জে তালেবানের নিয়ন্¿ণ বজায় ছিল। যখন আমেরিকা আফগান সেনাবাহিনীর ওপর নিরাপত্তার দায়িত্ব ছেড়ে দিতে শুরু করল, তালেবান তখন শহরগুলো নিশানা করতে শুরু করে। এরপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন যখন হঠাত্ ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সব আমেরিকান সৈন্য প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত জানান, তখন থেকে আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর ঘুম হারাম করে দিয়েছে তালেবান। অথচ আমেরিকার সংবাদমাধ্যমের দাবি, যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের পুনর্গঠনে আমেরিকা যা খরচ করেছে তার ৬০ শতাংশই হয়েছে আফগান সেনার জন্য। মোট হিসেবে প্রায় ৮ হাজার ৯০০ কোটি ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৭ লাখ ৫৫ হাজার কোটি টাকার বেশি)। তারাই এখন পিছু হটছে।
ড. ইউসুফজাই মনে করছেন যে, রণকৌশলে খুবই বিচক্ষণতার পরিচয় দিচ্ছে তালেবান। অথচ আমেরিকা বা ন্যাটো তালেবানের শক্তি টের পায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা সংস্থা কার্নেগী এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর সাম্প্রতিক এক প্রকাশনায় গবেষক জাইলস দোরোনসোরো ‘তালেবানের যুদ্ধ জয়ের কৌশল’ শিরোনামে এক গবেষণা রিপোর্টে লিখেছেন, তালেবানের বুদ্ধিমত্তা এবং সক্ষমতাকে খাটো করে দেখেছে ন্যাটো জোট। আবার তালেবান জাতিগত পশতুন অধ্যুষিত দক্ষিণ এবং পূর্বের বদলে তারা শক্তি নিয়োগ করেছে উত্তর এবং উত্তর-পশ্চিমের প্রদেশগুলোতে, যেখানে সরকারি বাহিনী এবং সরকার সমর্থিত মিলিশিয়াদের শক্তি বেশি।
তালেবান জানে দক্ষিণ এবং পূর্বের এলাকাগুলো থেকে তারা যে কোনো সময় সহজে সরকারি সৈন্যদের তাড়াতে পারবে। সুতরাং তাদের টার্গেট এখন এমন এমন জায়গা যেখানে কাবুল সরকারের শক্তি বেশি। তালেবান যখন ক্ষমতায় ছিল তখনও তাজিকিস্তানের সীমান্তবর্তী বাদাখশানে তারা ঢুকতে পারেনি। অথচ সেই প্রদেশ এখন তাদের দখলে। এছাড়া তাখার, কুন্দুজ এবং জারাঞ্জের মতো প্রদেশ, যেখানে পশতুনরা সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়, সেগুলোও যেভাবে তেমন বড় কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই তালেবান দখল করেছে, তা বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে। -বিবিসি ও আলজাজিরা