‘সোনার বাংলা গড়তে সোনার মানুষ চাই’। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের পূর্ণতা হোক আমাদের প্রজন্ম স্তরের সংগ্রাম রথে। বঙ্গবন্ধু আমাদের চিরন্তন সংগ্রামের অনুপ্রেরণার উত্স। তার চেতনা ও প্রেরণায় আমরা নির্মাণ করবই সোনার বাংলা। ঘাতকের বুলেট জাতির পিতার দেহ কেড়ে নিতে পারলেও আদর্শের মুজিব চিরঞ্জীব
আজ ১৫ আগস্ট ইতিহাসের বেদনাবিধুর ও বিভীষিকাময় একটি দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনের কালরাত্রিতে ঘটেছিল ইতিহাসের সেই কলঙ্কজনক ঘটনা। বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্রষ্টা, বাঙালি জাতির মহাবিদ্রোহের মহানায়ক, সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা, গণতন্ত্রের মানসপুত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল একাত্তরের পরাজিত শক্তি ও নরপিশাচরা। সেদিন ঘাতকের বুলেটে নিহত হন তার স্ত্রী বঙ্গমাতা বেগম মুজিবও। এছাড়াও তাদের পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনসহ নিহত হন আরো ২৬ জন। এমনকি ঘাতকের নিষ্ঠুর বুলেটের হাত থেকে রক্ষা পায়নি ১০ বছরের নিষ্পাপ শিশু রাসেলও। ধানমন্ডির ঐতিহাসিক ৩২ নম্বর বাসভবনে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু নিহত হলেও সেদিন আল্লাহর অসীম কৃপায় দেশে না থাকায় প্রাণে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এবং কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা।
একটি আধুনিক ও শোষণ দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি নিয়ে বঙ্গবন্ধু যখন সমগ্র জাতিকে ঐক্যবন্ধ করে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছিলেন, ঠিক তখনই দেশি-বিদেশি প্রতিক্রিয়াশীল অপশক্তি মহলের সহযোগিতায় দেশের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠী ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে। তারা বুঝতে পেরেছিল যে, বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধের মতো দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি বাস্তবায়নেও সফল হবে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি নাম, একটি ইতিহাস। তার জীবন ছিল সংগ্রামমুখর। সংগ্রামের মধ্যেই তিনি বড় হয়েছিলেন। তিনি ছাত্রজীবন থেকেই চিন্তা করতেন কীভাবে বাঙালি জাতির ভাগ্য উন্নয়ন করা যায়। কারণ, তিনি দেখেছেন কীভাবে তত্কালীন পূর্ববঙ্গের বাঙালি তার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। পাকিস্তানের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তুলে ষাটের দশক থেকেই তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের অগ্রনায়কে পরিণত হন। তার সঙ্গে আমার অন্যরকম একটা সম্পর্ক ছিল। আমি তাকে অনেক কাছ থেকে জেনেছি, দেখেছি। তার নির্দেশ অনুসারে কাজ করেছি, তার কাছ থেকে অনেক কিছুই শিখেছি। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার তত্কালীন রেসকোর্স ময়দানে লাখো জনতার উত্তাল সমুদ্রে বঙ্গবন্ধু বজ দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এই ঘোষণায় উদ্দীপ্ত, উজ্জীবিত জাতি স্বাধীনতার মূলমন্ত্র পাঠ করে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ছিনিয়ে আনে দেশের স্বাধীনতা। জাতির ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ পুরুষ বঙ্গবন্ধুর অমর কীর্তি এই স্বাধীন বাংলাদেশ। একাত্তরের আগুনঝরা মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস পাকিস্তানি জল্লাদ বাহিনী কারাবন্দি করে রেখেছিল বঙ্গবন্ধুকে। ফাঁসির আদেশ হয়েছিল, ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি বলেছিলেন, জীবনের বিনিময়ে হলেও আমি বাঙালির জাতির মুক্তি চাই। যার সুদীর্ঘ দিনের সংগ্রাম, নেতৃত্ব ও আত্মত্যাগের ফলে বাঙালি জাতি একটি নিজস্ব আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার সুযোগ পেয়েছে। যিনি যে দেশ ও দেশের মানুষের কথা এত ভেবেছেন, সেই দেশেরই কিছু নরপিশাচ তাকে বাঁচতে দিল না। নির্মমভাবে তাকে হত্যা করল।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মহামানব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর দেশে সামরিক শাসন জারি করা হয়। গণতন্ত্রকে হত্যা করে মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। শুরু হয় হত্যা ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি। বিশ্বে মানবাধিকার রক্ষার জন্য হত্যাকারীদের বিচারের বিধান রয়েছে কিন্তু বাংলাদেশে জাতির জনকের আত্মস্বীকৃত খুনিদের বিচারের হাত থেকে রেহাই দেওয়ার জন্য এক সামরিক অধ্যাদেশ জারি করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে আওয়ামী লীগ সরকার প্রতিষ্ঠার পর ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর সপ্তম জাতীয় সংসদে ইনডেমনিটি আইন বাতিল করেন। এটি শেখ মুজিবের হত্যাকারীদের বিচারের পথ প্রশস্ত করেছিল। দীর্ঘ ২১ বছর পরে আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারকার্য শুরু করে। দেশ ও বিদেশ থেকে অনেক বাধা-বিপত্তি আসা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত ধৈর্য ও দৃঢ়তার সঙ্গে মানবতাবিরোধী এবং বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচারকার্য সম্পূর্ণ করে চলেছেন। অনেকের বিচারকার্য সম্পূর্ণ হয়েছে এবং যারা এখনো বিভিন্ন দেশে পলাতক আছে তাদেরকেও দেশে আনার প্রক্রিয়া চলছে। খুব শিগিগরই তাদেরকেও বিচারের আওতায় আনা হবে।
তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে সর্বক্ষেত্রে ধাপে ধাপে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে আরো বেশি মর্যাদাশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে উন্নীত হয়েছে দেশ। বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েছে স্বাধীনতার আলো। স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে নানা দিক দিয়ে এখন বিশ্বের অনেক দেশেরই আজ ‘রোল মডেল’ বাংলাদেশ। সর্বশেষ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তরের যোগ্যতা অর্জন, বিশ্ব অর্থনীতিতে আরো বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে এ দেশের গৌরব।
বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘সোনার বাংলা গড়তে সোনার মানুষ চাই’। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের পূর্ণতা হোক আমাদের প্রজন্ম স্তরের সংগ্রাম রথে। বঙ্গবন্ধু আমাদের চিরন্তন সংগ্রামের অনুপ্রেরণার উত্স। তার চেতনা ও প্রেরণায় আমরা নির্মাণ করবই সোনার বাংলা। ঘাতকের বুলেট জাতির পিতার দেহ কেড়ে নিতে পারলেও আদর্শের মুজিব চিরঞ্জীব। ব্যক্তি মুজিবকে পরাজিত শক্তিধরেরা হত্যা করতে পারলেও আদর্শের মুজিবকে বাঙালির হূদয় থেকে মুছে ফেলতে পারেনি এবং পারবেও না। তাই তো বিশ্বজরিপে ও বিশ্বের সকল বাঙালির ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধুই নির্বাচিত হয়েছেন সর্বকালের সর্বশেষ্ঠ বাঙালি।
লেখক :গবেষক