বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে প্রথম কবিতা ও গানের ক্যাসেট

আমি ১৯৭৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়র সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হই। আবাসিক ছাত্র ছিলাম ফজলুল হক হলের। পরিচয় আগে হলেও ১৯৭৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনকালে লিয়াকত আলী লাকীর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়। আমরা দুজনই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলাম, ছাত্রলীগ করতাম। লাকী ভালো গান গাইত। তার কণ্ঠ ও গায়কি ছিল ভুপেন হাজারিকার মতো। অ্যাকর্ডিয়ান বাজিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে লাকী গান করত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের ‘সংস্কৃতি সংসদ’ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন ছিল। ছাত্রলীগের প্রকাশ্য কোনো সাংস্কৃতিক দল ছিল না। এই অবস্থায় আমি জাফর ওয়াজেদ, লাকীসহ কয়েকজন মিলে উদ্যোগ নিই। তার ফলে ‘সংস্কৃতি সভা’ নামে ছাত্রলীগের একটি সাংস্কৃতিক ফ্রন্ট গঠিত হয়। ছাত্রলীগের তত্কালীন প্রচার ও প্রকাশনা সমপাদক এবং বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সমপাদক প্রয়াত মুহিবুর রহমান বাবুলকে আহ্বায়ক এবং আমাকে ও জাফর ওয়াজেদকে যুগ্ম আহ্বায়ক করে ‘সংস্কৃতি সভা’ গঠন করা হয়। তখন অনেকেই সংস্কৃতি সভা সঙ্গে সংযুক্ত হন। সে সময় বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন ওবায়দুল কাদের, সাধারণ সম্পাদক বাহলুল মজনুন চুন্নু। আমাদের এই সাংস্কৃতিক দলে ছিল লিয়াকত আলী লাকী, আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর ছেলে সাজেদ আকবর ও মেয়ে শামা আকবর দুজনই রবীন্দ্র সংগীতশিল্পী, ছাত্রনেতা প্রয়াত মোহম্মদ হায়দার আলী, হাবিবুর রহমান (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার), রেহানা পারভীন (সংবাদ পাঠিকা) লিলি মালেক ও মায়া মালেক (আওয়ামী লীগ নেতা প্রয়াত আবদুল মালেক উকিলের মেয়ে), আব্দুল হক নুরু (মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের ভাই), নমিতা দত্ত (বর্তমানে কানাডা প্রবাসী), কিশো মান্নান (টাঙ্গাইলের আওয়ামী লীগ নেতা প্রয়াত আব্দুল মান্নানের মেয়ে), মুন্নি আহমেদ (আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদের মেয়ে), ইয়াসমিন আলী (লিয়াকত আলী লাকীর বোন), শহীদ হোসেন বকুল, নিরু শামসুন্নাহার (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা) ও তার বোন, ছাত্রলীগ নেত্রী জেসমিন খানম, রোকেয়া হলের ছাত্রলীগ নেত্রী নাহিদ আমিন খান (বর্তমানে প্রবাসী), জেসমিন, পারীন জামান কল্পনা (শিক্ষক নেতা ও আওয়ামী লীগ নেতা ও শিক্ষক নেতা প্রয়াত কামরুজ্জামানের মেয়ে)সহ কয়েক জন। আমরা সংস্কৃতি সভা থেকে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের অনেকগুলো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করেছি। বেশির ভাগ গ্রন্থণা ছিল আমার। সংগীত পরিচালনা করত লাকী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) তিনতলায় আমাদের রিহার্সেল হতো।

২.

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বহু গান হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের আগে, মুক্তিযুদ্ধকালে ও স্বাধীন বাংলাদেশে গীত অনেক কালজয়ী গান সম্পর্কে আমরা জানি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যার পর ঘাতক, যড়যন্ত্রকারী ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী শক্তি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে। বঙ্গবন্ধু তখন রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ নাম—সামরিক জান্তার ভয়ে কেউ কথা বলতে পারছে না। প্রতিবাদী কণ্ঠ রোধ করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও সরকারি মদতে সৃষ্টি করা হয়েছে ফ্যাসিবাদী ছাত্র সংগঠন। এ রকম প্রতিকূল সময়েও শুরু হয়েছে প্রতিবাদ। ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের একদল অকুতোভয় কর্মী গোপনে শুরু করেছে প্রতিবাদী কার্যক্রম। কবিতায়ও শুরু হয়েছে দ্রোহের উচ্চারণ। এ রকম একটি সময়ে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রতিবাদী কবিতা ও গানের ক্যাসেট প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

ভাবনাটা প্রথম আসে লাকীর মাথায়। লাকি আমাকে একটা স্ক্রিপ্ট লিখে দিতে বলে। ইতিমধ্যে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অনেক কবিতা লেখা হয়েছে। মাসিক সমকাল, সাপ্তাহিক মুক্তিবাণী, সচিত্র সন্ধানীসহ কয়েকটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা ছাত্র ইউনিয়নের জয়ধ্বনি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যতরুণ গোষ্ঠী প্রকাশিত এ লাশ আমরা রাখবে কোথায়, চট্টগ্রামের এপিটাফ গোষ্ঠীর ‘এপিটাফ’, নারায়ণগঞ্জের ড্যাফোডিল এফিউশন গ্রুপের ‘পৃথিবীর কাছে নোটিশ’ আরামবাগের খবর প্রকাশনী থেকে ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ‘মৃত্যঞ্জয়ী মুজিব’, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ‘মুজিব লোকান্তরে, মুজিব বাংলার ঘরে ঘরে’ ইত্যাদি কিছু প্রতিবাদী সংকলন বেরিয়েছে। চিলির মহান কবি পাবলো নেরুদার কবিতার অনুবাদও আমাদের হাতে এসে গেছে। আমি সেসব লেখা থেকে বাছাই করে একটা স্ক্রিপ্ট তৈরি করলাম। অনেকগুলো কবিতার গান করা হলো। অন্নদাশঙ্কর রায়ের বিখ্যাত কবিতা বঙ্গবন্ধুকেও গান করা হলো। সবগুলোর সুর করল লাকী। অন্তর্ভুক্ত হলো পুরনো কয়েকটা গানও—যেমন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা অংশুমান রায়ের গাওয়া, ‘শোনো একটি মুজিবরের থেকে। আমি একটা গান লিখলাম, ‘মুজিবর আছে বাংলার ঘরে ঘরে/বাঙালির অন্তরে’। সাজেদ আকবরের দরাজ কণ্ঠে লাকীর সুরে দারুণ হলো গানটি। লাকীও দুটো গান লিখল। আমার ধারণা আমার একটি ও লাকীর দুটি গানই ১৫ আগস্টের পর প্রথম লিখিত, গীত ও ক্যাসেটভুক্ত সংগীত।

এ ধরনের প্রতিবাদী ক্যাসেট এর আগে বের হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। পুরো আয়োজনের সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত ছিলাম লাকী, আমি ও সাজেদ আকবর। গানগুলো তৈরি করতে গিয়ে লাকী প্রচুর পরিশ্রম করেছে। মুজিব মানে মুক্তি গানটির অন্তরা লিখে দেওয়ার জন্য লাকী বাংলার বাণী অফিসে নির্মলেন্দু গুণের কাছে গিয়েছিল। গুণদার মুজিবসমগ্র গ্রন্থের ৬৫ থেকে ৬৭ পৃষ্ঠায় এ নিয়ে লিখেছেন। খবর পাঠিকা রেহানা পারভীন, লাকীর ভাই মোরাদ আলী এ ক্যাসেটে কণ্ঠ দিয়েছে।

রেকর্ডিং হয়েছে কাকরাইলের ‘ইপসা’ স্টুডিওতে। সাফাত আলী ছিলেন এর মালিক। প্রথমে তিনি এ নিয়ে একটু চিন্তিত ছিলেন তবে পরে কলাপসিবল গেট বন্ধ করে রেকর্ড করার সুযোগ দিয়েছেন। মোরাদ ভাই থাকতেন মগবাজার কাজী অফিসের গলিতে ভাড়া বাসায়। রেকর্ডিংয়ের আগে আমিও সে বাসায় রাত কাটিয়েছি। রিহার্সেল হয়েছে সেখানেও। তার বাসা থেকে ‘ইপসা’তে যাওয়ার পথে বর্তমান ইস্টার্ন হাউজিংয়ের উলটো দিকের রাস্তায়  আমি ছিনতাইকারীর কবলে পড়েছিলাম। এ এলাকায় তখন এত ভবন ছিল না। রাস্তা ছিল ভাঙাচোরা ও অন্ধকার। রিকশা থামিয়ে ও ছুরি, পিস্তল (সম্ভবত খেলনা ছিল) দেখিয়ে ছিনতাইকারীরা আমার ঘড়ি নিয়ে গিয়েছিল।

আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর এ ক্যাসেটটি পুনরায় বের করেছে কেউ কেউ। এতে কিছু ভুল ক্রটি রয়ে গেছে। একটি সংস্করণে এটি ১৯৭৯ সালে প্রকাশিত লেখা হয়েছে, যা যথার্থ নয়। ক্যাসেটটি প্রকাশ হয়েছে ১৯৮০ সালের মার্চের পর। ঐ সালে প্রকাশিত কবিতাও এতে অন্তর্ভুক্ত আছে। আজ যখন সে দিনগুলোর কথা ভাবি তখন আবেগাক্রান্ত হই। আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্র বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রথম প্রতিবাদী গান ও কবিতা ও গানের ক্যাসেট প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম এটি নিঃসন্দেহে আমার জীবনের বড় এক ঘটনা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে নিয়ে বাংলাদেশের শিল্প সাহিত্য ও সংগীত জগতের শ্রদ্ধার্ঘ্য হিসাবেও এর ঐতিহাসিক মূল্য অপরিসীম।

 

লেখক : কামাল চৌধুরী, কবি, প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্য সচিব, বর্তমানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির প্রধান সমন্বয়ক