দেশকে চিরকাল অন্ধকারে আটকাইয়া রাখা যায় না

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতিকে হাজার বত্সরের শৃঙ্খল হইতে মুক্ত করিতে কারাভোগ করিয়াছেন ৪ হাজার ৬৮২ দিন! কিন্তু তাহাকে কোনোভাবেই দাবাইয়া রাখা যায় নাই। এবং তাহার কারণেই বাঙালি জাতিকেও দাবাইয়া রাখিতে পারে নাই পাকিস্তানি শাসকরা। তিনি মাত্র ৫৫টি বত্সর পাইয়াছিলেন বাংলার দুঃখী ভুখা-নাঙ্গা মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। আক্ষরিক অর্থেই ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি শাসকরা পোড়ামাটি নীতির মাধ্যমে এই দেশটিকে প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস করিয়া দিয়াছিল। বঙ্গবন্ধু সেই ধ্বংসস্তূপের উপর দাঁড়াইয়া এই দেশটিকে নূতন করিয়া গড়িয়া তুলিতে হারকিউলিসের মতো অসম্ভব কাজে মনোযোগী হইয়াছিলেন।

কিন্তু কী দুর্ভাগ্য আমাদের! এমনই ক্ষণজন্মা বিরল মহামানব, যিনি আমাদের জাতির পিতা, তাহাকে স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বত্সরের মধ্যে দেশি-বিদেশি কুচক্রী ষড়যন্ত্রকারীরা প্রায় সপরিপারে রাতের আঁধারে হত্যা করে। নিঃসন্দেহে ইহা বিস্ময়কর যে, এমন সিংহহূদয় বিরলপ্রজ শ্রেষ্ঠ বাঙালিকে কী করিয়া হত্যার কথা চিন্তা করা যায়? তাহারই বৃত্তের ভিতরে বাড়িয়া উঠা কতিপয় কর্মকর্তা কী করিয়া বিপথগামী হইলেন? এই ক্ষেত্রে আমরা দৃষ্টিপাত করিতে পারি গত শতাব্দীর পঞ্চাশ, ষাট ও সত্তরের দশকে বিশ্বে দ্বিমেরুকরণের দিকে। সেই সময় তৈরি হয় বিপরীতমুখী দুই আদর্শ। একদিকে পুঁজিবাদ, অন্যদিকে সমাজতন্ত্র। এই দুই আদর্শের শীতল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটটি স্মরণে রাখা প্রয়োজন। আমরা দেখিতে পাই, সেই প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় ও জনদরদি অনেক নেতাই নিষ্ঠুর হত্যার শিকার হন। আব্রাহাম লিংকন, মহাত্মা গান্ধী, জন এফ কেনেডি, মার্টিন লুথার কিং, নক্রুমা, বেনবেল্লা, সুকর্নর মতো বিশ্ববরেণ্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হত্যাকাণ্ডের নির্মম শিকার হইয়াছেন। তবে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড যেন সকল প্রকার নৃশংসতা ও ট্রাজেডিকে হার মানাইয়া দিয়াছিল। এমনকি তাহাকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যার পর ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করিয়া রুদ্ধ করা হইয়াছিল বিচারের পথও। ইহার পর বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া কুত্সা ও অপপ্রচার চালানো হইয়াছে জাতির মহত্তম এই অবিসংবাদিত নেতার বিরুদ্ধে। ইতিহাস হইতে তাহার নাম মুছিয়া ফেলিতে সর্বশক্তি নিয়োগ করিয়াছিল অপশক্তি পক্ষ; কিন্তু আজ তাহা বুমেরাং হইয়াছে। যাহারা তাহার মতো মহত্তম মানবিক সত্তার মানুষকে নিচে নামাইতে চাহিয়াছিল তাহারাই আজ ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হইয়াছে। 

বঙ্গবন্ধুকে প্রায় সপরিবারে হত্যার ভিতর দিয়া নূতন করিয়া এক অন্ধকার সময়ের সূচনা ঘটানো হইয়াছিল। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়া ঘাতকরা দম্ভের সহিত ভাবিয়াছিল ইতিহাসের অদৃশ্য পাতা হইতেও মুছিয়া ফেলিতে পারিবে বঙ্গবন্ধুর অবদান; কিন্তু খুনিরা জানিত না—বঙ্গবন্ধু একজন ব্যক্তিমাত্র নহেন, তিনি এই রূপসী বাংলার আদর্শ ও স্বপ্নের প্রতীক। কখনোই হত্যা করা যায় না এই আদর্শকে। মানুষ কখনোই সম্পূর্ণভাবে সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে উঠিতে পারে না। বঙ্গবন্ধু নিজেরই তাহার আত্মসমালোচনা করিয়া ১৯৭৫ সালের ১৯ জুন বলিয়াছেন—‘আমি ফেরেশতা নই, শয়তানও নই—আমি মানুষ, আমি ভুল করবই।’ এই জন্যই তিনি রক্তমাংসের মহামানব! তিনি আমাদের আত্মপরিচয়ের জনক, তিনি আমাদের উপহার দিয়াছেন একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ‘পাসপোর্ট’। তিনি এক সার্থক মানুষ! বস্তুতপক্ষে, শেখ মুজিব এমনই এক মহাসিন্ধু, বাংলার আকাশ-বাতাস সর্বব্যাপী তাহার এমন বিস্তার যে, তাহাকে অধ্যয়ন অনুশীলনেও শেষ করা যাইবে না। আমৃত্যু তিনি যেই সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখিয়াছেন, তাহার মূল কথা হইল—বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো এবং দ্বিতীয়ত, স্বাধীন ও মর্যাদাবান জাতি হিসাবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করিয়া বাঁচা। বঙ্গবন্ধুর জন্যই বাংলাদেশ আজ একটি সমৃদ্ধ আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র। ভবিষ্যতে, আরো শত বত্সর পরও, এই স্বাধীন ভূখণ্ডকে যিনিই শাসন করুন, উন্নয়নের রূপকার হউন—ইহার বীজ রোপিত হইয়াছে স্বাধীনতার ভিতর দিয়াই। আর, সেই বীজের রোপণকারী হইলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সুতরাং তাহার এই অর্জন চিরকালই অন্য সকল কিছুর ঊর্ধ্বে উচ্চারিত হইবেই। তাহার মৃত্যুশোক আমাদের যেন শক্তি দেয় জাতি হিসাবে চির উন্নত শির থাকিতে।