জাতীয় শোক দিবস সারা দেশে পালিত হচ্ছে। এখন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করার সময়। ভাষা আন্দোলন থেকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে বঙ্গবন্ধুর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অখণ্ড জাতিসত্তার ভিত্তিতে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে।
আমরা জানি, পাকিস্তানের বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কারণে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে জাতিগত নিপীড়ন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চলতে থাকে। ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের গণপরিষদে শহিদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উপস্থাপন করেন। ১১ মার্চ ঢাকার রাজপথে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে যে গণমিছিল হয়েছিল, তার অগ্রভাগে ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। জেলের অভ্যন্তরে যেমনিভাবে তিনি অনশন পালন করেছিলেন, অন্যদিকে রাজপথের আন্দোলনেরও সমন্বয় সাধন করেন। ’৫৪ সালের হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে মুসলিম লীগের পরাজয় এবং যুক্তফ্রন্টের বিশাল বিজয়েও তিনি প্রধান সংগঠক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। আন্দোলন-সংগ্রাম ও জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সংগঠন অপরিহার্য। তিনি ১৯৪৮ সালে ছাত্রলীগ এবং ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫৫ সালে আওয়ামী লীগকে সার্বজনীন রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রেও তার বলিষ্ঠ ভূমিকা ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় আওয়ামী লীগ এই অঞ্চলে প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। স্বাধিকার আন্দোলন জোরদার করার জন্য ১৯৬৬ সালে লাহোরে রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের বৈঠকে তিনি ৬ দফা উত্থাপন করেন এবং এর ভিত্তিতে গণ-আন্দোলন গড়ে তোলেন। এই আন্দোলনে সর্বস্তরের জনগণই অংশগ্রহণ করে এবং ৭ জুন সফল হরতাল পালিত হয়। তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এ দেশের সব শ্রেণির জনগণের অধিকার ও মুক্তি সম্ভব। সেই লক্ষ্যে একদিকে যেমন তিনি স্বাধিকার আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন, পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সমর্থন, বিশেষ করে গণতান্ত্রিক ভারতের সমর্থন ও সহযোগিতার জন্য ’৬২ সাল থেকেই যোগাযোগ অব্যাহত রাখেন। বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। ’৬০ সালে পাকিস্তানে আইয়ুবের সামরিক শাসনের সময় অনেক রাজনৈতিক নেতার রাজনীতি থেকে দূরে রাখার জন্য শাস্তি বিধান করা হয়। এমনি এক পরিস্থিতিতে তত্কালীন মুসলিম লীগ নেতা সবুর খান সাজাপ্রাপ্ত হয়ে জেলখানায় বঙ্গবন্ধুর কক্ষে এসে বলেছিলেন, ‘মুজিব একটা কিছু করো, ওদের সাথে (পাকিস্তানিদের সাথে) আর থাকা যাবে না।’ এর থেকে প্রমাণিত হয় যে, তার বিরোধী পক্ষেরও ধারণা ছিল, শেখ মুজিবের পক্ষেই দৃঢ়তার সঙ্গে কোনো কিছু অর্জন করা সম্ভব। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তাকে পরিপূর্ণভাবে শেষ করে দেওয়ার জন্য আগরতলা মামলার মাধ্যমে সচেষ্ট হয়। কিন্তু ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে বঙ্গবন্ধু ও তার সহযোগীরা মুক্তি লাভ করেন। স্বাধিকারের পক্ষে জনগণের ম্যান্ডেট নেওয়ার জন্য তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ইয়াহিয়ার সামরিক শাসনের মধ্যেও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও ভিশন কতটা প্রখর ছিল তা বিভিন্ন সময়ে তার মন্তব্য থেকেই বোঝা যায়। ১৯৬৮ সালে আগরতলা মামলা চলাকালীন সাবেক ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী তার কক্ষে গেলে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘শওকত, কী ভাবছ?’ তিনি বললেন, ‘পাকিস্তানিরা আমাদের ফাঁসি দেবে।’ বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘জনগণ আমাদের মুক্ত করে নেবে, নির্বাচন হবে, যুদ্ধ হবে, বাংলাদেশ স্বাধীন হবে।’ প্রকৃতপক্ষে ঘটনা তা-ই ঘটেছিল। দূরদৃষ্টি ও পরিকল্পনা নিয়ে যে তিনি কাজ করতেন, এর থেকে তা-ই প্রমাণিত হয়।
’৭০ সালের নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন যে জনগণ স্বাধিকারের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তা প্রচারিত হয়। ১৯৭১-এর ১ মার্চ পার্লামেন্টের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করা হলে তিনি হোটেল পূর্বাণীতে সংবাদ সম্মেলন শেষ করে বেরিয়ে আসার সময় আমরা স্বাধীন বংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ বাইরে অবস্থান করছিলাম। তিনি এক আঙুল উঁচিয়ে দেখিয়ে দেন যে এখন এক দফার আন্দোলন তথা স্বাধীনতা সংগ্রামের পর্যায়ে দেশ চলে গেছে। ২ তারিখ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার নির্দেশেই স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করা হয়। ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ইশতেহারে তিনি উপস্থিত ছিলেন, যেখানে স্বাধীনতার মূলনীতি, জাতীয় সংগীত ঘোষণা করা হয়। ৭ মার্চ তিনি সুনির্দিষ্টভাবে বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করারও নির্দেশ দেন তিনি। ২৩ মার্চ বঙ্গবন্ধু ভবনসহ সারা বাংলাদেশেই বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। ২৫শে মার্চ গণহত্যা চালানো হলে ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং গ্রেফতার হন। আওয়ামী লীগ এবং যুব ও ছাত্র সমাজের নেতৃবৃন্দকে তার অবর্তমানে কী কী করণীয় সেই নির্দেশও দিয়ে যান। তার এই নির্দেশিত পথে সরকার গঠন ও যুদ্ধ পরিচালিত হয়। সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী এবং জাতীয় নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করে সরকার ও উপদেষ্টা পরিষদ গঠিত হয়। ৩০ মার্চ ইয়াহিয়া খান তার ভাষণে বলেছিলেন, মুজিবকে এবার শাস্তি পেতে হবে। তাকে মেরে ফেলার জন্য আগস্ট মাসে বিচারের নামে প্রহসন শুরু হয়। আন্তর্জাতিক চাপে তা সম্ভব হয়নি। বিশ্ববাসীর সমর্থন এবং ভারতের সর্বাত্মক সহযোগিতায় মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ মুক্ত করে। এখানে একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য, পাকিস্তান একাত্তরের বেদনা ভুলতে পারেনি। তাই পাকিস্তান ও তার গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI) প্রচার চালাচ্ছে যে শেখ মুজিব পাকিস্তানকে এক রাখতে চেয়েছিল, বাংলাদেশ চায়নি। উপরোক্ত আলোচনা থেকে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু ষাটের দশকের সূচনায় জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছিলেন। যুবনেতারা তার নির্দেশেই ’৬২ সালে স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াস গঠন করেন। তিনি স্বাধিকার আন্দোলন জোরদারের পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। আর সে কারণেই তাকে মেরে ফেলার জন্যই আগরতলা মামলা পরিচালনা করা হয়েছিল। জেলখানায় তিনি তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তেও লিখেছেন, ’৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে তিনটি রাষ্ট্র হওয়ার কথা ছিল এবং প্রতিটি রাষ্ট্রই অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক ধারায় পরিচালিত হবে—এই ছিল লক্ষ্য। ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে মুক্তিলাভের পর ৫ ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দী স্মরণসভায় তিনি ঘোষণা করেছিলেন, এই অঞ্চলের নাম হবে বাংলাদেশ। নির্বাচন এবং পরবর্তীকালে যুদ্ধেরও তিনি প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। যে কারণে নির্বাচনে জয়লাভের পাশাপাশি ভারতের সঙ্গেও যোগাযোগ রক্ষা করেছিলেন, যা বিভিন্ন তথ্য এবং পরবর্তীকালের ঘটনা প্রমাণ করে। তিনি ৭ই মার্চের ভাষণেও উল্লেখ করেছিলেন—‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে।’ যা গেরিলাযুদ্ধের প্রধান কৌশল। তার এই ভাষণ নির্যাতিত নিপীড়িত মুক্তিকামী মানুষের ভাষণ হিসেবে ইউনেস্কোর রেকর্ডভুক্ত হয়েছে। তিনি বিশ্বের একজন মহান নেতা। বিশ্বের মহান নেতা আব্রাহাম লিংকন, মহাত্মা গান্ধী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, নেলসন ম্যান্ডেলাসহ নেতৃবৃন্দ স্বাধীনতা, সমতা ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন, এর নেতৃত্ব দিয়েছেন।
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে জাতি-রাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তিতেই সংবিধান রচিত হয়েছে। তিনি দেশ ও জাতিকে সব বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন—দেশ যখন ঐক্যবদ্ধভাবে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু, বঙ্গমাতা ও অন্যদের হত্যা করা হয়। মোস্তাক-জিয়া দেশকে পাকিস্তানি ধারায় নিয়ে যায়। আন্দোলন-সংগ্রাম ও নির্বাচনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির সরকার পরিচালিত হচ্ছে। ১৫ই আগস্টের হত্যাকাণ্ড, জেলখানার হত্যাকাণ্ড, ২১শে আগস্টের হত্যাকাণ্ড ও ১৯৭১-এর গণহত্যার বিচারকাজ চলছে এবং রায়ও কার্যকর হচ্ছে। জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চলছে। স্বল্পোন্নত ও দরিদ্র দেশ থেকে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৪১ সালে উন্নত দেশে পরিণত হবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সময়ে পাকিস্তান বাংলাদেশ থেকে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে ৭০ শতাংশ বেশি অগ্রগামী ছিল। আজ বাংলাদেশ সব সূচকে পাকিস্তানকে অতিক্রম করেছে। বাংলাদেশের মাথাপিছু গড় আয় যেখানে ২ হাজার ২০০ ডলার, সেখানে পাকিস্তানের গড় আয় ১ হাজার ৪০০ ডলার। বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা পাকিস্তানের চেয়ে ৪৬ শতাংশ বেশি। আমরা আশা করি সব ষড়যন্ত্র-অপপ্রচার ও অপশক্তির মোকাবিলা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ উন্নত দেশে পরিণত হবে, সব জনগোষ্ঠীর সমস্যার সমাধান হবে এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে।
n লেখক : নেপালে নিযুক্ত সাবেক হাই কমিশনার