আমাদের এক আশ্রয়ের নাম ‘আইয়ুব বাচ্চু’

হাসান আবিদুর রেজা জুয়েল

আজ এদেশের রক লিজেন্ড আইয়ুব বাচ্চুর জন্মবার্ষিকী। রকগানকে সারাদেশে জনপ্রিয় করে তোলার পাশাপাশি অগণিত জনপ্রিয় গান বিশ্ববাঙালির অনুভবে লিখে গেছেন তিনি সুরে সুরে। এই মহীরূহ’র ভীষণ কাছের একজন হাসান আবিদুর রেজা জুয়েল। জন্মদিনে স্মৃতিগদ্যে জানালেন শ্রদ্ধার্ঘ্য—

আমি আমার গানের ক্যারিয়ারে সবসময়ই বলি, আমি খুবই সৌভাগ্যবান। আমার বাবা-মা যেমন ছিলেন সংগীতানুরাগী, ঠিক তেমনি মফস্বল থেকে ঢাকায় এসে আমার গানের বাবা হিসেবে যাকে পেয়েছিলাম, তার নাম আইয়ুব বাচ্চু। ১৯৮৬ সালের দিকে সোলসের একটি কনসার্টে প্রথম আইয়ুব বাচ্চুকে দেখি। কী দারুণ স্টাইলিস্ট একজন গিটারিস্ট। রকস্টার! সোলসের প্রধান শিল্পী তপন চৌধুরীর গানের মাঝে একটি বা দুটি গান গাইলেন বাচ্চু ভাই। সেই থেকেই মুগ্ধতার জন্ম। মনে মনে পণ করে ফেললাম, ঢাকায় গিয়ে গান করলে এই মানুষটির কাছেই যাবো। এরপর শিমুল মুস্তাফার মারফত যখন বেতার জগতের প্রযোজনায় আমার প্রথম গানের কাজ শুরু হলো তখনই প্রথম সাক্ষাত্ আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে। আমার অ্যালবামের মিউজিক অ্যারেঞ্জমেন্ট করবেন তিনি। বাচ্চু ভাই গিটার এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘গান শোনাও তো।’ আমি তো মফস্বলে ওস্তাদজির কাছে ক্লাসিক্যাল আর আধুনিক গান শিখে আসা ছাত্র। গিটার ধরা হয়নি।

তাকে বললাম, আমি তো গিটার বাজাতে পারি না। এরপর বাচ্চু ভাই গিটার ধরলেন আমি গাইলাম। সেই থেকে শুরু। কাজ করতে করতেই তিনি আমার ভয়েসকে মাথায় রেখেই সেমি-ক্লাসিক্যাল আর রকের মিশ্রণে দারুণ কিছু কাজ করলেন। এরপর তো কতশত কথা, স্মৃতি কত কত গল্প। কোনটা রেখে কোনটা বলি!

তবে যারা আইয়ুব বাচ্চুকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন তারা সবাই জানেন যে, আইয়ুব বাচ্চুর ভেতরে এক দারুণ শিশু বাস করতো। ভীষণ অভিমানী। এ নিয়ে সোলসের নাসিম ভাই খুব দারুণ একটা কথা বলেছিলেন।—বাচ্চু ভাই কারো ওপরে রাগ করে থাকলে তা তাকে বলে দিতেন। অর্থাত্ তার কোনোকিছু আড়াল ছিল না। কারো প্রতি রাগ হয়েছে সেটা অকপটে তাকে বলেছেন। কারো গান ভালো লেগেছে, সঙ্গে সঙ্গে ফোন করে অ্যাপ্রিশিয়েট করেছে।

আইয়ুব বাচ্চু আর আমার সম্পর্কটা এমন ছিল যে, আমি হয়তো ক্যাসেটের দোকানে দাঁড়িয়ে আছি। দোকানি এই বলে আমার অ্যালবামটি বিক্রি করছে—এই যে ভাই, নতুন এক সিঙ্গার এসেছে, আইয়ুব বাচ্চুর ছোট ভাই। খুব ভালো গায়। কিনে ঠকবেন না। সম্পর্কের নিবিড় এই অনুভবগুলো আমরা দু’জনই জানতাম। তাই তার পরিবারের একজনই হয়ে ছিলাম। এখনো আছি। একজন আইয়ুব বাচ্চু ও সংগীত প্রতিভা নিয়ে আমার বলার ধৃষ্টতা নেই। বরং আমি তার কিছু ব্যক্তিগত আলাপের গল্প বলি। স্মৃতির কথা বলি।

বাচ্চু ভাই প্রচণ্ড বেহিসেবী ছিলেন। এটাও তার শিল্পীবাউল মনের সহজাত স্বভাব। একটা গল্প বলি—

আমি ততদিনে ঢাকায় গানের পাশাপাশি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টে এদেশে বেশ নামডাক করে ফেলেছি। আয় উপার্জনের সেটিই তখন এক বড় মাধ্যম আমার। একবার লন্ডনে একটি শো অ্যারেঞ্জ করেছি। পারফর্মার এলআরবি, আমিসহ লোকাল ক’জন শিল্পী। বাচ্চু ভাই টিমসহ হোটেলে উঠেছেন। এখন এলআরবি ম্যানেজার শামীম ভাই বলছেন, বাচ্চু ভাইয়ের পেমেন্টটা দেশে ফেরার আগে না দিলেই ভালো হয়। কারণ হাতে পেলেই উনি গিটার কিনে ফেলবেন। এমনিতেই ঢাকার স্টুডিওতে গিটার রাখার জায়গা নেই আর!

আমিও জানতাম তার এই স্বভাব। তাই আমরা ঠিক করলাম সেটিই করবো। বাচ্চু ভাইকে হোটেলে বসিয়ে বললাম, বাচ্চু ভাই আপনি রেস্ট নেন। সরাসরি এখান থেকে সাউন্ড চেকে যাবেন। আমি আপনাকে নিতে আসবো।

আমি যথারীতি শিল্পী প্লাস কামলা। তাই চলে গেলাম সাউন্ড ঠিক করতে। হোটেলে এসে বাচ্চু ভাইকে নিতে আসার সময় দেখি তিনি রুমে নেই!  কোনো এক ভক্ত বাঙালি ভাইকে নিয়ে বেরিয়ে গেছেন। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর যা ভেবেছিলাম তাই। তিনি সবুজ রঙের একটি গিটার কিনে ঢুকলেন। সাথের ভদ্রলোক বললেন, জুয়েল ভাই, বস তো আমার ক্রেডিট কার্ড থেকে গিটার কিনেছেন। ঐ টাকা ক্যাশে আমাকে দিয়ে দিলেই হবে! তো এমনই ছিলেন আমার গানের বাবা, আমাদের রক লিজেন্ড আইয়ুব বাচ্চু। খুব কাছের মানুষদের সঙ্গেই তার অভিমান হয়েছে। দূরত্ব বেড়েছে। কিন্তু সেই রাগ-অভিমান খুব বেশিদিন টেকেনি। আবার কাছে নিয়ে আগলে ধরেছেন। এমন আপাদমস্তক গানের মানুষ আমরা আর পাবো না। ‘পাবো না’ শব্দটা এ কারণেই বলছি। কারণ গানের প্রতি সমর্পিত হওয়া খুব কঠিন। সাধক সংগীতজ্ঞরাই এটা পারেন। আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন তেমনই একটি নাম।

তার অগণিত গান গত ৩ প্রজন্ম গেয়ে, শুনে, ধারণ করে বড় হয়েছে। ঠিক একইভাবে সামনের অনেক অদেখা কয়েক প্রজন্ম তার গানকে ভালোবেসে, গেয়ে, শুনে, লালন করে সুখে দুখে বাঁচিয়ে রাখবে। আর তো তাকে মেসেজ দিয়ে বা ফোন করে বা এবি কিচেনে গিয়ে জন্মদিনের উইশ দিতে পারবো না। তাই এভাবে আজ ইত্তেফাকে লিখে জানিয়ে দিলাম শুভ জন্মদিন আইয়ুব বাচ্চু। আপনার সুরগুলো আমার ভেতরে বোপন করেছিলেন বলেই এই হাসান আবিদুর রেজা জুয়েলকে এখনো দু-চারজন মানুষ ভালোবাসে, শোনে, সমীহ করে। আপনি তেমনই এক আশ্রয়ের নাম আমার কাছে।

লেখক : প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী, সংগঠক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব