নেফ্রোটিক সিনড্রোম বাচ্চাদের পরিচিত কিডনি রোগ

 

একদিন সকালে হঠাত্ ঘুম থেকে উঠার পর আপনার সোনামণির চোখমুখ ফোলা ফোলা মনে হলো। আপনি ভাবলেন ওর হয়তো ঘুম বেশি হয়েছে। দিন কয়েকের মধ্যে তা ক্রমাগত বেড়ে যেতে লাগল। আপনার মনে হলো ওর কোনো এলার্জি হলো, চোখের কোনো সমস্যা হলো। এদিকে একদিন খেয়াল করলেন ও তো সারাদিনে মাত্র দু-এক বার প্রস্রাব করছে, পরিমাণেও অনেক কম। পা এবং পেটটাও ফোলা মনে হচ্ছে। এবার আপনি চিন্তিত হয়ে পড়লেন এবং দ্রুত আপনার শিশুর ডাক্তারের শরণাপন্ন হলেন। তিনি দ্রুত কিছু প্রস্রাব ও রক্তের পরীক্ষা করে জানালেন, আপনার শিশুর কিডনিজনিত অসুখ হয়েছে, যার নাম ‘নেফ্রোটিক সিনড্রোম’।

চিকিত্সা শুরু, পর্যবেক্ষণ করা, প্রতিদিন তার প্রস্রাব বেড সাইডে পরীক্ষা করা, প্রস্রাবের পরিমাণ অনুযায়ী তরল খাবারের পরিমাণ নির্ধারণ করা এবং প্রথম অবস্থায় মা’কে চিকিত্সা পদ্ধতি সম্পর্কে জানানোর জন্য হাসপাতালে ভর্তি হতে বললেন। এতো ছোট শিশুর কিডনির অসুখ! কিডনি কি নষ্ট হয়ে যাবে! দুটো কিডনিই কি আক্রান্ত হয়েছে! এর চিকিত্সাই বা কী? এমন নানা প্রশ্ন অভিভাবকদের। শিশুদের নেফ্রোটিক সিনড্রোম নিয়ে কথা বলছি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এটা সাধারণত দুই থেকে ছয়-আট বছরের শিশুদের হয়। ছেলে শিশুদের তুলনামূলকভাবে কিছুটা বেশি হয়। প্রাইমারি নেফ্রোটিক সিনড্রোমের সরাসরি কোনো কারণ জানা না গেলেও এর নানাবিধ তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা আছে। যে কারণেই হোক কিডনির ছাঁকনি সাময়িকভাবে শরীরের আমিষ জাতীয় পদার্থ বা অ্যালবুমিন ধরে রাখতে পারে না এবং প্রস্রাবের সঙ্গে তা বের হয়ে যাওয়ার কারণে রক্তনালিতে অ্যালবুমিনের ঘাটতি দেখা দেয়।

উপসর্গ : শরীরের বিভিন্ন অংশ যেমন চোখ, মুখ, পা ফুলে যাওয়া; প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া; পেটে ব্যথা এবং এই সময়ে যেহেতু রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় সেজন্য প্রস্রাবের সংক্রমণ, নিউমোনিয়াও সঙ্গে থাকতে পারে।

চিকিত্সা :স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধের মাধ্যমেই এর মূল চিকিত্সা শুরু হয়। পাশাপাশি অন্যান্য জটিলতা বা ইনফেকশনের চিকিত্সা। চিকিত্সা প্রাথমিকভাবে দীর্ঘমেয়াদি। ছয় সপ্তাহ ছয় সপ্তাহ করে ১২ সপ্তাহ চলবে। স্টেরয়েড বা প্রেডনিসোলনকে এ অসুখের লাইফ লাইন ধরা হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ওষুধ শুরু করার ১৪ দিনের মধ্যে প্রস্রাবে প্রোটিন যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। যদি ৩০ দিনের মধ্যে প্রোটিন যাওয়া বন্ধ না হয়, সে ক্ষেত্রে এটাকে খারাপ ধরনের নেফ্রোটিক সিনড্রোম বলা হয়। সে ক্ষেত্রে কিডনি বায়োপসিসহ অন্যান্য পরীক্ষার দরকার হয় এবং স্টেরয়েডের পাশাপাশি অন্য ওষুধেরও দরকার হয়। নেফ্রোটিক সিনড্রোম চিকিত্সা নিলে বেশির ভাগ (শতকরা ৯০ ভাগ) ক্ষেত্রেই ভালো হয় এবং সুখবর হলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কিডনি ফাংশনের কোনো ক্ষতি হয় না। তবে, এর খারাপ দিক হলো শতকরা ৬০-৮০ ভাগ ক্ষেত্রে অসুখটা বারবার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যেহেতু স্টেরয়েডের মাধ্যমে চিকিত্সা হয়, এর বেশ কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে; যেমন গাল, পেট ফুলে যাওয়া যা পানির কারণে নয়, খাওয়ার আগ্রহ বেড়ে যাওয়া, এসিডিটি হওয়া, শিশুর আচরণগত পরিবর্তন, কিছু ক্ষেত্রে রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া।

শিশুর যত্ন ও খাবার :এই সময়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। শিশুকে নিরাপদে ঘরে রাখতে হবে। অসুস্থ সংস্পর্শ বিশেষ করে হাম, চিকেনপক্স এসব রোগী থেকে দূরে রাখতে হবে। আমিষযুক্ত খাবার বেশি খেতে হবে, যেমন ডিমের সাদা অংশ। ডিমের হলুদ অংশসহ অতিরিক্ত তৈলাক্ত খাবার খাবে না। অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবার এবং আলাদা লবণ খাবে না। শিশুর প্রস্রাব কম হলে পানি বা তরল খাবার বেশি খাবে। অবশ্যই প্রস্রাবের অ্যালবুমিন টেস্ট করতে হবে। সুস্থ অবস্থায়ও সপ্তাহে কমপক্ষে তিন দিন টেস্ট করতে হবে। পরপর তিন দিন অ্যালবুমিনের মাত্রা ২+ বা তার বেশি থাকলে ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে। এসব শিশু রোগীর জ্বর, ঠান্ডা, কাশি অনেক সময়ে মারাত্মক পর্যায়ে যেতে পারে। তখন দেরি না করে যথাযথ চিকিত্সা নিতে হবে। এদের বিশেষ কিছু টিকা নেওয়াও জরুরি। ডাক্তারের পরামর্শ মোতাবেক সুস্থ অবস্থায় এসব টিকা নিতে হবে। টিকা নেওয়ার আগে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

 

সিনিয়র কনসালট্যান্ট-পেডিয়াট্রিক অ্যান্ড নিওনেটোলজি, এভারকেয়ার হসপিটাল ঢাকা।