আইপিসিসির
প্রতিবেদন
তালেব রানা
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে এখন চরম তাপপ্রবাহ, প্রচণ্ড ভারী বৃষ্টিপাত, খরা, সাইক্লোন এবং দাবানল হতে দেখা যাচ্ছে। আর এই জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য মানুষের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডই দায়ী। সম্প্রতি জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আন্তঃসরকার কমিটি বা আইপিসিসির প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, মানুষের কর্মকাণ্ড বিপজ্জনক পরিণতি ডেকে আনছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এসব দুর্যোগ বারবার দেখা দেওয়ার মাধ্যমে জলবায়ুর পরিবর্তন স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। তারা বলছেন, শিল্পযুগের আগে পৃথিবীপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা যা ছিল, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে সেই তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পাবে। এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য এর আগে যতটা সময় লাগবে বলে ধারণা করা হয়েছিল, এখন বলা হচ্ছে তার ১০ বছর আগেই সেটা ঘটে যাবে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এর ফলে সারা বিশ্বে চরম আবহাওয়া পরিস্থিতি তৈরি হবে।
আইপিসিসির রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০১১ থেকে ২০২০ এই এক দশক সময়কালে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ১৮৫০-১৯০০ এই সময়কালের চেয়ে ১ দশমিক ৯ ডিগ্রি বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৮৫০ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত থাকা রেকর্ড অনুযায়ী গত পাঁচ বছর ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে উষ্ণতম। ১৯০১-১৯৭১ এই সময়কালের সঙ্গে তুলনায় সমুদ্রের পানির স্তরের উচ্চতা বৃদ্ধির সাম্প্রতিক হার প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। ১৯৯০-এর দশক থেকে এ পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী হিমবাহগুলো গলে যাওয়া এবং আর্কটিকে সামুদ্রিক বরফস্তর কমে যাওয়া—এ দুটির পেছনে মানুষের কর্মকাণ্ডই যে দায়ী, এমন সম্ভাবনা খুবই জোরালো (৯০ শতাংশ)। এটা এখন প্রায় নিশ্চিত যে, ১৯৫০-এর দশকের পর থেকে অতিরিক্ত গরম পড়া এবং তাপপ্রবাহ অনেক বেশি ঘন ঘন ঘটছে। অন্যদিকে ঠান্ডা পড়ার তীব্রতা কমে যাচ্ছে এবং তা ততটা ঘন ঘন হচ্ছে না। রিপোর্টে জাতিসংঘের বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষের কর্মকাণ্ড পরিবেশের ওপর যে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে তা মানবসমাজের জন্য একটি ‘লাল সংকেত’।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এ শতাব্দীর শেষ নাগাদ সমুদ্রের পানির স্তরের উচ্চতা বৃদ্ধির পরিমাণ দুই মিটারের কাছাকাছি চলে যাওয়ার সম্ভাবনা এখন আর উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে রিপোর্টে এ কথাও বলা হয়েছে যে, কার্বন ডাইঅক্সাইড ও মিথেনের মতো গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন বড় আকারে কমাতে পারলে তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে হয়তো স্থিতিশীল অবস্থায় আনা যাবে।
আইপিসিসি ১৯৮৮ সালে গঠিত হয়। মূলত বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনকে ঘিরে বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা ও সরকারগুলোকে বৈজ্ঞানিক তথ্য সরবরাহ করাই সংস্থাটির লক্ষ্য। তাদের বিজ্ঞানীদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্টোনিও গুতেরেস বলেছেন, দেরি করার মতো সময় নেই, কোনো অজুহাতেরও সুযোগ নেই। মার্কিন প্রেসিডেন্টের জলবায়ুসম্পর্কিত বিশেষ দূত জন কেরি বলেছেন, এখন বিশ্বের জন্য প্রকৃত ও জোরালো পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এসে গেছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, আইপিসিসির প্রতিবেদন মানবজাতির জলবায়ু অপরাধের একটি দলিল, একটি প্রমাণ। প্রতিবেদনে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়েছে যে, জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকাতে পদক্ষেপ নেওয়ার সময় প্রায় শেষ। কিন্তু এখনো পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। এটা সত্যি যে, আমরা একটি গর্তে আছি। এখন সর্ব প্রথম আমাদেরকে এই গর্ত খোড়া বন্ধ করতে হবে। তাপমাত্রা শিল্পযুগের চেয়ে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি যাতে না বাড়ে সেজন্য আমাদেরকে কার্বন নিঃসরণ ২০৩০ সালের মধ্যে কমপক্ষে ৪৫ শতাংশ কমাতে হবে। আর ২০৫০ সালের মধ্যে শূন্যতে আনতে হবে। যদিও এটি খুবই কঠিন।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক টিম পালমারের মতে, ভবিষ্যত্ খুবই খারাপ। কার্বন নিঃসরণ বন্ধে এখনই পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে জলবায়ু এক ধরনের নারকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে।