আফগানিস্তানে যুদ্ধ চলিতেছে ৪০ বত্সর ধরিয়া। বেশির ভাগ আফগানই মনে করিতে পারে না, তাহাদের দেশে শেষ কবে শান্তিপূর্ণ অবস্থা বিরাজিত ছিল। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকার টুইন টাওয়ারে ভয়াবহ বিমান হামলার পর আফগানিস্তানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্র জোট গত ২০ বত্সর ধরিয়া যুদ্ধ করিতেছে। ‘অনেক হইয়াছে’ মনে করিয়া অবশেষে আগামী ১১ সেপ্টেম্বরে মধ্যে তাহার সকল সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয় আমেরিকা। তবে ১১ সেপ্টেম্বর অবধি অপেক্ষা করিতে হয় নাই, আফগানিস্তানের তালেবানরা গত কয়েক সপ্তাহে ঝড়ের গতিতে একের পর এক প্রদেশ দখল করিয়াছে। সর্বশেষ গতকাল বিকালে তালেবান যোদ্ধারা খুব সহজেই কাবুল দখল করিয়া ফেলিয়াছে। গতকাল সকাল হইতেই তালেবানের অগ্রযাত্রা এবং রাজধানীর প্রবেশদ্বারে তাহাদের অবস্থান নেওয়ার খবর ছড়াইয়া পড়িতেই শহরের অনেক বাসিন্দাই কাবুল ছাড়িয়া পালাইতে শুরু করিয়াছে। রাস্তায় গাড়ির এবং ব্যাংকগুলিতে মানুষের লম্বা লাইন। শহর হইতে বাহির হইবার একমাত্র পথ এখন কাবুল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। বিবিসি সংবাদ চ্যানেলে দেখা গিয়াছে, কিছু কিছু মানুষ তাহাদের গাড়ির মধ্যে চাবি রাখিয়াই গাড়ি হইতে নামিয়া হাঁটিয়া বিমানবন্দরের দিকে যাইতেছেন।
কিন্তু কেন গত ৪০ বত্সর ধরিয়া এমন উত্তাল সময় বহিয়া চলিতেছে আফগানিস্তান জুড়িয়া? যদিও ইহার আগেও আফগানিস্তানের সময় ভালো যাইতেছিল না। দেশটিতে বিদেশি রাষ্ট্রের আগ্রাসন বহুদিন ধরিয়াই ছিল। ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত সৈন্য প্রত্যাহারের পর সেইখানে শুরু হয় দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ। সেই যুদ্ধের মধ্য দিয়াই উত্থান ঘটে তালেবানের। তালেবান আফগানিস্তানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই এবং নিরাপত্তা ফিরাইয়া আনিবার প্রতিশ্রুতি দিয়াছিল। একই সঙ্গে তাহারা আফগানিস্তানে কঠোর ইসলামি অনুশাসনও চালু করিয়াছিল। এইভাবে ১৯৯৮ সাল নাগাদ তালেবান আফগানিস্তানের প্রায় পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করিতে শুরু করে। এই সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ পছন্দ হয় নাই তালেবানের। তাহার পর ঘটে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের ভয়াবহ ঘটনা। বলা যায় এই একটি ঘটনার ভিতর দিয়া সারা বিশ্বরাজনীতিতে অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ পরিবর্তন আসে। আমেরিকা সরাসরি আক্রমণ চালায় তালেবানদের উত্খাত করিতে। ২০০১ সালের পর হইতে এখন অবধি নেটোর নেতৃত্বাধীন জোটের সাড়ে তিন হাজারের বেশি সৈন্য নিহত হইয়াছে। ইহার মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশই মার্কিন সেনা। ইহা ছাড়াও ২০ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা এই যুদ্ধে আহত হইয়াছেন। অন্যদিকে এই সময়ে আফগানিস্তানের যে পরিমাণ মানুষ উদ্বাস্তু হইয়াছে, তাহা বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ। কেবল ২০১২ সাল হইতেই এখন অবধি প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষ বাড়িঘর ছাড়িয়া পালাইয়াছেন। অন্যদিকে যুদ্ধ, সামরিক সহায়তা, পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন—সকল মিলাইয়া যুক্তরাষ্ট্র ২০২০ সাল পর্যন্ত খরচ করিয়াছে ৯৭৮ বিলিয়ন ডলার! জো বাইডেন হইতেছেন চতুর্থ মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যাহাকে আফগানিস্তানে যুদ্ধ চালাইয়া যাইতে হইয়াছে। ইহা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরিয়া চলা যুদ্ধও বটে। ন্যাটো সৈন্য ছাড়াও আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর ৬৯ হাজার সৈন্য এই যুদ্ধে নিহত হইয়াছেন। অন্যদিকে আফগান বেসামরিক মানুষ মারা গিয়াছে ৫১ হাজার। মারা গিয়াছে বিপুলসংখ্যক তালেবানও। এই যুদ্ধে কেবল হাজার হাজার কোটি ডলারই খরচ নহে, ইহার মধ্য দিয়া যেই পরিমাণ সৈন্যক্ষয় ও বিভীষিকাময় স্মৃতি তৈরি হইয়াছে, তাহার মূল্যও অনেক।
কী অদ্ভুত ব্যাপার—যেই তালেবানকে ২০০১ সালে যুদ্ধের মাধ্যমে আফগানিস্তানের ক্ষমতা হইতে সরানো হইয়াছিল, যাহাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ২০ বত্সর ধরিয়া যুদ্ধ চলিয়াছে, সেই তালেবানের সহিতই যুক্তরাষ্ট্র আবার সন্ধি করিতে চেষ্টা করিয়াছে। তবে পরিস্থিতি ক্রমশ যেইদিকে চলিয়া যাইতেছে, তাহার প্রভাব এই উপমহাদেশে ভীষণভাবে পড়িবে বলিয়াই মনে করিতেছেন বিশ্লেষকরা। প্রশ্ন হইল—এত বত্সর ধরিয়া এই যে এত রক্তক্ষয়—ইহার শেষ কোথায়? কেহ কি জানেন ইহার উত্তর?