সরকারি আবাসনে নতুন দিগন্ত

বিশাল খেলার মাঠ। একটি বা দুটি নয়, একাধিক। সবগুলো মাঠে ঘাস, যেন পরম মমতা নিয়ে হাজারো শ্রমিক তাতে মাখিয়ে দিয়েছেন গাঢ় সবুজ রং। চারদিকে একই মাপের হাজারো গাছ। যেন ধাপে ধাপে দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রশিক্ষিত সৈনিক। মোড়ে মোড়ে পাতাবাহার, ফুল আর ঔষধি গাছ। একটি বা দুটি নয়, পরপর সুন্দর করে সাজানো ১৭টি দৃষ্টিনন্দন ভবন। ভবনগুলো যেন ছুঁয়েছে আকাশ। ছুঁবেই তো, কারণ ২০ তলা ভবন তো আকাশের কাছাকাছিই থাকা, যারা থাকবেন তাদের জন্য অন্য রকম এক অনুভূতি।

একেকটি ভবন থেকে অন্যটির দূরত্বও বেশ। দুটি ভবনের মধ্যে যে রাস্তা তাও বিশাল। মূল রাস্তাগুলো যেন মহাসড়ক। আর পুরো এলাকা জুড়ে রয়েছে আধুনিক ফুটপাত। তাও চড়া বেশ। প্রতিটি ভবনের সামনে আগুন নেভানোর জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা। রয়েছে লেক, আধুনিক পুকুর। যেখানে পানির সঙ্গে খেলা করে কাঁঠাল চাপা ফুল। আর পাতাবাহারি গাছগুলো যেন তৈরি করেছে দৃষ্টিনন্দন এক দেওয়াল।

পুরো এলাকাটির আয়তন প্রায় ১৪ একর। এর বাইরে রয়েছে কমন ফ্যাসিলিটিজ ভবন। বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য আলাদা আধুনিক ব্যবস্থা। ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া বা উন্নত বিশ্বের চিত্র নয় এটি। বলছি ঢাকার আজিমপুরে নবনির্মিত সরকারি কলোনির কথা। কেনই বা আধুনিক হবে না? সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বহুতল আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পটি হচ্ছে খরচ ও আয়তন বিবেচনায় সবচেয়ে বড় প্রকল্প। এ প্রকল্পের আওতায় ৯৯০ কোটি ৩০ লাখ ১৯ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ১৭টি ভবনে ফ্ল্যাট আছে ১ হাজার ২৯২টি। আধুনিক সবকিছুই আছে এই ফ্ল্যাটে। ১ হাজার এবং ৮০০ বর্গফুট আয়তনের এসব ফ্ল্যাটে রয়েছে সুপরিসর কমন স্পেসসহ একাধিক লিফট। গত ৩ আগস্ট গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের গণপূর্ত অধিদপ্তর ও জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের নির্মিত আজিমপুরের এই প্রকল্পসহ মোট ২ হাজার ৪৭৪টি ফ্ল্যাটের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনসংকট নতুন নয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনেক বছর আগেই বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে সরকারি আবাসন ৪০ শতাংশে উন্নীত করার অনুশাসন দিয়েছিলেন। তিনি যখন এই অনুশাসন দেন তখন সরকারি আবাসন ছিল ৮ শতাংশ। এখন ২৪ শতাংশ।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পাওয়ার পরই মূলত শুরু হয় বিশাল কর্মযজ্ঞ। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও এর অধীন বিভিন্ন দপ্তর/সংস্থা একাধিক প্রকল্পের মাধ্যমে বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করে। আজিমপুর ছাড়াও মতিঝিল ও মালিবাগ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য তেজগাঁওয়ে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য মিরপুরে আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। যার সবগুলোতেই রয়েছে আজিমপুর কলোনির ভবনগুলোর মতোই সুযোগ-সুবিধা। বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়, মিরপুর-৬ নম্বর সেকশনে গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বসবাসের জন্য যে ২৮৮টি ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হয়েছে সেখানে ব্যয় হয়েছে ১৩১ কোটি ৪০ লাখ টাকা।  মালিবাগে ৪৫৬টি ফ্ল্যাট নির্মাণে সরকারের ব্যয় ২১২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বসবাসের জন্য ৫৮টি ফ্ল্যাট নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৪৪ কোটি ৭২ লাখ ৭০ হাজার টাকা। এরমধ্যে বেশ কয়েকটি প্রকল্পে রয়েছে তিনতলাবিশিষ্ট মসজিদ, কমিউনিটি সেন্টার। এখানেই শেষ নয়, একটি প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে গাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার আধুনিক প্রযুক্তি। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, সরকারি আবাসন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে নির্মিত এসব ভবনে ব্যবহার করা হয়েছে অত্যাধুনিক নির্মাণসামগ্রী, উন্নত ফিটিংস ও আধুনিক প্রযুক্তি। প্রতিটি ভবনের ভেতরে-বাইরে রয়েছে নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, জরুরি ফায়ার এক্সিট, সুপরিসর বারান্দা ও কমন স্পেস।

সরকারের এমন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে ধরার কারণ স্রেফ সরকারের গুণগান করা জন্য নয়। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে আরো বেশি সেবা আশা করার জন্যই এই প্রসঙ্গের অবতারণা। সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করার কারণ একটাই—সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জনগণকে সেবা দিয়ে তুষ্ট করবেন। তাদের প্রত্যাশা পূরণ করবেন। যদিও হাজার হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন যারা নানা সুযোগ-সুবিধা না পাওয়ার পরেও অর্থাত্ যতটুকু পাওয়ার কথা ততটুকু না পাওয়ার পরেও সর্বোচ্চ সেবাটুকু দেন। যেমন—সাংবাদিক হিসেবে আমি নিজেই কর্মচারীদের বিভিন্ন সংগঠনের সংবাদ কাভার করেছি। তাদের দাবিও যৌক্তিক। জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই পদে চাকরি করে অবসরে যাওয়া কর্মচারীর সংখ্যা কিন্তু অনেক। তারপরেও নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও অনেকেই আছেন যারা কখনো কাজ বন্ধ করেন না; কিন্তু নানা ফন্দিফিকির করে জনগণকে ভোগান্তিতে ফেলে সরকারকে বিব্রত করা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের খবর শুধু সাংবাদিকরাই নন, সরকার নিজেও কখনো কখনো গণমাধ্যমে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে অভিযু্ক্তদের শাস্তির কথা প্রচার করেন। এর মানে হচ্ছে—শতভাগ স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়নি। আমার প্রশ্ন ৫০ শতাংশ কি হয়েছে? ৩০ শতাংশ? একেক জনের বিশ্লেষণ একেক রকম হবে এটাই স্বাভাবিক। সরকারি লোকদের জীবনমান উন্নয়নে জনগণের সমর্থন সবচেয়ে বেশি। কারণ হাজার হাজার কোটি টাকা প্রকল্পে জনগণ কখনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বরং কখনো কখনো দেখা যায় অতিরিক্ত ব্যয়, প্রাক্কলন ব্যয়, তহবিলের নয়ছয় করার কারণে দুর্নীতি এত ভয়াবহ হয়ে ওঠে ঐ প্রকল্পের জন্য সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই বিষফোড়া হয়ে দাঁড়ায়। এতে বিব্রত হয় সরকার।

কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যদি দেশের জন্য সত্যিকার অর্থেই কাজ করেন তখন তারা আর কর্মকর্তা কিংবা সরকারি কর্মচারী থাকেন না, তারা হয়ে ওঠেন দেশপ্রেমী। দেশের উন্নয়নে, সরকারের চূড়ান্ত লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকারি জনবলের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। অর্থাত্ জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা যেখানে সরকারের লক্ষ্য তা বাস্তবায়ন শতভাগ সম্ভব হয়ে ওঠে তখনই যখন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সবচেয়ে বেশি দেশপ্রেমিক হয়ে ওঠেন। আর এ জন্যই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সুযোগ-সুবিধা যখন বাড়ানো হয় তখন কারো আপত্তি থাকে না।

জনগণ চায় তার ন্যায্য অধিকারটুকু বুঝে পাক। জনগণ চায় সেবা। উদাহরণ দিয়ে বলা যেতে পারে—জমি ক্রয়ের পর নামজারির বিষয়টা এত জটিল হবে কেন? কিংবা স্ট্রেচারে করে সরকারি হাসপাতালে আসা রোগীকে বিছানা খালি থাকার পরেও কেন দৌড়াতে হবে? একবার কি ভেবেছি আমরা, কেন নিয়মিত শ্রেণিকার্যক্রমে উপস্থিত থাকার পরেও স্কুল-কলেজের টিউশন ফির কয়েক গুণ বেশি দিয়ে প্রতিদিন কোচিং কিংবা বাসায় প্রাইভেট টিউটরের কাছে পড়তে হয়? এই ক্ষেত্রে কেন দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী বা সরকারি স্কুলের শিক্ষক দেশপ্রেমিক হবেন না।

জেলে, কৃষক, ডিগ্রিধারী বেকার, হাজার হাজার রোগী, বৃদ্ধ, বিধবা, পঙ্গু, প্রতিবন্ধী, গরিব শিক্ষার্থীসহ আরো নানা বঞ্চিত খাত থাকার পরেও চোখে লাগার মতো হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক থাকার জায়গা কেন করে? আমার কাছে মনে হয়—সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পূর্ণ মমতা নিয়ে কাজ করবেন বলেই তাদের সুখে আর শান্তিতে রাখতে চায় সরকার। সেবার জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেবেন—এমন প্রত্যাশা থেকেই তাদের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। আর জনগণ তাতে সমর্থন দেওয়ার কারণ হচ্ছে দেশ মাটি ও মানুষের প্রতি শ্রেষ্ঠ অবদানটা রাখবেন এমনটা ভেবে।

যে দেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সেবায় সেরা হতে চায়, সে দেশের জনগণও সবদিক থেকে এগিয়ে থাকে। সরকার আর দেশ তো বটেই।

n লেখক :বিশেষ প্রতিনিধি, চ্যানেল আই, সভাপতি, বাংলাদেশ এডুকেশন রিপোর্টার্স ফোরাম