গতকাল ১৫ আগস্ট ছিল জাতীয় শোক দিবস। বাংলার প্রকৃতি, বাংলার প্রতিটি মানুষের অশ্রুসিক্ত হওয়ার দিন। এদিন বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার জঘন্যতম দিন। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ভোরে ধানমন্ডির নিজ বাসায় বঙ্গবন্ধুকে ঘাতকরা ঝাঁজরা করে হত্যা করেছিল। সেদিন সমগ্র বাংলা কেঁদে উঠেছিল। সেদিনের সেই শোক বাঙালির বুকে আজও প্রশমিত হয়নি। কালে কালান্তরে সেই শোকের অনল জ্বলবে প্রতিটি বাঙালির হূদয়ে। স্বাধীনতার স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদতবার্ষিকীতে তাকে সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করি।
বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের লক্ষ্যে সারা জীবন সংগ্রাম করে গেছেন। ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত ‘সোনার বাংলা’ প্রতিষ্ঠাই ছিল তার স্বপ্ন। বঙ্গবন্ধুর অসম্পূর্ণ কাজকে সম্পূর্ণ করে বাংলাদেশকে একটি সুখী ও সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করাই আমাদের এখনকার ব্রত হওয়া উচিত। তাহলেই মৃত্যুঞ্জয়ী এই মহান নেতার প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা হবে। ২০৪১ সালে দেশকে একটি উন্নত-সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করতে ‘রূপকল্প-২০৪১’-এর বাস্তবায়নে কর্মযজ্ঞ অব্যাহত রয়েছে।
বঙ্গবন্ধুকে ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট প্রশ্ন করেছিলেন— আপনার যোগ্যতা কী? উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি জনগণকে ভালোবাসি।’ তিনি আবার প্রশ্ন করেছিলেন— আপনার দুর্বলতা কী? উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমি জনগণকে খুব বেশি ভালোবাসি।’ সে বেশি ভালোবাসাই তার জন্য কাল হলো।
১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে তার পরিবারের সদস্যসহ ১৮ জনকে নির্মম ও নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল। দেশের নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানকে পরিবারের সদস্যসহ এভাবে ভয়াবহ হত্যার ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। ঘাতক খুনি চক্র এমন বর্বর হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের অগ্রগতিকে, সর্বোপরি বঙ্গবন্ধুর চেতনাকে। অবৈধ পন্থায় রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে কুখ্যাত ‘ইনডেমনিটি বিল’ চাপিয়ে দিয়ে তত্কালীন সামরিক সরকার এই ঘৃণ্য মানবতাবিরোধী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের পথ রুদ্ধ করে রেখেছিল। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সরকার গঠন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির পিতার হত্যাকারীদের ফাঁসির রায় কার্যকর করে বাঙালি জাতিকে অভিশাপমুক্ত, কলঙ্কমুক্ত করেছেন।
বাঙালির স্বাধীন ভূমি মানেই বাংলাদেশ আর বাংলাদেশ মানেই বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা। আর সে কারণেই তিনি আমাদের জাতির পিতা। বিংশ শতাব্দীতে নির্যাতিত, নিপীড়িত ও শোষিত মানুষের জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করে যারা বিশ্বনন্দিত নেতা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাদের অন্যতম। মা-বাবার আদরের ‘খোকা’ এখন ‘হাজার বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি’, ‘স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা’, ‘জাতির পিতা’, ‘বঙ্গবন্ধু’, ‘বাংলাদেশের জনক’সহ আরো অনেক নামে অভিষিক্ত। কিন্তু সার্বিকভাবে তিনি একটি আদর্শের নাম। যে আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে বাঙালি জাতি মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, বিশ্বের বুকে জন্ম নিয়েছিল স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি। তার যে ত্যাগ ও সংগ্রাম সেসবই আজ বঙ্গবন্ধুর আদর্শ হয়ে ধরা দিয়েছে তরুণ প্রজন্মের সামনে। ব্যক্তিস্বার্থ, লোভ, মোহ, পদ-পদবির ঊর্ধ্বে উঠে নিজের বিশ্বাসে অটল থেকেছিলেন তিনি। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রিত্ব নয়, এ দেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠাই ছিল তার লক্ষ্য। তিনি কখনো ক্ষমতার পেছনে ছোটেননি। ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত-উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলাই ছিল তার একমাত্র লক্ষ্য।
পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বাঙালি জাতির জন্য শ্রেষ্ঠতম কাজটি সফলভাবে সম্পন্ন করার স্বীকৃতিস্বরূপ বিবিসির জরিপে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির ইতিহাসে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি নির্বাচিত হয়েছেন। বাঙালির জন্য একটি স্বাধীন দেশের তিনিই প্রথম রূপকার। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মধ্য যুগে শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ স্বাধীন সুলতান হিসেবে বাংলাদেশের সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। কিন্তু ইলিয়াস শাহ বাঙালি ছিলেন না। সেদিক থেকে বঙ্গবন্ধু প্রথম বাঙালি, যিনি স্বাধীন বাংলার প্রথম ‘নৃপতি’। বাঙালিদের স্বাধীনতা এনে দেওয়ার প্রয়াস অনেক বাঙালি নেতার মাঝেই দেখা গিয়েছে। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, সুভাষচন্দ্র বসু, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী—এদের সবার অবদান বাঙালির কাছে চিরস্মরণীয়। বাঙালিরাও তাদের স্মরণ করে নানা নামে ডাকে। ‘দেশবন্ধু’, ‘নেতাজি’, ‘শেরে বাংলা’ প্রভৃতি। তবে ‘বঙ্গবন্ধু’ পূর্বের সকলকেই ছাড়িয়ে গেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দিয়ে তার খ্যাতি ছড়িয়ে আছে বিশ্বময়।
n লেখক :প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিত্সক এবং ইউজিসি অধ্যাপক