বিশ্বগ্রামের এই যুগে তথ্যপ্রযুক্তি খাত বিশ্বব্যাপী অর্থায়নে সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ রাখছে। বাংলাদেশেও ২০০৯ সালে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নেওয়া হলে ই-কমার্স, টেলিসেবা, অপারেটিং সিস্টেম ও ফ্রিল্যানসিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ কর্মের দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। এমনকি করোনাকালে অন্যান্য ক্ষেত্রের অনেকেই চাকরি হারিয়ে ফেললেও আইটি খাতে ঝুঁকে তারা সাবলম্বী হয়েছে। এছাড়া, বেকারসমাজেও কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে এই খাতে। বাংলাদেশে প্রতি বছর আইটি খাত থেকে সন্তোষজনক হারে আয় করছে। আইটি বিশেষজ্ঞরা দাবি করছেন, ‘প্রযুক্তির আয় দ্রুতই পোশাকশিল্পের আয়কেও ছাড়িয়ে যাবে।’ এমন প্রেক্ষাপটে কষ্টদায়ক হলেও সত্যি যে, আইটি খাতে নারী অংশগ্রহণ বৃদ্ধি আশানুরূপ না হওয়ায় জেন্ডারবৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করেছে। সরকারি হিসাবমতে, ‘তথ্যপ্রযুক্তির কর্মক্ষেত্রে মাত্র ১২ শতাংশ নারী কাজ করছেন। তার মধ্যে অধিকাংশই প্রাথমিক বা মধ্যম পর্যায়ের কাজ করেন। আর নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর অবস্থান শতকরা ১ শতাংশের চেয়েও কম।’ অথচ উন্নত দেশগুলোতে এ প্রেক্ষাপট অনেকটাই ভিন্ন।
নারীদের আইটি খাতে পিছিয়ে থাকার পেছনে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও ধ্যানধারণা, পুরুষতান্ত্রিকতা, পারিবারিক জটিলতা, প্রশিক্ষণে ঘাটতি, প্রয়োজনীয়তা নেটওয়ার্কিংয়ের অভাব ও আর্থিক সুযোগপ্রাপ্তির অপ্রতুলতা, উদ্যোক্তা তৈরিতে প্রতিবন্ধকতাসহ বেশকিছু অসামঞ্জস্যতা জড়িয়ে আছে। পাশাপাশি নারীদের স্টেম শিক্ষা বিমুখতাও অন্যতম এক কারণ। বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী, তথ্যপ্রযুক্তি-বিষয়ক উচ্চ শিক্ষায় মাত্র ২৫ শতাংশ নারী শিক্ষাগ্রহণ করছে, যাদের মধ্যে অর্ধেকও কর্মসংস্থানে যোগ দিচ্ছে না। তবে আশার আলো ফুটে উঠছে করোনাকালীন সময়ে এফ-কমার্সে। বর্তমানে নারীরা এ খাতে বেশ সাফল্য বয়ে আনছে। বিশেষ করে পোশাক, গহনা, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ও খাবারসামগ্রী, কুটিরশিল্পের পণ্যে এসব ব্যবসায়ী নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা ৫০ শতাংশ। পারিবারিক কারণে যেসব নারী চাকরি ক্ষেত্রে সরাসরি প্রবেশ করতে পারছেন না তারা সহজেই ই-কমার্সে জড়িয়ে যেতে পারছে। তবে সে ক্ষেত্রেও ক্ষুদ্র ও মাঝারিশিল্পে নারীর ভূমিকা থাকলেও বৃহিশল্পে তা একেবারেই কম। বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, সঠিক কর্মদক্ষতায় যদি নারী সমাজকে গড়ে তোলা যায় ও আর্থিক প্রণোদনা নিশ্চিত হয় তাহলে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে নারী উদ্যোক্তাও বড় অবদান রাখতে পারবে। সেই সঙ্গে পুরুষের পাশাপাশি নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ চলমান চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও ভিশন-২০৪১ বাস্তবায়নেও সফল হবে। এজন্য দেশের প্রতিবন্ধী নারীদের প্রতিও বিশেষ দৃষ্টি বাড়ানো দরকার। অন্যান্য কর্মক্ষেত্রের তুলনায় আইটি খাতে শারীরিক প্রতিবন্ধী নারীর অবদানও প্রত্যাশাজনক হবে বলেই আশা করা যায়। তাই তাদেরকে যত্নের সঙ্গে আইটি খাতে যুক্ত নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ সরকার এক্ষেত্রে ডিজিটাল তথ্য অ্যাপ, সাইবার আইন প্রণয়ন ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রসমূহ গড়ে তোলাসহ একের পর এক তাত্পর্যপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়ে যাচ্ছেন। তবে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পদক্ষেপগুলোর প্রয়োগ বাড়াতে হবে, দেশব্যাপী চলমান নেটওয়ার্ক সেবাকেও দ্রুতগতির করা জরুরি। এছাড়াও, সমস্যাসমূহ নিরসনে নারী সমাজকেও এগিয়ে আসতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, নারীরা সাইবার বুলিংয়ের স্বীকার হলেও প্রকাশ করেন না। তাদের এই সংকীর্ণতা দূর করতে হবে। পাশাপাশি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোও প্রয়োজন। সর্বোপরি, বাংলাদেশে টেক স্টার্টআপ ও ই-কমার্সসহ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে নারীর অংশগ্রহণ আগামী পাঁচ বছরে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার যে প্রতিশ্রুতি প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেনম, সবার যৌথ প্রচেষ্টায় তা বাস্তবায়নে নারীসমাজের আইটি খাতে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি।
n লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়