নির্ভুলভাবে রোগ নির্ণয় সাপেক্ষে সঠিক চিকিত্সাসেবা প্রদানের জন্য আধুনিক চিকিত্সা সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতির কোনো বিকল্প নাই। অথচ এই একুশ শতকের একুশ দশকে আসিয়াও দেশের অধিকাংশ সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ইহার ব্যাপক ঘাটতি পরিলক্ষিত হইতেছে। যেইগুলি রহিয়াছে, তাহার অধিকাংশই হয় অপ্রয়োজনীয়; নয়তো বিকল হইয়া পড়িয়া থাকিতে দেখা যাইতেছে। আবার এমনও দেখা যাইতেছে যে, কোনো কোনো হাসপাতালে প্রয়োজন না থাকিলেও দামি যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হইয়াছে এবং সেইগুলির অধিকাংশ আবার অকেজো অবস্থায় পড়িয়া রহিয়াছে। অন্যদিকে, কয়েকটি হাসপাতাল হইতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি চাহিয়া চাহিদাপত্র পাঠানো হইলেও তাহা দেওয়া হয় নাই। এই সকল সমস্যা লইয়া প্রায়শই পত্রপত্রিকায় বিস্তারিত প্রতিবেদন ছাপা হয়; কিন্তু ইহার পুনরাবৃত্তি তাহাতে বন্ধ হইতেছে না। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, সরকারের তথা জনগণের কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ব্যয় হইতেছে; কিন্তু হাসপাতালের যন্ত্রপাতি মানুষের কাজে আসিতেছে না। এই ব্যাপারে আমরা কয়েক বত্সর পূর্বের একটি পুরাতন প্রতিবেদন নজরে আনিতে পারি। ‘হসপিটাল সার্ভিসেস ম্যানেজমেন্ট’ প্রকল্প পর্যবেক্ষণের আওতায় পরামর্শকেরা ২০১৫ সালে দেশের ২২টি হাসপাতাল সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। তাহারা সেবাগ্রহীতা ও সেবাদানকারীদের সহিত কথা বলিয়া একটি প্রতিবেদন তৈরি করেন। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়, তাহাদের পর্যবেক্ষণের আওতায় আসা হাসপাতালগুলিতে ৪০ হইতে ৬৪ শতাংশ পর্যন্ত যন্ত্রপাতি অচল। দুঃখজনকভাবে যাচাই-বাছাই ছাড়াই কোটি টাকার অধিক দামের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হইয়াছে। জেলা সদর হাসপাতালের ৪২ শতাংশ এক্সরে যন্ত্র অকার্যকর। আর মেডিক্যাল কলেজের ৬০ শতাংশ এক্সরে যন্ত্র ও ৫০ শতাংশ আলট্রাসনোগ্রাম যন্ত্র অকেজো হইয়া পড়িয়া রহিয়াছে। কেনাকাটার প্রক্রিয়াতেও ব্যাপক ত্রুটির কথা বলা হয় ঐ প্রতিবেদনে। এই ব্যাপারে সচেতন মহল মনে করেন, চিকিত্সা সরঞ্জাম ক্রয়-মেরামতের সহিত সংশ্লিষ্ট আমদানিকারক ও মেরামতকারী প্রতিষ্ঠানগুলির স্বার্থ জড়িত রহিয়াছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গ্রুপও ইহার সহিত জড়িত বলিয়া অভিযোগ রহিয়াছে।
বস্তুত বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়া কেনা যন্ত্রপাতি ও চিকিত্সা সরঞ্জামের অধিকাংশই বিকল বা অপ্রয়োজনীয় হইয়া পড়িয়া থাকিবার বিষয়টি বর্তমানে আমাদের ‘স্বভাব’ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হইতে যাইতেছে। এই স্বভাব হইতে মুক্ত হওয়া জরুরি। মনে রাখিতে হইবে, মেডিক্যালের যন্ত্রপাতি ওয়ানটাইম বলপেনের মতো নহে যে একবার ব্যবহার করিয়া ছুড়িয়া ফেলিতে হইবে। এই সকল যন্ত্রপাতি ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ আর মেরামতের ব্যবস্থা নিশ্চিত করিতে পারিলে অনেক দিন অবধি চালু রাখা যায়। এই অবস্থায় সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিতে সঠিক চাহিদার ভিত্তিতে মানসম্পন্ন যন্ত্রপাতি ও চিকিত্সা সরঞ্জাম সরবরাহের ব্যবস্থা থাকা একান্ত জরুরি। উপায় যে নাই, তাহা নহে। যেমন—১৯৮৩ সালে ‘ন্যাশনাল ইলেকট্রো-মেডিক্যাল ইকুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার’ (নিমিউ অ্যান্ড টিসি) নামে পরিচিত এই সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়, যাহার কাজ হইতেছে চিকিত্সাকাজে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির মান নিয়ন্ত্রণ ও রক্ষণাবেক্ষণ; কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি বহুলাংশে ঢাকার মহাখালীর এক প্রান্তে অবহেলায় পড়িয়া রহিয়াছে। গত ৩৮ বত্সরে সেবার চাহিদার পারদ হুহু করিয়া বাড়িলেও প্রতিষ্ঠানটির দক্ষতা আর লোকবল তেমন বাড়ানো হয় নাই। অথচ মানসম্মত মেরামত আর পরামর্শ সহযোগিতা দেওয়ার উপযোগী করিতে পারিলে নিমিউ অ্যান্ড টিসি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হইতে পারে।
মনে রাখিতে হইবে, অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করিয়া দেশের বাহির হইতে তাহাদের হাসপাতালের যন্ত্রপাতি মেরামতের জন্য লোক লইয়া আসে। অথচ দেশের ভিতরেই এখন বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান রহিয়াছে। সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলিতে যন্ত্রপাতি ক্রয়ের নামে এক দফা অর্থ লুটপাটের পর মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের নামে আরো এক দফা লুটপাট চালানোর মানসিকতা কাজ করিলে এই সমস্যার সমাধান হইবে না। নিজেদের ভালো নিজেরা না বুঝিলে কেহ আমাদের রক্ষা করিতে পারিবে না।