শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের রংপুর-দিনাজপুর সার্কেল একটি সংঘবদ্ধ সরকারী প্রকৌশলীদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। অভিযোগে বলা হচ্ছে, সিন্ডিকেটটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন সার্কেলের নীলফামারী জেলায় কর্মরত সহকারী প্রকৌশলী আবু তাহের। একাধিক ঠিকাদার এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে শিক্ষামন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত আবেদন করে এর প্রতিকার চেয়েছেন। অধিদপ্তরের প্রশাসন শাখা থেকে এ ব্যাপারে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে সোমবার সরেজমিনে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। তদন্তে তাদের বিরুদ্ধে আনা পছন্দের ঠিকাদারদের বড় বড় কাজ প্রদান, কার্যাদেশের আগেই কাজ দেখিয়ে বিল প্রদান, ঠিকাদারদের চাপ প্রয়োগ করে নিজস্ব সিন্ডিকেট দিয়ে কাজ করা, তিন থেকে ছয় দিনের মধ্যে ৬৫ শতাংশ কাজ দেখিয়ে বিল দেওয়া এবং নামে-বেনামে কোটি কোটি টাকার সম্পদের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে তাদের। অধিদপ্তরের বিভিন্ন শাখা ও মাঠ পর্যায়ে অনুসন্ধান চালিয়ে এসব তথ্যের সন্ধান মিলেছে।
ঐ অভিযোগটি ছাড়াও গত ১০ আগস্ট নীলফামারীরর সহকারী প্রকৌশলী আবু তাহেরের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেট করে নিজে এবং নিজের সিন্ডিকেট দ্বারা কাজ করাসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ এনে অধিদপ্তরের বিভিন্ন শাখায় অপর একটি অভিযোগ দায়ের করেন এক ঠিকাদার।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রশাসন শাখা এবং রংপুর সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলরীর দপ্তর সূত্রে প্রকাশ, গত ২৯ জুন শিক্ষামন্ত্রীসহ শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের বিভিন্ন দপ্তরে রংপুর মহানগরীর কাচারী বাজার এলাকার এক ঠিকাদার অধিদপ্তরের রংপুর সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মেনহাজুল হক, কুড়িগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহজাহান আলী, নীলফামারীর সহকারী প্রকৌশলী আবু তাহের, লালমনিরহাটের উপ-সহকারী প্রকৌশলী আবু সাঈদ আকন্দ, দিনাজপুর জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী কার্যালয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মাহমুদুল হক, রংপুর নির্বাহী প্রকৌশলী কার্যালয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী নাসরিন আখতারের যৌথ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৪ আগস্ট মন্ত্রণালয় থেকে অধিদপ্তরের প্রশাসন ও অর্থ শাখার পরিচালক মো. রাহেদ হোসেনকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তা রাহেদ হোসেন গত ১১ আগস্ট রংপুর নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ে সরেজমিনে শুনানির জন্য নোটিশ ইস্যু করেন (যার স্মারক নং ৩৭.০৭.০০০০.০০৮.২৭.০০৩.২১.৪৩২)। ঐ চিঠির নির্দেশনা মোতাবেক গত সোমবার (১৬ আগস্ট) রংপুর নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
শুনানিতে অভিযুক্ত কুড়িগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহজাহান, নীলফামারীর সহকারী প্রকৌশলী আবু তাহের, লালমনিরহাটের উপ-সহকারী প্রকৌশলী আবু সাঈদ আকন্দ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও তদন্ত কর্মকর্তা রংপুর সার্কেল তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মেনহাজুল হক, রংপুর জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান, সহকারী প্রকৌশলী গোলাম মোস্তফা, উপ-সহাকারী প্রকৌশলী ওরশন আলী, সদর উপজেলার উপ-সহকারী প্রকৌশলী আসাদুজ্জামানের কাছ থেকেও পৃথক শুনানি গ্রহণ করেন। এছাড়াও তদন্ত কর্মকর্তা মঙ্গলবার (১৭ আগস্ট) কয়েকটি কাজ সরেজমিনে পরিদর্শন করেন।
অভিযোগের বিষয়ে লালমনিরহাটের উপ-সহকারী প্রকৌশলী আবু সাঈদ আকন্দ জানান, ‘উড়ো চিঠির মাধ্যমে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছে। বিষয়টি আমি তদন্ত কর্মকর্তার কাছে উপস্থিত হয়ে শুনানিতে জানিয়েছি।’
অভিযোগের ব্যাপারে নীলফামারী জেলার সহকারী প্রকৌশলী আবু তাহের বলেন, ‘একটি চক্র উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমার ক্ষতি করার জন্য এসব মিথ্যা অভিযোগ বিভিন্ন দপ্তরে দিয়েছে। আজ (মঙ্গলবার) আমার নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এসব মিথ্যা অভিযোগের কারণে সেটি হলো না। এসব অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। বিষয়টি আমি শুনানিকালে তদন্ত কর্মকর্তাকে জানিয়েছি।’
অভিযোগ ও শুনানির ব্যাপারে কুড়িগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী শাহজাহান আলী বলেন, ‘আমি শুনানিতে অংশ নিয়েছি এবং আমার অবস্থান পরিষ্কার করেছি। আমি কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নই। অভিযোগে উপস্থাপিত সম্পদ ফ্ল্যাটের বিষয়টিও সঠিক নয়।’
রংপুর জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান আসাদ জানান, ‘সোমবার (১৬ আগস্ট) এসব বিষয় নিয়ে আমার কার্যালয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে তদন্ত কর্মকর্তা শুনানি গ্রহণ করেছেন। বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন। সে কারণে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’
এ ব্যাপারে রংপুর সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মেনহাজুল হক বলেন, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে দেওয়া অভিযোগসমূহের বিষয়ে তিন জন প্রকৌশলীর সঙ্গে সোমবার তদন্ত কর্মকর্তা সশরীরে রংপুর নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ে শুনানি গ্রহণ করেছেন। তবে কবে নাগাদ এ বিষয়ে রিপোর্ট জমা হবে সেটি জানি না। এছাড়াও নীলফামারীর সহকারী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে আমার দপ্তরে একটি অভিযোগ জমা পড়েছে। সেটির বিষয়ে আমরা তদন্ত করার জন্য প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছি।’
ইত্তেফাক/এসএ